জাতীয় এআই গভর্ন্যান্স ও অবজারভেটরির প্রস্তাব

এআই কূটনীতিতে সক্রিয় হতে চায় বাংলাদেশ

  • আন্তর্জাতিক এআই নীতিনির্ধারণে সক্রিয় ভূমিকার আহ্বান
  • 'বাংলাদেশ এআই অবজারভেটরি' গঠনের প্রস্তাব
  • দক্ষতা, নীতি ও বৈশ্বিক সহযোগিতায় জোর

এআই কূটনীতিতে সক্রিয় হতে চায় বাংলাদেশ
২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৩৭  
২৭ জুলাই, ২০২৬ ১৬:৪০  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) এখন শুধু প্রযুক্তির পরিবর্তনের বিষয় নয়; এটি বৈশ্বিক অর্থনীতি, কূটনীতি, শিক্ষা, কর্মসংস্থান এবং রাষ্ট্র পরিচালনার অন্যতম চালিকাশক্তিতে পরিণত হয়েছে। এই বাস্তবতায় আন্তর্জাতিক এআই নীতিনির্ধারণে বাংলাদেশের সক্রিয় অংশগ্রহণ এবং একটি সমন্বিত জাতীয় এআই গভর্ন্যান্স কাঠামো গড়ে তোলার ওপর জোর দিয়েছেন দেশি-বিদেশি বিশেষজ্ঞরা।

পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের আন্তর্জাতিক বাণিজ্য, বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি (আইটিআইটি) উইং আয়োজিত এক অনলাইন টাউন হলে কূটনীতিক, প্রযুক্তিবিদ, গবেষক, বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক, আন্তর্জাতিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধি, সুশীল সমাজের সদস্য এবং প্রবাসী বাংলাদেশিরা অংশ নিয়ে এ মত দেন।

এআই নীতিতে সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগের আহ্বান

অনুষ্ঠানে আইটিআইটি উইংয়ের মহাপরিচালক ড. সৈয়দ মুনতাসির মামুন বলেন, এআই নিয়ে নীতিগত নেতৃত্ব কোনো একক মন্ত্রণালয়ের দায়িত্ব নয়; বরং এটি একটি সমন্বিত জাতীয় উদ্যোগ হওয়া উচিত।

তিনি বলেন, পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় সরাসরি নীতিনির্ধারণকারী প্রতিষ্ঠান না হলেও আন্তর্জাতিক সংস্থা, বিভিন্ন দেশ এবং বৈশ্বিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে বাংলাদেশের সংযোগ স্থাপনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে।

ড. মামুন জানান, বর্তমানে বিশ্বের কয়েকটি প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের বাজারমূল্য অনেক দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) সমান। ফলে বৈশ্বিক এআই ইকোসিস্টেমে রাষ্ট্র ও প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানের মধ্যে ভারসাম্যপূর্ণ ও দায়িত্বশীল সম্পর্ক গড়ে তোলা সময়ের দাবি।

জাতিসংঘে বাংলাদেশের নতুন সুযোগ

তিনি বলেন, আগামী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের (ইউএনজিএ) ৮১তম অধিবেশনে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমান সভাপতির দায়িত্ব গ্রহণ করবেন। একই সময়ে বৈশ্বিক এআই গভর্ন্যান্স ও ডিজিটাল নীতিমালার গুরুত্বপূর্ণ আলোচনা এগিয়ে যাবে। এই সুযোগ কাজে লাগিয়ে গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ আন্তর্জাতিক পরিসরে আরও জোরালোভাবে তুলে ধরতে পারে বাংলাদেশ।

ড. মামুনের মতে, বিশ্বের প্রায় ১৯৫টি দেশের মধ্যে মাত্র ১৩ থেকে ১৭টি দেশ বৈশ্বিক এআই নীতিনির্ধারণে কার্যকর ভূমিকা রাখছে। বাংলাদেশেরও সেই পরিসরে প্রবেশের সক্ষমতা গড়ে তুলতে হবে।

'বাংলাদেশ এআই অবজারভেটরি' গঠনের প্রস্তাব

বাংলাদেশ নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)-এর প্রধান নির্বাহী এএইচএম বজলুর রহমান 'বাংলাদেশ এআই অবজারভেটরি' প্রতিষ্ঠার প্রস্তাব দেন।

তার মতে, এই প্রতিষ্ঠান শুধু এআই প্রযুক্তির অগ্রগতি পর্যবেক্ষণ করবে না; বরং মানবাধিকার, ব্যক্তিগত গোপনীয়তা, বৈষম্য, বিভ্রান্তিকর তথ্য, নজরদারি এবং কর্মসংস্থানের ওপর এআইয়ের প্রভাব নিয়মিত মূল্যায়ন করবে।

তিনি বলেন, সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান, বেসরকারি খাত, গণমাধ্যম, শ্রমজীবী প্রতিনিধি ও সুশীল সমাজের অংশগ্রহণে একটি স্বচ্ছ ও বহুপক্ষীয় কাঠামো গড়ে তুলতে হবে এবং নিয়মিত জনসম্মুখে প্রতিবেদন প্রকাশের মাধ্যমে জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।

জাতীয় এআই কাউন্সিলের সুপারিশ

যুক্তরাজ্যভিত্তিক ডি-রেডির প্রতিষ্ঠাতা ও এআই গবেষক অধ্যাপক আলমগীর হোসেন বলেন, এআই প্রযুক্তির পরিবর্তনের গতি শিল্পবিপ্লবের চেয়েও দ্রুত। তাই শুধু নীতিমালা নয়, উদ্ভাবন, গবেষণা এবং মানবসম্পদ উন্নয়নেও সমান গুরুত্ব দিতে হবে।

