প্রধানমন্ত্রীর লাল টেলিফোনের তার ‘চুরি’ নিয়ে তোলপাড়!
সচিবালয়ে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নিরাপত্তাসম্পন্ন ‘লাল টেলিফোন’-এর কপার ক্যাবল কেটে নেওয়ার ঘটনায় তোলপাড়। বিটিসিএলের ৭ ঘণ্টার চেষ্টায় সংযোগ পুনরুদ্ধার। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় ও গোয়েন্দা সংস্থার তদন্ত শুরু
বাংলাদেশ সচিবালয়ের অভ্যন্তরে প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ নিরাপত্তাসম্পন্ন ‘লাল টেলিফোন’ বা রেড টেলিফোনের সংযোগ বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার এক নজিরবিহীন ঘটনায় দেশের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তা মহলে ব্যাপক তোলপাড় শুরু হয়েছে।
প্রাথমিকভাবে জানা গেছে, সচিবালয়ের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ ভবনের মধ্য দিয়ে যাওয়া স্পর্শকাতর কপার ক্যাবলের (তামার তার) কিছু অংশ কেটে ফেলা বা চুরি করা হয়েছে। এর ফলে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ সরকারের একাধিক শীর্ষ ও অতিগুরুত্বপূর্ণ দপ্তরের টেলিফোন যোগাযোগ ব্যবস্থা সাময়িকভাবে সম্পূর্ণ অচল হয়ে পড়ে।
সংশ্লিষ্ট নির্ভরযোগ্য সূত্রগুলো থেকে জানা গেছে, ঈদুল আজহার ছুটি শেষে গত সোমবার সকালে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের পক্ষ থেকে নিয়মিত তদারকির (রুটিন চেক) সময় রেড টেলিফোনে কোনো সংযোগ বা ডায়াল টোন পাওয়া যায়নি।
বিষয়টি তাৎক্ষণিকভাবে রাষ্ট্রীয় টেলিযোগাযোগ সংস্থা বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেডকে (বিটিসিএল) জানানো হয়।
খবর পেয়ে বিটিসিএলের একটি বিশেষ কারিগরি দল দ্রুত ঘটনাস্থলে পৌঁছে কাজ শুরু করে এবং দীর্ঘ প্রায় সাত ঘণ্টার নিবিড় প্রচেষ্টায় বিকেল ৩টার দিকে সংযোগটি পুনরায় সচল বা পুনরুদ্ধার করতে সক্ষম হয়। বিটিসিএলের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তারা জানান, সচিবালয়ের পুরোনো ২ নম্বর ভবন থেকে শুরু করে নতুন ১ নম্বর ভবন পর্যন্ত বিস্তৃত লাইনের বিভিন্ন স্থানে মূল্যবান কপার ক্যাবল কাটা ছিল এবং কিছু অংশের কোনো হদিস মেলেনি। এই মারাত্মক বিঘ্নতার কারণে শুধু সাধারণ টেলিফোনই নয়, বরং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়, মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ এবং জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের মতো রাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নীতিনির্ধারণী দপ্তরের অতিগুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত যোগাযোগও বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়েছিল।
এই স্পর্শকাতর ঘটনার পরপরই আইনি পদক্ষেপ হিসেবে সংশ্লিষ্ট থানায় একটি সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করা হয়েছে। পাশাপাশি, বিটিসিএলের পক্ষ থেকে স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে একটি আনুষ্ঠানিক চিঠি দেওয়া হয়েছে, যেখানে সচিবালয়ের সংশ্লিষ্ট এলাকার সিসিটিভি (CCTV) ফুটেজ পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে পর্যালোচনা করা, এই অন্তর্ঘাত বা চুরির সাথে জড়িতদের দ্রুত শনাক্ত করা এবং তাদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বিশেষভাবে অনুরোধ জানানো হয়েছে। একই সাথে সরকারের একাধিক রাষ্ট্রীয় গোয়েন্দা সংস্থাও ঘটনার অন্তরালের কারণ উদ্ঘাটনে গভীর তদন্ত শুরু করেছে।
স্বাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের উচ্চপদস্থ কর্মকর্তারা এই ঘটনাটিকে অত্যন্ত ‘অস্বাভাবিক’ এবং জাতীয় নিরাপত্তার জন্য উদ্বেগের বিষয় হিসেবে দেখছেন। তাঁদের মতে, প্রধানমন্ত্রীর রেড টেলিফোনের মতো দেশের সবচেয়ে স্পর্শকাতর ও সুরক্ষিত যোগাযোগ ব্যবস্থা অকার্যকর হয়ে পড়ার ঘটনাটিকে কোনোভাবেই হালকাভাবে নেওয়ার সুযোগ নেই এবং এর পেছনে সুনির্দিষ্ট কোনো উদ্দেশ্য রয়েছে কি না, তা অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে খতিয়ে দেখা হচ্ছে। তদন্তের আনুষ্ঠানিক প্রতিবেদন জমা হলেই এই ঘটনার প্রকৃত কারণ ও নেপথ্যের কুশীলবদের সম্পর্কে নিশ্চিত হওয়া যাবে বলে তাঁরা জানান।
এদিকে, দেশের সর্বোচ্চ প্রশাসনিক কেন্দ্র এবং কঠোর নিরাপত্তাবেষ্টিত সচিবালয়ের অভ্যন্তরে এমন চুরির ঘটনায় সামগ্রিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে প্রশাসনের ভেতরেই নতুন করে নানা প্রশ্ন ও ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।
প্রশাসনের কয়েকজন কর্মকর্তা ক্ষোভ প্রকাশ করে অভিযোগ করেছেন যে, দেশের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ও সুরক্ষিত প্রশাসনিক জোনের তকমা থাকা সত্ত্বেও সচিবালয়ে বহিরাগতদের প্রবেশ এবং অবাধ চলাচল নিয়ন্ত্রণের ক্ষেত্রে বর্তমান কড়াকড়ি ও নজরদারি একেবারেই যথেষ্ঠ নয়। বর্তমান উদ্ভূত পরিস্থিতিতে প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়সহ রাষ্ট্রের সকল গুরুত্বপূর্ণ ও কেভিআইপি (KVIP) স্থাপনাগুলোর সার্বিক নিরাপত্তা ব্যবস্থা আরও ঢেলে সাজানো এবং বহিরাগত প্রবেশ নিয়ন্ত্রণে কঠোরতম নজরদারি জারি করা এখন সময়ের দাবি।
/ডিবিটেক/এআই/ইকে/





