পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের টাউন হলে নতুন প্রস্তাব; আসছে জাতীয় এআই সামিট, যুক্ত হবে প্রবাসী বিশেষজ্ঞরাও

বাংলা ভাষা ও তরুণদের নিয়েই এআই ভবিষ্যৎ গড়তে চায় বাংলাদেশ

  •  জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের নেতৃত্ব সামনে রেখে এআই কূটনীতি জোরদারের তাগিদ
  •  বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যবেক্ষণাগার প্রতিষ্ঠা ও বাংলা ভাষাভিত্তিক এলএলএম তৈরির প্রস্তাব
  • প্রবাসীদের যুক্ত করা, তরুণদের অংশগ্রহণ ও এসএমই খাতে প্রযুক্তির বিস্তারে সমন্বিত সিদ্ধান্ত

বাংলা ভাষা ও তরুণদের নিয়েই এআই ভবিষ্যৎ গড়তে চায় বাংলাদেশ
২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৮:০০  

জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের সভাপতিত্ব গ্রহণকে সামনে রেখে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) কূটনীতি, প্রশাসন ও বৈশ্বিক ডিজিটাল শাসনে দেশের অবস্থান শক্তিশালী করতে একটি সমন্বিত জাতীয় রোডম্যাপ প্রণয়নের আহ্বান জানিয়েছেন দেশ-বিদেশের নীতিনির্ধারক, প্রযুক্তিবিদ ও বিশেষজ্ঞরা। একই সঙ্গে বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় টিকে থাকতে শুধু প্রযুক্তি আমদানির ওপর নির্ভর না করে বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই, দক্ষ মানবসম্পদ, তরুণদের অংশগ্রহণ এবং প্রবাসী বাংলাদেশিদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতাকে কাজে লাগানোর ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি (আইটিআইটি) অনুবিভাগের উদ্যোগে আয়োজিত ‘জাতীয় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা প্রশাসন ও কূটনীতি’ শীর্ষক দ্বিতীয় ভার্চুয়াল টাউন হলে এসব মতামত উঠে আসে।

ভার্চুয়াল টাউন হলে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি (আইটিআইটি) অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন (PhD, PGD Oxon) সঞ্চালকের দায়িত্ব পালন করেন। আলোচনায় যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ডি-রেডির প্রধান নির্বাহী ও ‘এআই ব্রিজ’ ফোরামের প্রতিষ্ঠাতা অধ্যাপক আলমগীর হোসেন, আন্তর্জাতিক ডিজাইন প্ল্যাটফর্ম ক্যানভার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শিক্ষা বিভাগের প্রধান মেগান টাউনস এবং দক্ষিণ এশিয়া অঞ্চলের প্রতিনিধি সাগরি চ্যাটার্জি, ব্রিটিশ কাউন্সিল বাংলাদেশের ইংরেজি ও স্কুল শিক্ষা বিভাগের প্রধান দীপ্তি দাস, বাংলাদেশ ইয়ুথ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের (ইয়ুথ আইজিএফ) ভাইস চেয়ারম্যান রিয়াদ হাসান বাদশা, বাংলাদেশ উইমেন ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের চেয়ারপারসন শামীমা আখতার, অস্ট্রিয়াভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান সিল্করোড ৪.০-এর প্রতিষ্ঠাতা ড. ফিলিপ রাইনিশ, সামাজিক উদ্যোগ ‘শোক্রিয়’-এর প্রতিষ্ঠাতা মাহমুদুল হাসান, বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর প্রধান নির্বাহী এএইচএম বজলুর রহমান, আদ্দিস আবাবায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর রাতুল, বাংলাদেশ কিডস ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের সমন্বয়ক আয়শা লাবিবা, প্রযুক্তি সাংবাদিক ও ডিজিবাংলাটেক ডটনিউজের নির্বাহী সম্পাদক এস এম ইমদাদুল হক, বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের প্রতিনিধি মোহাম্মদ আবদুল হক অনু, মুনির আহমেদ, সালাউদ্দিন, এ কে এম আসাদুজ্জামান পাটোয়ারী এবং রিয়াজ ফারিদসহ দেশ-বিদেশের প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, কূটনীতিক, শিক্ষাবিদ ও নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা অংশ নেন।

টাউন হলে বক্তারা বলেন, জাতিসংঘের সভাপতিত্ব গ্রহণ বাংলাদেশের জন্য বৈশ্বিক ডিজিটাল নীতিনির্ধারণে নেতৃত্ব প্রদর্শনের একটি বিরল সুযোগ তৈরি করেছে। এই সময়কে কাজে লাগিয়ে দেশকে এআই গভর্ন্যান্স, নৈতিক প্রযুক্তি ব্যবহার এবং অন্তর্ভুক্তিমূলক ডিজিটাল কূটনীতির কেন্দ্রীয় কণ্ঠে পরিণত করতে হবে।