তিনি বলেন, বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় শক্তি তরুণ জনগোষ্ঠী। তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি ও উদ্ভাবনের সুযোগ তৈরি না হলে কেবল নীতিমালা দিয়ে কাঙ্ক্ষিত পরিবর্তন আনা সম্ভব নয়। এজন্য তিনি একটি জাতীয় এআই কাউন্সিল গঠনের প্রস্তাব দেন।

শিক্ষা ও দক্ষতায় আন্তর্জাতিক সহযোগিতা

কানাডাভিত্তিক প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান ক্যানভার এশিয়া-প্যাসিফিক অঞ্চলের শিক্ষা বিভাগের প্রধান মেগান টাউনস বলেন, বাংলাদেশের মতো তরুণ জনগোষ্ঠীর দেশে এআই দক্ষতা উন্নয়ন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ।

তিনি জানান, বিশ্বের সব কে-১২ পর্যায়ের শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য Canva Education বিনামূল্যে উন্মুক্ত রাখা হয়েছে। পাশাপাশি স্থানীয় ভাষায় এআই শিক্ষাসামগ্রী, প্রশিক্ষণ এবং দক্ষতা উন্নয়নে সহযোগিতা করতেও প্রতিষ্ঠানটি আগ্রহী।

ক্যানভার প্রতিনিধি সাগরি চ্যাটার্জি বলেন, মাতৃভাষাভিত্তিক এআই শিক্ষা এবং দক্ষতা উন্নয়ন কর্মসূচিতে বাংলাদেশকে সহায়তা করতে তারা প্রস্তুত।

এআই সাক্ষরতাকেই ভবিষ্যতের অবকাঠামো

ভিয়েনাভিত্তিক প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ ড. ফিলিপ রাইনিশ বলেন, এআই সাক্ষরতা (AI Literacy) ভবিষ্যতের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামো।

তার ভাষায়, আজকের শিক্ষার্থীরাই আগামী দিনের এআইনির্ভর রাষ্ট্র পরিচালনা করবে। তাই শিশুদের এখন থেকেই এআই, ভুয়া তথ্য শনাক্তকরণ, অ্যালগরিদমিক সিদ্ধান্ত এবং ডিজিটাল নিরাপত্তা সম্পর্কে শিক্ষা দিতে হবে।

তিনি বলেন, প্রযুক্তি সম্পর্কে সচেতন নাগরিক গড়ে তোলাই একটি দেশের সবচেয়ে বড় সার্বভৌম সক্ষমতা।

খাতভিত্তিক নীতিমালার আহ্বান

সাইবার নিরাপত্তা বিশেষজ্ঞ শাহানাজ বলেন, ব্যাংকিং, স্বাস্থ্য, ওষুধশিল্প, সরকারি সেবা এবং গুরুত্বপূর্ণ অবকাঠামোর মতো প্রতিটি খাতের জন্য পৃথক এআই নির্দেশিকা প্রয়োজন। কারণ প্রতিটি খাতের ঝুঁকি ও ব্যবহারিক বাস্তবতা ভিন্ন।

বাংলাদেশ ইন্টারনেট গভর্ন্যান্স ফোরামের মহাসচিব মোহাম্মদ আবদুল হক অনু প্রতিবছর বাংলাদেশ স্কুল অব এআই গভর্ন্যান্স অ্যান্ড ডিজিটাল ডিপ্লোমেসি আয়োজনের প্রস্তাব দেন, যাতে নীতিনির্ধারক, গবেষক, তরুণ ও সুশীল সমাজের মধ্যে এআই সক্ষমতা গড়ে ওঠে।

কানাডাপ্রবাসী প্রযুক্তি বিশেষজ্ঞ আজফার আদিব বলেন, সীমিত সম্পদকে সর্বোচ্চ কাজে লাগাতে বাংলাদেশের উচিত অগ্রাধিকারভিত্তিক এআই উন্নয়ন পরিকল্পনা গ্রহণ করা।

অন্যদিকে, ইথিওপিয়ার আদ্দিস আবাবায় বাংলাদেশের দূতাবাসের কাউন্সেলর রাতুল বলেন, শুধু এআই ব্যবহার নয়; দেশীয় হার্ডওয়্যার, সফটওয়্যার ও প্রযুক্তিগত সক্ষমতা গড়ে তোলাও সমান গুরুত্বপূর্ণ। অন্যথায় বাংলাদেশ বিদেশি প্রযুক্তির ওপর নির্ভরশীলই থেকে যাবে।

নীতিনির্ধারক নয়, উদ্ভাবকও হতে হবে

টাউন হলের বক্তারা অভিন্নভাবে মত দেন, বাংলাদেশকে কেবল এআই প্রযুক্তির ব্যবহারকারী হিসেবে নয়, বরং নীতিনির্ধারক, উদ্ভাবক এবং দায়িত্বশীল বৈশ্বিক অংশীদার হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করতে সরকার, বিশ্ববিদ্যালয়, বেসরকারি খাত, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সমন্বিতভাবে কাজ করতে হবে।

তাদের মতে, জাতিসংঘসহ বৈশ্বিক বিভিন্ন প্ল্যাটফর্মে বাংলাদেশের বর্তমান কূটনৈতিক অবস্থান কাজে লাগিয়ে এআই গভর্ন্যান্সে নেতৃত্ব দেওয়া এবং গ্লোবাল সাউথের স্বার্থ তুলে ধরার জন্য এটিই সবচেয়ে উপযুক্ত সময়।

//ডিবিটেক/ আইএই্চ/ এমএসআই//