অনলাইনে বাড়ছে বিক্রি
আবাসিকে অবৈধ গ্যাস বুস্টারের রমরমা
- ফেসবুকের প্রায় অর্ধশত পেজে গ্যাস বুস্টার বিক্রি
- দৈনিক বিক্রি ১০০–১৫০টি, দাম দেড়–দুই হাজার
- তিতাস বলছে, অননুমোদিত বুস্টার সরাসরি অপরাধ
রাজধানীর দীর্ঘদিনের গ্যাস সংকটকে কেন্দ্র করে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মে অবৈধ গ্যাস বুস্টার বা কম্প্রেসরের বিক্রি বেড়েছে। ছোট আকারের এসব যন্ত্র গ্যাসলাইনে চাপ বাড়িয়ে রান্নার চুলায় গ্যাসের প্রবাহ বাড়ানোর দাবি করে বিক্রি করা হচ্ছে। তবে গ্যাস সরবরাহকারী রাষ্ট্রীয় সংস্থা তিতাস গ্যাস জানিয়েছে, আবাসিক লাইনে এ ধরনের কোনো যন্ত্র ব্যবহারের বৈধ অনুমোদন নেই এবং এতে একই লাইনের অন্য গ্রাহকদের স্বাভাবিক গ্যাস সরবরাহ ব্যাহত হওয়ার পাশাপাশি দুর্ঘটনার ঝুঁকিও তৈরি হতে পারে।
চলতি সময়ে ফেসবুকের প্রায় অর্ধশত পেজ ঘুরে দেখা গেছে, বিভিন্ন নামে এসব যন্ত্রের বিজ্ঞাপন ও বিক্রি চলছে। ‘গ্যাস প্রেশার বুস্টার’, ‘গ্যাস কম্প্রেসর’ ও ‘গ্যাস পাম্প’ নামে প্রচার করা এসব পণ্যের সঙ্গে রিলস ও রান্নার ভিডিও ব্যবহার করে ক্রেতাদের আকৃষ্ট করা হচ্ছে। সারাই, অদল-বদল এবং এক বছর পর্যন্ত গ্যারান্টি বা সার্ভিস সুবিধার কথাও বিজ্ঞাপনে উল্লেখ করা হচ্ছে। জনপ্রিয় অনলাইন কেনাকাটার প্ল্যাটফর্মেও এসব পণ্য পাওয়া যাচ্ছে।
বিক্রেতাদের কয়েকজন জানিয়েছেন, তারা দেড় থেকে দুই বছর ধরে এই ব্যবসা করছেন। মডেলভেদে এসব যন্ত্রের দাম সাধারণত দেড় থেকে দুই হাজার টাকার মধ্যে। তবে বিক্রেতাদের ভাষ্য অনুযায়ী, লাইনে একেবারেই গ্যাস না থাকলে এসব যন্ত্র কাজ করে না। গ্যাস অল্প পরিমাণে বা মাঝেমধ্যে এলে তখনই বুস্টার ব্যবহার করে চাপ বাড়ানোর চেষ্টা করা যায়।
গ্রাহক পরিচয়ে কথা বলে এক বিক্রেতা জানান, তাদের দৈনিক প্রায় ১০০ থেকে ১৫০টি যন্ত্র বিক্রি হয়। এর বড় অংশই রাজধানীর বিভিন্ন আবাসিক এলাকায় যাচ্ছে। তিনি জানান, লাইনে সামান্য গ্যাস থাকলেই যন্ত্রটি কার্যকর হয়; সম্পূর্ণ গ্যাসশূন্য অবস্থায় এটি কোনো কাজে আসে না।
বিক্রেতাদের সঙ্গে কথা বলে আরও জানা গেছে, বাজারে প্রথম দিকে থাকা একটি পুরোনো মডেলে শব্দ ও কম্পনের সমস্যা ছিল। এ কারণে বর্তমানে তুলনামূলক নতুন মডেল বিক্রির দিকে ঝুঁকেছেন তারা। নতুন মডেলগুলোতে শব্দ ও কম্পন কিছুটা কমানোর দাবি করা হচ্ছে।
এসব যন্ত্রের বড় অংশ চীন থেকে আমদানি করা হলেও সরবরাহব্যবস্থা বা মূল আমদানিকারকদের পরিচয় সম্পর্কে বিস্তারিত জানাতে রাজি হননি বিক্রেতারা। ফলে কী ধরনের মান নিয়ন্ত্রণের মধ্য দিয়ে এসব যন্ত্র দেশে আসছে, তা নিয়েও প্রশ্ন রয়েছে।
তিতাস গ্যাসের এক ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা জানিয়েছেন, গ্যাস সরবরাহ ব্যবস্থায় কোনো অননুমোদিত যন্ত্র ব্যবহারের সুযোগ নেই। বিশেষ করে বুস্টার বা কম্প্রেসর ব্যবহারের কারণে একই পাইপলাইনে যুক্ত অন্য গ্রাহকদের গ্যাস সরবরাহে বিঘ্ন ঘটতে পারে। এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার কথাও জানান তিনি।
ওই কর্মকর্তা বলেন, শিল্পকারখানায় বড় আকারের কম্প্রেসর ব্যবহারের ঘটনা তিতাস দীর্ঘদিন ধরেই শনাক্ত করে আসছে। বিভিন্ন অভিযানে এসব যন্ত্র জব্দও করা হয়েছে। তবে আবাসিক পর্যায়ে এ পর্যন্ত ঠিক কতটি কম্প্রেসর জব্দ হয়েছে, তার সুনির্দিষ্ট পরিসংখ্যান তাৎক্ষণিকভাবে দিতে পারেননি তিনি।
সাম্প্রতিক সময়ে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে আবাসিক গ্রাহকদের মধ্যে এ ধরনের যন্ত্র ব্যবহারের প্রবণতা বেশি নজরে আসছে বলেও জানান তিনি। এ বিষয়ে অভিযান পরিচালনার পরিকল্পনাও রয়েছে তিতাসের।
তবে শুধু ব্যবহারকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিয়ে সমস্যার পূর্ণ সমাধান সম্ভব নয় বলে মনে করছে তিতাস কর্তৃপক্ষ। এ কারণে সংশ্লিষ্ট জ্বালানি বিভাগের মাধ্যমে বিষয়টি মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে, যাতে এসব যন্ত্রের দেশে আমদানির পথ বন্ধ করা যায়।
তিতাসের ওই কর্মকর্তা বলেন, বাজারে পণ্য সহজলভ্য থাকলে প্রতিটি ব্যবহারকারীকে আলাদাভাবে শনাক্ত করে ব্যবস্থা নেওয়া কার্যত কঠিন। তাই সমস্যার মূল উৎসে গিয়ে আমদানি বন্ধ করা জরুরি।
তিতাসের ভাষ্যমতে, এসব যন্ত্র ব্যবহারের সবচেয়ে বড় ঝুঁকি হলো গ্যাসের স্বাভাবিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ভারসাম্য নষ্ট হওয়া। একটি গ্রাহক বুস্টার ব্যবহার করলে একই লাইনে থাকা অন্য গ্রাহকরা স্বাভাবিক সরবরাহ থেকে বঞ্চিত হতে পারেন। পাশাপাশি এসব যন্ত্রের মান নিয়ন্ত্রণ তিতাসের আওতাভুক্ত নয়। ফলে ত্রুটিপূর্ণ যন্ত্র ব্যবহারে দুর্ঘটনার আশঙ্কাও থেকে যায়।
অন্যদিকে বিক্রেতাদের দাবি, তাদের বিক্রি করা যন্ত্রের কারণে এখন পর্যন্ত বড় ধরনের দুর্ঘটনার খবর তারা পাননি। তবে গ্যাসলাইনে পানি জমে থাকলে বা বিদ্যুতের ভোল্টেজ ওঠানামা করলে যন্ত্র বিকল হওয়ার অভিযোগ কিছু ক্রেতার কাছ থেকে পেয়েছেন বলে স্বীকার করেছেন তারা।
তিতাস জানিয়েছে, চলতি বছরের নতুন গ্যাস বিপণন নিয়মাবলিতে অননুমোদিত সরঞ্জাম বা বুস্টার ব্যবহারকে সরাসরি অপরাধ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়েছে। আগে এ ধরনের ঘটনায় জরিমানা আরোপের বিধান থাকলেও নতুন নিয়মে এটিকে ক্ষতিপূরণ হিসেবে সংজ্ঞায়িত করা হয়েছে এবং ক্ষতিপূরণ নির্ধারণ ও আদায়ের প্রক্রিয়াও নির্দিষ্ট করা হয়েছে।
তিতাসের ওই কর্মকর্তা জানান, নিয়মিত অভিযানে কম্প্রেসর জব্দ করা অব্যাহত রয়েছে। নতুন বিধি অনুযায়ী অননুমোদিত সরঞ্জাম পাওয়া গেলে সংশ্লিষ্ট গ্রাহকের বিরুদ্ধে সরাসরি ব্যবস্থা নেওয়ার সুযোগও তৈরি হয়েছে।
তবে গ্যাস সংকটে নাকাল কিছু গ্রাহক এসব যন্ত্রকে সমস্যার তাৎক্ষণিক সমাধান হিসেবে দেখছেন। প্রযুক্তিনির্ভর এই অননুমোদিত পণ্যের বাজারও মূলত সেই চাহিদাকে কেন্দ্র করেই দ্রুত বিস্তৃত হচ্ছে।
সামগ্রিক পরিস্থিতি বিশ্লেষণে দেখা যায়, গ্যাস সংকট যত দীর্ঘায়িত হচ্ছে, ততই ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প প্রযুক্তির প্রতি গ্রাহকদের আগ্রহ বাড়ছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম ও অনলাইন মার্কেটপ্লেসে প্রায় নিয়ন্ত্রণহীনভাবে এসব যন্ত্র বিক্রি হওয়ায় শুধু মাঠপর্যায়ে অভিযান চালিয়ে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণ করা কঠিন।
বিশেষজ্ঞদের মতে, আমদানি পর্যায়ে কার্যকর নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা এবং অনলাইন মার্কেটপ্লেসগুলোর সঙ্গে সমন্বিত উদ্যোগ ছাড়া এই প্রবণতা বন্ধ করা কঠিন হবে। একই সঙ্গে গ্যাস সরবরাহের মূল সংকট দূর করা না গেলে অননুমোদিত ও ঝুঁকিপূর্ণ বিকল্প প্রযুক্তির প্রতি গ্রাহকদের নির্ভরতা আরও বাড়তে পারে।
//ডিবিটেক/এনএপি/এসভিও/এমআইএসটি//





