রমেকে অবৈধ রক্তের বাণিজ্য: এক ব্যাগ রক্তের দাম ১০ হাজার টাকা!

রংপুর: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে (রমেক) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অবৈধ রক্তের বাণিজ্য এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাসপাতাল সংলগ্ন ধাপ ও আশপাশের এলাকায় লাইসেন্সবিহীন ব্লাড ব্যাংক ও অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে প্রকাশ্যে চলছে রক্ত কেনা-বেচা। জরুরি প্রয়োজনকে পুঁজি করে এসব চক্র রোগীদের কাছ থেকে এক ব্যাগ রক্তের জন্য ২ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় […] The post রমেকে অবৈধ রক্তের বাণিজ্য: এক ব্যাগ রক্তের দাম ১০ হাজার টাকা! first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

রমেকে অবৈধ রক্তের বাণিজ্য: এক ব্যাগ রক্তের দাম ১০ হাজার টাকা!
১৫ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ০৯:০০  

রংপুর: রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালকে (রমেক) কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা অবৈধ রক্তের বাণিজ্য এখন ভয়াবহ আকার ধারণ করেছে। হাসপাতাল সংলগ্ন ধাপ ও আশপাশের এলাকায় লাইসেন্সবিহীন ব্লাড ব্যাংক ও অনুমোদনহীন ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোতে প্রকাশ্যে চলছে রক্ত কেনা-বেচা। জরুরি প্রয়োজনকে পুঁজি করে এসব চক্র রোগীদের কাছ থেকে এক ব্যাগ রক্তের জন্য ২ থেকে ১০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করছে। অথচ সরকারি ব্লাডব্যাংকে এই খরচ মাত্র ৭০০ টাকা। আরো উদ্বেগের বিষয় হলো, এসব অবৈধ প্রতিষ্ঠানে যথাযথ স্ক্রিনিং ও ক্রস-ম্যাচিং ছাড়াই রক্ত সরবরাহ করা হচ্ছে, যা রোগীদের জন্য প্রাণঘাতী হতে পারে।

অবৈধ রক্তের বাজারে মাদকাসক্ত, ভবঘুরে মানুষ

রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে প্রতিদিন গড়ে দুই থেকে আড়াই হাজার রোগী চিকিৎসা গ্রহণ করেন। হাসপাতালকে ঘিরে আশপাশে গড়ে উঠেছে শতাধিক ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার, যার একটি বড় অংশই অনুমোদনহীন। ধাপ এলাকায় মাত্র দুটি বৈধ রক্ত সংগ্রহ ও সংরক্ষণ কেন্দ্র থাকলেও, অনুসন্ধানে জানা গেছে, অন্তত ১০-১২টি প্রতিষ্ঠানে অবৈধভাবে রক্তের কেনা-বেচা চলছে। এসব প্রতিষ্ঠানে রক্তের দালালচক্র সক্রিয় রয়েছে।

প্রত্যক্ষদর্শীরা জানিয়েছেন, মাদকাসক্ত, ভবঘুরে ও দরিদ্র মানুষের কাছ থেকে নামমাত্র মূল্যে রক্ত সংগ্রহ করছেন দালালচক্রের সদস্যরা। প্রায় ৪০-৫০ জনের একটি চক্র নিয়মিত এই ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। দাতাদের সামান্য টাকা দিয়ে সংগ্রহ করা সেই রক্ত জরুরি প্রয়োজনে রোগীর স্বজনদের কাছে কয়েক গুণ বেশি দামে বিক্রি করা হচ্ছে।

ভুক্তভোগীদের শেষ আশ্রয়স্থল দালালচক্র

নগরীর হাবিবনগর এলাকার এক ভুক্তভোগী জানান, জরুরি প্রয়োজনে তাকে দালালের কাছ থেকে ৩ হাজার টাকা দিয়ে এক ব্যাগ রক্ত কিনতে হয়েছিল। স্বজনরা আরো জানান, হাসপাতালের সামনে দাঁড়ালেই দালালরা এসে প্রয়োজনীয় রক্তের ব্যবস্থা করার প্রস্তাব দেয়। এক্ষেত্রে বাংলাদেশের স্বাস্থ্য বিধিমালা অনুযায়ী, সরকারি ব্লাড ব্যাংকে ক্রস ম্যাচিং ও স্ক্রিনিং ফি বাবদ খরচ হয় মাত্র ৭০০ টাকা। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে সেই সরকারি ব্যবস্থা অনেক ক্ষেত্রে দুর্গম হয়ে পড়ে, আর সেই সুযোগ নেয় দালালচক্র।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞরা বলছেন স্বাস্থ্যঝুঁকির কথা

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রায়ান আহমেদ রাজু গভীর উদ্বেগ প্রকাশ করে বলছেন, যথাযথ পরীক্ষা, স্ক্রিনিং ও ক্রস-ম্যাচিং ছাড়া রক্ত সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হলে রোগীর শরীরে সংক্রমিত বা ভুল রক্ত যাওয়ার আশঙ্কা থাকে। বিশেষ করে পেশাদার রক্তদাতা ও মাদকাসক্তদের রক্তে এইচআইভি, হেপাটাইটিস-বি, হেপাটাইটিস-সি ও সিফিলিসের মতো সংক্রমণ থাকার আশঙ্কা রয়েছে। যা রোগীর শরীরে গুরুতর স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি করতে পারে, এমনকি মৃত্যুও হতে পারে।

ভারতের পশ্চিমবঙ্গে সম্প্রতি অনুরূপ একটি চক্র উন্মোচিত হয়েছে, যেখানে ছয়টি ব্লাড ব্যাংক অবৈধভাবে রক্ত ও প্লাজমা বিক্রির সাথে জড়িত ছিল। সেখানেও রক্তের নিরাপত্তা, নিয়ন্ত্রণ ও দাতাদের শোষণের বিষয়টি আলোচনায় এসেছে। রংপুরের এই চক্রও ঠিক একই পথে হাঁটছে।

নিয়ন্ত্রণ নিয়ে রয়েছে ব্যাপক প্রশ্ন

সিভিল সার্জন কার্যালয় সূত্র জানায়, রক্ত পরিসঞ্চালনসংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের জন্য স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের লাইসেন্সসহ নির্দিষ্ট অবকাঠামো ও জনবল থাকা বাধ্যতামূলক। এর মধ্যে রয়েছে রক্ত সংগ্রহের কক্ষ, সার্বক্ষণিক এমবিবিএস চিকিৎসক ও টেকনোলজিস্ট, ব্লাড ব্যাংক রেফ্রিজারেটর, বিভিন্ন সংক্রামক রোগ শনাক্তের পরীক্ষার ব্যবস্থা।

তবে অভিযোগ রয়েছে, ধাপ এলাকার কথিত অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোতে এসব কোনো সুবিধাই নেই। স্বাস্থ্য অধিদপ্তর ইতোমধ্যে সারা দেশে প্রায় ৫ হাজার অবৈধ ও মানহীন হাসপাতাল, ক্লিনিক, ব্লাড ব্যাংক এবং ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চালিয়েছে। রংপুর সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা জানান, অভিযান অব্যাহত রয়েছে। চলতি বছর রংপুরে ১১১টি অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। এছাড়া ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে রংপুরের সালমা ট্রান্সমিউশন ব্লাড ব্যাংক লাইসেন্স না থাকায় বন্ধ করে দেওয়া হয়। ২০২০ সালের জুলাইয়ে ধাপ এলাকার স্বাধীন ব্লাড ব্যাংকসহ ছয়টি প্রতিষ্ঠানকে জরিমানা ও সিলগালা করা হয়েছিল। কিন্তু তৎসত্ত্বেও এই চক্র তাদের কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে।

স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ রায়ান আহমেদ রাজু মনে করছেন, এই চক্র বন্ধ করতে হলে সরকারি ব্লাড ব্যাংকগুলোর সক্ষমতা বাড়াতে হবে, যাতে রোগীরা সহজেই প্রয়োজনীয় রক্ত পেতে পারেন। একইসঙ্গে অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারগুলোর বিরুদ্ধে নিয়মিত অভিযান পরিচালনা করতে হবে। দালালচক্রের সদস্যদের চিহ্নিত করে তাদের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নিতে হবে। রক্তকে পণ্য হিসেবে না দেখে মানবজীবন রক্ষার মাধ্যম হিসেবে বিবেচনা করতে হবে।

সিভিল সার্জন ডা. শাহীন সুলতানা বলেন, ‘কাগজ না দেখে বলা যাবে না রংপুরে বৈধ কতটি ব্লাড ব্যাংক রয়েছে।’ তিনি জানান, অবৈধ ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের বিরুদ্ধে অভিযান চলমান রয়েছে।

তবে ভুক্তভোগীরা প্রশ্ন তুলছেন—এই অভিযান কতটা কার্যকর, এবং সাধারণ মানুষ কখন এই অবৈধ চক্রের কবল থেকে মুক্তি পাবে?

The post রমেকে অবৈধ রক্তের বাণিজ্য: এক ব্যাগ রক্তের দাম ১০ হাজার টাকা! first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.