বাংলাদেশ এআই পর্যবেক্ষণাগার গঠনের প্রস্তাব
আলোচনায় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের অধীনে ‘বাংলাদেশ কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা পর্যবেক্ষণাগার (এআই অবজারভেটরি)’ প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব পুনর্ব্যক্ত করা হয়। প্রস্তাবিত প্রতিষ্ঠানটি জাতীয় ও বৈশ্বিক এআই নীতিমালা পর্যবেক্ষণ, ওয়ার্ল্ড সামিট অন দ্য ইনফরমেশন সোসাইটি (WSIS) ও ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরাম (IGF)-সংক্রান্ত সূচক বিশ্লেষণ, সরকারি খাতে এআই ব্যবহারের নিবন্ধন এবং সম্ভাব্য ঝুঁকি মূল্যায়নের দায়িত্ব পালন করবে।

এ কার্যক্রম বাস্তবায়নে পাঁচটি বিষয়ভিত্তিক কার্যদল গঠনের প্রস্তাব দেওয়া হয়। বিষয়গুলো হলো— এআই প্রশাসন, নিরাপত্তা ও মানবাধিকার; বৈশ্বিক ডিজিটাল সনদ ও কূটনীতি; টেকসই উন্নয়ন ও অর্থনৈতিক রূপান্তর; অবকাঠামো, ডেটা ও প্রযুক্তি সার্বভৌমত্ব; এবং দক্ষতা উন্নয়ন ও মানবসম্পদ প্রস্তুতি।

আগষ্টে জাতীয় এআই সামিটের পরিকল্পনা
আলোচনার শুরুতে আইটিআইটি অনুবিভাগের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি প্রযুক্তি নীতিমালা প্রণয়ন করবে না; তবে বাংলাদেশকে বৈশ্বিক এআই কূটনীতির সঙ্গে সংযুক্ত করতে একটি উন্মুক্ত প্ল্যাটফর্ম তৈরি করবে। এজন্য শিগগিরই দেশে একটি জাতীয় পর্যায়ের এআই সামিট আয়োজনের পরিকল্পনা রয়েছে।

তিনি বলেন, ওই সামিটে বাংলাদেশের কৌশলগত অবস্থান, আন্তর্জাতিক অংশীদারিত্ব এবং এআই নীতির মৌলিক বিষয়গুলো নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা হবে। পাশাপাশি বিশ্বের বিভিন্ন দেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি ২০ থেকে ৩০ লাখ প্রবাসী বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞের মতামত ও অভিজ্ঞতাকে জাতীয় পরিকল্পনায় অন্তর্ভুক্ত করার উদ্যোগ নেওয়া হবে।

বাংলা ভাষাভিত্তিক এআই উন্নয়নের ওপর গুরুত্ব
আদ্দিস আবাবায় বাংলাদেশ দূতাবাসের কাউন্সেলর রাতুল বলেন, বৈশ্বিক দক্ষিণের দেশগুলোর অন্যতম বড় চ্যালেঞ্জ ভাষা। তাই বাংলা ভাষাকে ন্যাচারাল ল্যাঙ্গুয়েজ প্রসেসিং (এনএলপি) এবং বৃহৎ ভাষা মডেল (এলএলএম)-এ কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত করা এখন সময়ের দাবি।

তিনি বলেন, বাংলাদেশ কেবল বিদেশি এআই সেবার গ্রাহক হয়ে থাকবে না; বরং বাংলা ভাষাভিত্তিক প্রযুক্তি উন্নয়নে আন্তর্জাতিক সহযোগিতার নেতৃত্বও দিতে পারে। আলোচনায় বক্তারা আরও বলেন, ভাষাগত অন্তর্ভুক্তি ছাড়া বৈশ্বিক এআই ব্যবস্থায় ন্যায্যতা ও সমতা নিশ্চিত করা সম্ভব নয়। একই সঙ্গে বাংলা ভাষার ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব, স্থানীয় ডেটা ইকোসিস্টেম গঠন এবং অ্যালগরিদমিক প্রভাব মূল্যায়নের ওপর গুরুত্বারোপ করা হয়।

তরুণদের নীতিনির্ধারণে সম্পৃক্ত করার আহ্বান
বাংলাদেশ ইয়ুথ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের ভাইস চেয়ারম্যান রিয়াদ হাসান বাদশা বলেন, এআই গভর্ন্যান্সে তরুণদের শুধু সুবিধাভোগী নয়, নীতিনির্ধারণের সক্রিয় অংশীদার ও সহ-নকশাকারী হিসেবে দেখতে হবে।

তিনি শিক্ষা, বৃত্তি ও কর্মসংস্থানে ব্যবহৃত এআই ব্যবস্থাকে উচ্চ-ঝুঁকিপূর্ণ হিসেবে চিহ্নিত করে স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার আহ্বান জানান। পাশাপাশি জাতীয় পাঠ্যক্রমে এআই সাক্ষরতা অন্তর্ভুক্ত করা এবং বৈশ্বিক এআই নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশের ভাষা ও স্থানীয় বাস্তবতার প্রতিফলন নিশ্চিত করার প্রস্তাব দেন।

