ডিজেল সংকটে অচল কৃষিযন্ত্র: আইডি কার্ডেই কি মিলবে মুক্তি
আধুনিক কৃষিতে শ্রম লাঘব ও উৎপাদন বাড়াতে দেশে কম্বাইন্ড হার্ভেস্টরের জনপ্রিয়তা দ্রুত বাড়ছে, যার ব্যবহার বাড়াতে সরকার হাওরাঞ্চলে ৭০ শতাংশ এবং অন্যান্য এলাকায় ৫০ শতাংশ পর্যন্ত ভর্তুকি প্রদান করছে । বর্তমানে দেশের মোট আবাদ করা জমির ১৫ শতাংশ ধান এই ডিজেলচালিত হারভেস্টর দিয়ে কাটা হয়। অন্যদিকে, ধান ঝাড়াই করার থ্রেশার মেশিনগুলোও ডিজেলের ওপর নির্ভরশীল। আর ধান কাটার ছোট যন্ত্র রিপার চলে পেট্রল দিয়ে।
ডিজেলের এই তীব্র সংকটের কারণে রাজশাহী, চট্টগ্রাম, সিলেট, গাজীপুর, বরগুনা, গোপালগঞ্জ, কুষ্টিয়া, ফরিদপুর, চট্টগ্রাম, জামালপুর, পটুয়াখালী, লালমনিরহাট, নীলফামারী ও মাদারীপুরের মতো জেলাগুলোতে সেচ কাজ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। অনেক এলাকায় কৃষকরা পাম্পে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে থেকেও তেল পাচ্ছেন না, আবার কোথাও কোথাও খোলাবাজারে ১৩০ থেকে ১৫০ টাকা পর্যন্ত বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে বাধ্য হচ্ছেন, যা সরাসরি উৎপাদন খরচ বাড়িয়ে দিচ্ছে।
ঝিনাইদহ জেলার শৈলকূপা উপজেলার কচুয়া গ্রামের কৃষক সুশান্ত বিশ্বাস বলেন, পেঁয়াজ আবাদের পরে একই জমিতে আমরা পাট বপন করি। কিন্তু ডিজেল না পেলে পাট আবাদের জন্য জমি প্রস্তুত করা কঠিন হয়ে যাবে। এ ছাড়া যথাসময়ে পানি সেচ দিতে না পারলেও ধানের ফলন খারাপ হতে পারে।
ঝিনাইদহ ফুয়েল পাম্প মালিক সমিতির সাধারণ সম্পাদক শরিফুল ইসলাম বলেন, ডিপো থেকে পাম্পগুলোতে চাহিদা মতো তেল দেওয়া হচ্ছে না। তারপরও এখন পর্যন্ত ডিজেলের সরবরাহ বেশ স্বাভাবিক আছে। কৃষকরা পাম্পে এলে ডিজেল পাচ্ছেন। আশা করছি, ডিজেলের সরবরাহে আগামী কয়েক সপ্তাহে তেমন কোনো নেতিবাচক প্রভাব পড়বে না।
বরিশালের উজিরপুর উপজেলার কৃষক বদি মিয়া জানান, পাম্পের তেল না পাওয়ায় সময়মতো পানি দিতে না পারায় ধানের চারা শুকিয়ে যাওয়ার আশঙ্কা দেখা দিয়েছে। তবে এই অবস্থার উত্তরণে ওই এলকার উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা কাপিল বিশ্বাস জানান, “কৃষকদের জন্য ডিজেল প্রাপ্তি নিশ্চিত করতে প্রত্যয়নপত্রের ব্যবস্থা করা হয়েছে। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তার সঙ্গে সমন্বয় করে এই সনদ দেওয়া হচ্ছে, যাতে অবৈধ মজুদ রোধ করা যায়।”
এ বিষয়ে সাকুরা পেট্রোল পাম্পের সরকারনিযুক্ত ট্যাগ অফিসার ও উপজেলা সমাজসেবা কর্মকর্তা মোহাম্মদ আবুল কালাম আজাদ বলেন, “পাম্পগুলো পর্যাপ্ত জ্বালানি পাচ্ছে না। তারপরও আমরা কঠোর নজরদারির মাধ্যমে সবার মধ্যে সমবণ্টনের চেষ্টা করছি।”
এদিকে গোপালগঞ্জ শহরতলীর বেদগ্রাম এলাকার মিতা ফিলিং স্টেশনে গিয়ে দেখা গেছে, ড্রাম, বোতল আর বিভিন্ন পাত্র নিয়ে ডিজেল পাওয়ার অপেক্ষায় ঘণ্টার পর ঘণ্টা বসে রয়েছেন কৃষকরা। কখন প্রয়োজনীয় তেল পেয়ে সেচ দিয়ে ফসল রক্ষা করবেন সেই চিন্তাই যেন তাদের চোখে মুখে। কিন্তু দীর্ঘ সময় বসে থাকার পরও কেউ চাহিদা মত তেল না পেয়ে আর কাওকে ফিরতে হয়েছে খালি হাতে।
ঝালকাঠির উপজেলার কৃষক জামাল উদ্দিন বলেন, পেট্রোলচালিত মেশিনের জন্য কাগজপত্র নিয়ে এসেও পাম্পে তেল পাচ্ছি না। এখন বোরো ক্ষেতে পানি দেওয়ার সময় কিন্তু তেলের অভাবে তা সম্ভব হচ্ছে না। আরেক কৃষক মহসিন আলী জানান, সকাল থেকে অপেক্ষা করে মাত্র ২০০ টাকার তেল পেয়েছেন, যা দিয়ে এক বিঘা জমিতেও সেচ দেওয়া সম্ভব নয়। প্রয়োজন অনুযায়ী ডিজেল ও পেট্রোল পাচ্ছেন না তারা। এতে ট্রাক্টর, সেচযন্ত্র পাওয়ার পাম্প, পাওয়ার টিলার, কীটনাশক দেওয়ার মেশিন, ধান কাটা ও মাড়াইয়ের যন্ত্র চালাতে পারছেন না কৃষকরা।
কৃষিযন্ত্র খাতের বিশেষজ্ঞরা এই সংকট মোকাবিলায় সমন্বিত এবং প্রযুক্তিভিত্তিক জ্বালানি সরবরাহ ব্যবস্থা চালুর প্রস্তাব দিয়েছেন। কৃষি যন্ত্রপাতি সরবরাহকারী কোম্পানিগুলোর কাছে যেহেতু সব যন্ত্রের মালিকদের তালিকা রয়েছে, তাই পরিচয়পত্র বা আইডিভিত্তিক তদারকির মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের হাতে তেল পৌঁছে দেওয়া সম্ভব বলে মনে করেন তারা।
সূত্রমতে, একটি কম্বাইন্ড হার্ভেস্টারের জন্য দৈনিক প্রায় ৬০ থেকে ৭০ লিটার ডিজেল প্রয়োজন হয়, যা সঠিক বরাদ্দের মাধ্যমে নিশ্চিত করলে কৃষিতে বড় ধরনের বিপর্যয় এড়ানো যাবে এবং জ্বালানি অবৈধ মজুতের সুযোগও থাকবে না। যদি দ্রুত এই সেচ ও ফসল কাটার মৌসুমে ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করা না যায়, তবে দেশের প্রধান ফসল বোরোর উৎপাদন লক্ষ্যমাত্রা অর্জন বাধাগ্রস্ত হতে পারে, যা সামগ্রিক খাদ্য নিরাপত্তার জন্য বড় ঝুঁকি হয়ে দাঁড়াবে।
প্রসঙ্গত, বর্তমানে মধ্যপ্রাচ্যে ইরান, যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের মধ্যে চলমান উত্তেজনার ফলে হরমুজ প্রণালিতে জাহাজ চলাচল ব্যাহত হওয়ায় বাংলাদেশে জ্বালানি তেল সরবরাহে বড় ধরনের প্রভাব পড়েছে। দেশে ডিজেলের বার্ষিক চাহিদা প্রায় ৪৫ লাখ মেট্রিক টন হলেও বর্তমানে মজুতের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে মাত্র ১ লাখ ২২ হাজার ৬৬০ টনে। দৈনিক ১২ হাজার টন চাহিদার বিপরীতে বর্তমানে পাওয়া যাচ্ছে ১১ হাজার ৫০০ টন, যা সামগ্রিক সরবরাহ ব্যবস্থায় ঘাটতি তৈরি করছে। বিশেষ করে ডিসেম্বর থেকে মে মাস পর্যন্ত চলমান কৃষি সেচ মৌসুমে ডিজেলের গুরুত্ব অপরিসীম, কারণ এই সময়ে সব ধরনের কৃষিযন্ত্রে প্রতি মাসে গড় সম্ভাব্য চাহিদা থাকে প্রায় ২ লাখ ৯ হাজার টন। বৃষ্টিপাতের পরিস্থিতির ওপর নির্ভর করে এই ছয় মাস কৃষি খাতের জন্যই দৈনিক প্রায় ৭ হাজার টন ডিজেলের প্রয়োজন হয়।
ডিবিটেক/এসএম/এমইউআইএম







