বাংলাদেশের দায়িত্ব এআই নিয়ে এমআইএসটিতে প্রথম সম্মেলন অনুষ্ঠিত 

প্রথম রেসপনসিবল এআই সামিটে চ্যাম্পিয়ন চৌকস প্রহরী ও টিম অ্যানোনিমাস

প্রথম রেসপনসিবল এআই সামিটে চ্যাম্পিয়ন চৌকস প্রহরী ও টিম অ্যানোনিমাস
১৮ জানুয়ারি, ২০২৬ ২০:৩০  

বাংলাদেশে মিলিটারি ইনস্টিটিউট অব সাইন্স অ্যান্ড টেকনোলজিতে (এমআইএসটি) প্রথমবারের মতো রেসপনসিবল এআই সামিট ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়েছে। সামিটে মূল বক্তব্য সেশন ও প্যানেল আলোচনার পাশাপাশি শিক্ষার্থীদের অংশগ্রহণে পোস্টার উপস্থাপনা ও প্রজেক্ট প্রদর্শনী প্রতিযোগিতার ব্যবস্থা করা হয়, যেখানে বিভিন্ন উদ্ভাবনী ও সামাজিকভাবে প্রাসঙ্গিক এআই প্রকল্প উপস্থাপন করা হয়।

এতে এমআইএসটি, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়, বাংলাদেশ প্রকৌশল বিশ্ববিদ্যালয় (বুয়েট), ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি, বাংলাদেশ ইউনিভার্সিটি অব প্রফেশনালস (বিইউপি), ইসলামিক ইউনিভার্সিটি অব টেকনোলজি (আইইউটি) সহ মোট ১২টি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে শিক্ষার্থীরা অংশ নেন। প্রতিযোগিতায় প্রজেক্ট প্রেজেন্টেশনে প্রথম চারটি দল এবং পোস্টার প্রদর্শনীতে প্রথম চারটি দলকে পুরস্কার প্রদান করা হয়।

এদের মধ্যে প্রকল্প প্রদর্শনে টিম চৌকস প্রহরী চ্যাম্পিয়ন হয়েছে। এমআইএসটি’র এই দলের সদস্যরা হলেন- মোঃ জাওয়াদুর রহমান, আল আমিন রশিদ তারেক এবং জাবের ইসলাম। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ও সেন্সর ব্যবহার করে নির্দিষ্ট এলাকা পাহারা দিতে সক্ষম এবং নিজে থেকেই শত্রু শনাক্ত, অনুসরণ ও লক্ষ্যবস্তু নির্ধারণ করতে পারে এমন একটি স্বয়ংক্রিয় প্রতিরক্ষা ব্যবস্থা উপস্থাপন করে চ্যাম্পিয়ন হয় তারা। তাদের প্রকল্পের নাম- এএসইটিএস। 

প্রদর্শনীতে ভূমিকম্পের আগাম সতর্কতা দিতে সক্ষম অন সাইট টুলস প্রদর্শন করে প্রথম রানার্সআপ হয়েছে বুয়েটের টিম মাইডাস। এই দলের সদস্যরা হলেন মোঃ ইব্রাহিম মোল্লা, নাজমুস সাকিব ও সান্দিদ সাফওয়ান। দ্বিতীয় রানার্সআপ হয়েছে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের টিম আরক্ত এবং তৃতীয় রানার্স আপ একই বিশ্ববিদ্যালয়ের QRARG_AKI দল। 

পেস্টার প্রদর্শনীতে চ্যাম্পিয়ন হয়েছে আইইউটি’র টিম অ্যানোনিমাস। এই দলের সদস্যরা হলেন- মিফতাহুল জান্নাতি অনন্যা, খন্দকার সাকিব আল হাসান এবং মোস্তাফিনা মনির মৃন্ময়ী। এই বিভাগে রানার্স আপ হয়েছে যথাক্রমে ইসলামিক বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়ার দল নিডল ভিশন; স্বাগতিকর এমআইএসটি’র Aristotle Lavoisier ও QRARG FireSense। কুস্টিয়ার দলটির সদস্যরা হলেন- এস এম মাহিন, এনামুল হোসেন ও তারেক আজিজ। আর এমআইএসটি’র দুইটি দলের সদস্যরা হলেন- সাবীরা মমতাজ, মাহির তাজওয়ার সাবাব ও আরিফুল ইসলাম এবং মুহাম্মাদ শাহরিয়ার জামান, আফসানা মাহজাবীন মিম ও আনুশা আজিজ।  

১৮ জানুয়ারি, রবিবার ঢাকার মিরপুর সেনানিবাসে এমআইএসটির কম্পিউটার সায়েন্স অ্যান্ড ইঞ্জিনিয়ারিং (সিএসই) বিভাগের তত্ত্বাবধানে এআই সামিট ২০২৬ অনুষ্ঠিত হয়। সম্মেলনে একাডেমিয়া, শিল্পখাত ও নীতিনির্ধারণী দৃষ্টিভঙ্গিতে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (রেসপনসিবল এআই) নিয়ে দুটি প্যানেল আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। 

 ‘বাংলাদেশের জন্য এবং বাংলাদেশ দ্বারা রেসপনসিবল এআই গঠনে একাডেমিয়া কীভাবে ভূমিকা রাখতে পারে’ বিষয়ে মূল প্রবন্ধ উপস্থাপন করেন নর্থইস্টার্ন ইউনিভার্সিটির সহকারী অধ্যাপক ও হার্ভার্ড ইউনিভার্সিটির বার্কম্যান ক্লেইন ফেলো ড. উপোল এহসান।  মূল বক্তব্যে তিনি বাংলাদেশের বাস্তবতা ও প্রয়োজনের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ, দেশীয়ভাবে উদ্ভাবিত কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা সমাধান গড়ে তোলার গুরুত্বারোপ করেন।

এই প্যানেলে অংশগ্রহণ করেন সহযোগী অধ্যাপক ড. এস এম তাইয়াবুল হক (ব্র্যাক ইউনিভার্সিটি), অধ্যাপক ড. নোভা আহমেদ (নর্থ সাউথ ইউনিভার্সিটি) এবং সহযোগী অধ্যাপক ড. কাজী নূর-ই-আলম সিদ্দিকী (এমআইএসটি)। শিক্ষাবিদরা কীভাবে প্রতিষ্ঠানসমূহের দায়িত্বশীল এআই চর্চায় ভূমিকা রাখতে পারে, আলোচনায় সে বিষয়ে বিভিন্ন দৃষ্টিভঙ্গি উঠে আসে। পাশাপাশি উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশে এআই প্রযুক্তির দায়িত্বশীল ব্যবহার কীভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব, তা নিয়েও বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। এসব বিষয় সামনে এনে প্যানেলিস্টরা একাডেমিয়ার ভূমিকা গুরুত্বের সঙ্গে তুলে ধরেন।

ড. উপল এহসানের সঙ্গে এই অধিবেশনটি যৌথভাবে সঞ্চালনা করেন বন্ডস্টাইন টেকনোলজিস এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ও সহ-প্রতিষ্ঠাতা মীর শাহরুখ ইসলাম। প্যানেল আলোচনায় অংশগ্রহণ করেন ইউওয়াই সিস্টেমস লিমিটেড এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা ও চেয়ারপারসন ফারহানা আনোয়ার রহমান, আইসিটি বিভাগের সিনিয়র সহকারী সচিব আরাফাত মোহাম্মদ নোমান এবং গ্রাফিকপিপল ও সফটওয়্যারপিপল এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ইমতিয়াজ ইলাহী। 

এই প্যানেল আলোচনায় বাংলাদেশে ডিজিটাল সিস্টেম প্রবর্তনে যথাযথ ব্যবস্থা গ্রহণের পাশাপাশি দায়িত্বশীল এআই ব্যবহারের মাধ্যমে শিল্পখাতে দক্ষতা বৃদ্ধি, ন্যায্যতা, স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নের গুরুত্ব বক্তারা তুলে ধরেন। এ প্রেক্ষাপটে বাংলাদেশের শিল্পখাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার প্রভাব, সম্ভাবনা ও চ্যালেঞ্জ নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করা হয়। আলোচনায় এআই নীতিমালা তৈরিতে সবার নিশ্চিত করা এবং দেশীয় প্রযুক্তিকে এআই ব্যবহারে উদ্ভাবনের গুরুত্ব দেয়ার পাশাপাশি নিজেদের ডেটা সেট ব্যবহার ও প্রযুক্তি ব্যবহারের তাগিদ দেন বক্তারা। 

আন্তঃবাহিনী জনসংযোগ পরিদপ্তর (আইএসপিআর) জানিয়েছে, এই আয়োজনটি দেশে দায়িত্বশীল ও নৈতিক কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা চর্চায় একটি গুরুত্বপূর্ণ উদ্যোগ হিসেবে স্বীকৃতি পেয়েছে। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে মহিলা ও শিশু এবং সমাজকল্যাণ উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ প্রধান অতিথি হিসেবে এবং এমআইএসটির কমান্ড্যান্ট মেজর জেনারেল মোহাম্মদ নাসিম পারভেজ প্রধান পৃষ্ঠপোষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন।

অনুষ্ঠানটি সভাপতিত্ব করেন এমআইএসটির সিএসই বিভাগের বিভাগীয় প্রধান ব্রিগেডিয়ার জেনারেল মোহাম্মদ শাহজাহান মজিব।

এর আগে সম্মেলনে উপদেষ্টা শারমীন এস মুরশিদ তার বক্তব্যে বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে শিল্পখাতের বিকাশ ও কার্যকর নীতিমালা প্রণয়নে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার গুরুত্ব ও সম্ভাবনার ওপর আলোকপাত করেন।  তিনি বলেন, দেশের সবচেয়ে প্রান্তিক ও পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীর কল্যাণে কার্যকর ও দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) প্রযুক্তি অপরিহার্য। যেসব মন্ত্রণালয়ের কার্যক্রম মানবিকতা, ন্যায্যতা ও বাস্তবতার ওপর ভিত্তি করে পরিচালিত হয় সেখানেও এআই ব্যবহারের ক্ষেত্রেও সর্বোচ্চ গুরুত্ব পাবে। 

উপদেষ্টা আরও বলেন, বৈশ্বিক প্রযুক্তি দ্রুত এগিয়ে গেলেও বাংলাদেশের ভাষা, সংস্কৃতি ও জীবনধারার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ এআই প্রযুক্তি এখনও সীমিত। এই ঘাটতি পূরণ করতে দেশীয় গবেষণা এবং তরুণ প্রজন্মের সম্পৃক্ততা জরুরি।

এ প্রসঙ্গে এমআইএসটি কমান্ড্যান্ট বলেন, শিক্ষা ও গবেষণার মাধ্যমে দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিষয়ক প্রযুক্তি উন্নয়নে এমআইএসটি সর্বদা সক্রিয়ভাবে কাজ করবে।   

সম্মেলনে বাংলাদেশে গণিত ও ইনফরম্যাটিক্স অলিম্পিয়াডের পথিকৃৎ ডক্টর মোহাম্মদ কায়কোবাদ সহ শিক্ষাবিদ ও প্রযুক্তিবিদরা অংশ নেন। 

ডিবিটেক/আইএস/ইকে