এআই সাক্ষরতাকে জাতীয় অগ্রাধিকার করার আহ্বান
ভিয়েনাভিত্তিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড. ফিলিপ রাইনিশ বলেন, একটি দেশের সবচেয়ে বড় সম্পদ ডেটা সেন্টার বা জিপিইউ নয়; বরং এআই সম্পর্কে সচেতন মানুষ।

তিনি বলেন, আজ যারা স্কুলে পড়ছে, আগামী দশকে তারাই এআইভিত্তিক প্রতিষ্ঠান পরিচালনা করবে। তাই শিশু-কিশোরদের এআই সাক্ষরতা, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ, অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত বোঝা এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা বিষয়ে এখনই শিক্ষা দেওয়া প্রয়োজন। একই সঙ্গে শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য পরিমাপযোগ্য সূচক নির্ধারণ এবং এআই সাক্ষরতাকে জাতীয় অগ্রাধিকারের তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান।

এসএমই ও অনানুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে এআই ব্যবহারের তাগিদ
আলোচনায় বেসরকারি খাতের প্রতিনিধিরা বলেন, বাংলাদেশের অর্থনীতির বড় অংশ ক্ষুদ্র, কুটির ও মাঝারি উদ্যোক্তা (এসএমই) এবং অনানুষ্ঠানিক খাতের ওপর নির্ভরশীল। কিন্তু এআই প্রযুক্তি গ্রহণে তাদের সক্ষমতা এখনও সীমিত।

তারা সহজ ও স্বল্পব্যয়ের এআই সমাধান, অর্থায়ন সহায়তা এবং নীতিগত প্রণোদনার মাধ্যমে এসব প্রতিষ্ঠানকে ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক অর্থনীতিতে অন্তর্ভুক্ত করার আহ্বান জানান। তাঁদের মতে, এসএমই খাতে এআই প্রয়োগ হলে উৎপাদনশীলতা ও কর্মসংস্থান উভয়ই উল্লেখযোগ্যভাবে বৃদ্ধি পাবে এবং দেশের প্রতিযোগিতা সক্ষমতাও বাড়বে।

শিক্ষা প্রযুক্তিতে আন্তর্জাতিক সহযোগিতা
ক্যানভার প্রতিনিধি সাগরি চ্যাটার্জি ও মেগান টাউনস জানান, বাংলাদেশে প্রাক-প্রাথমিক থেকে দ্বাদশ শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য ক্যানভা এডুকেশন বিনামূল্যে উন্মুক্ত থাকবে। পাশাপাশি এআই দক্ষতা উন্নয়ন, স্থানীয় ভাষাভিত্তিক শিক্ষাসামগ্রী তৈরি এবং শিক্ষক প্রশিক্ষণে সহযোগিতা করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তারা।

ভবিষ্যৎ কর্মপরিকল্পনা
টাউন হলে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে ঐকমত্য হয়। এর মধ্যে রয়েছে— অংশীজনদের মতামত সংকলন করে একটি জাতীয় এআই ভিশন ডকুমেন্ট প্রণয়ন, মিশ্র অর্থায়নের মাধ্যমে অতিরিক্ত সম্পদ সংগ্রহ, বাংলাদেশ এআই পর্যবেক্ষণাগারের সনদ ও কার্যদলগুলোর কার্যপরিধি (টার্মস অব রেফারেন্স) প্রণয়ন, আইসিটি বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে সুপারিশ পাঠানো, বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের উদ্যোগে ‘এআই গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডিজিটাল ডিপ্লোমেসি স্কুল’ চালু এবং আগামী আগস্টে অনুষ্ঠিতব্য ডিসিসিআই এআই সামিটে সরকারি অংশগ্রহণ নিশ্চিত করা।

টাউন হলের বক্তারা অভিন্নভাবে মত দেন, আন্তর্জাতিক অঙ্গীকারকে জাতীয় বাস্তবায়ন কাঠামোয় রূপ দিতে সরকার, বেসরকারি খাত, একাডেমিয়া, নাগরিক সমাজ ও উন্নয়ন অংশীদারদের সমন্বিত অংশগ্রহণ অপরিহার্য। তাঁদের মতে, ভাষা, মানবসম্পদ, তরুণ নেতৃত্ব, এসএমই সক্ষমতা এবং আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক অবস্থানকে সমন্বিতভাবে কাজে লাগাতে পারলে বাংলাদেশ শুধু এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী নয়, বরং বৈশ্বিক এআই গভর্ন্যান্সে একটি প্রভাবশালী নীতিনির্ধারক শক্তি হিসেবেও আত্মপ্রকাশ করতে পারবে।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমই//