ই-কমার্স খাতে কর্মসংস্থান ও অর্থনীতির নতুন সম্ভাবনা
বাংলাদেশে গত এক দশকে ই-কমার্স খাত নীরবে কিন্তু দ্রুত গতিতে বিস্তার লাভ করেছে। একসময় এটি শুধু অনলাইনে পণ্য বিক্রির একটি নতুন মাধ্যম হিসেবে দেখা হতো। কিন্তু বাস্তবে আজ ই-কমার্স একটি পূর্ণাঙ্গ অর্থনৈতিক ইকোসিস্টেমে পরিণত হয়েছে। যার সঙ্গে জড়িত রয়েছে উৎপাদন, সরবরাহ ব্যবস্থা, ডিজিটাল মার্কেটিং, লজিস্টিকস, খুচরা বিক্রি এবং এমনকি রপ্তানিও।
বর্তমানে দেশে লক্ষাধিক তরুণ ও তরুণী ই-কমার্সের মাধ্যমে ব্যবসা বা কর্মসংস্থানের সঙ্গে যুক্ত। বিভিন্ন গবেষণা ও শিল্পখাতের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী বাংলাদেশে প্রায় ৪–৫ লাখ অনলাইন উদ্যোক্তা বিভিন্ন সামাজিক মাধ্যম ও ওয়েবসাইটের মাধ্যমে ব্যবসা পরিচালনা করছেন। এর সঙ্গে প্রায় ১০ থেকে ১৫ লাখ মানুষের কর্মসংস্থান রয়েছে। এই খাতের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো নারীদের অংশগ্রহণ, যেখানে বহু নারী উদ্যোক্তা ঘরে বসেই ব্যবসা পরিচালনা করছেন।
তবে ই-কমার্স খাতকে শুধু উদ্যোক্তা তৈরির ক্ষেত্র হিসেবে দেখলে এর প্রকৃত সম্ভাবনাকে ছোট করে দেখা হবে। বাস্তবে এই খাত একটি বৃহৎ দক্ষতা-নির্ভর কর্মসংস্থানের ক্ষেত্র। একটি ই-কমার্স ব্যবসা পরিচালনার জন্য প্রয়োজন হয় ডিজিটাল মার্কেটিং, গ্রাফিক ডিজাইন, কন্টেন্ট তৈরি, ওয়েবসাইট ব্যবস্থাপনা, কাস্টমার সার্ভিস, লজিস্টিকস ম্যানেজমেন্ট, পেমেন্ট সিস্টেম এবং ডাটা বিশ্লেষণের মতো বিভিন্ন দক্ষতার।
যদি পরিকল্পিতভাবে দেশের অন্তত এক লাখ শিক্ষিত তরুণকে এই ধরনের দক্ষতায় প্রশিক্ষণ দেওয়া যায়, তাহলে তারা শুধু চাকরি পাবে না, বরং অনেকেই উদ্যোক্তা হিসেবেও প্রতিষ্ঠিত হতে পারবে। ধরা যাক, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত একজন তরুণ মাসে গড়ে ৩০ হাজার টাকা আয় করতে পারে। সে ক্ষেত্রে এক লাখ দক্ষ কর্মীর মাধ্যমে বছরে প্রায় ৩৬ হাজার কোটি টাকার আয় অর্থনীতিতে যুক্ত হতে পারে। এই অর্থ সরাসরি বাজারে প্রবাহিত হয়ে ভোগ, বিনিয়োগ এবং উৎপাদন বৃদ্ধিতে ভূমিকা রাখবে।
ই-কমার্স খাতের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলো এর forward এবং backward integration। অনেক উদ্যোক্তা প্রথমে অনলাইনে পণ্য বিক্রি শুরু করলেও পরে নিজেরাই পণ্য উৎপাদন শুরু করেন। এতে ছোট ছোট উৎপাদন ইউনিট বা কারখানা গড়ে ওঠে, স্থানীয় কারিগর ও গ্রামীণ নারীদের কর্মসংস্থান তৈরি হয় এবং দেশীয় শিল্পের বিকাশ ঘটে। এটিকে বলা যায় backward integration।
অন্যদিকে অনেক ই-কমার্স ব্যবসা ধীরে ধীরে খুচরা দোকান বা শোরুম খোলা, কিংবা আন্তর্জাতিক মার্কেটপ্লেসে পণ্য রপ্তানির দিকে এগিয়ে যায়। এটিই forward integration। ফলে একটি অনলাইন ব্যবসা সময়ের সঙ্গে সঙ্গে উৎপাদন, খুচরা বিক্রি এবং রপ্তানি, এই তিনটি খাতেই অবদান রাখতে পারে।
যদি ধরা হয়, প্রশিক্ষণপ্রাপ্ত এক লাখ তরুণের মধ্যে অন্তত ৩০ হাজার উদ্যোক্তা তৈরি হয় এবং তাদের প্রত্যেকের গড় বার্ষিক বিক্রি হয় প্রায় ১৫ লাখ টাকা, তাহলে এই উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে বছরে প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকার ব্যবসায়িক কার্যক্রম সৃষ্টি হতে পারে। এই ব্যবসার একটি অংশ আবার উৎপাদন ও খুচরা খাতে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি করবে। ফলে সরাসরি ও পরোক্ষভাবে প্রায় দেড় থেকে দুই লাখ মানুষের কর্মসংস্থানের সুযোগ তৈরি হওয়া অসম্ভব নয়।
এই বাস্তবতায় একটি গুরুত্বপূর্ণ নীতিগত প্রশ্ন সামনে আসে। এই খাতকে কীভাবে আরও দ্রুত বিকশিত করা যায়। অনেক দেশের অভিজ্ঞতা বলছে, নতুন ডিজিটাল উদ্যোক্তা তৈরির জন্য শুরুতে কর ও ভ্যাটের ক্ষেত্রে কিছুটা নীতিগত সহায়তা দিলে খাতটি দ্রুত বিস্তার লাভ করে। যদি ই-কমার্সের ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের জন্য প্রাথমিক পর্যায়ে পাঁচ বছরের জন্য কর ও ভ্যাটের কিছু সুবিধা দেওয়া যায়, তাহলে উদ্যোক্তারা সহজে ব্যবসা দাঁড় করাতে পারবে এবং বাজার তৈরি করতে পারবে।
ধরা যাক, ই-কমার্স উদ্যোক্তাদের মোট বার্ষিক ব্যবসা প্রায় ৪৫ হাজার কোটি টাকা। এর ওপর গড়ে ৫ শতাংশ ভ্যাট হিসাব করলে বছরে প্রায় ২,২৫০ কোটি টাকার সম্ভাব্য রাজস্ব দাঁড়ায়। কিন্তু বাস্তবে এই খাতের একটি বড় অংশ এখনো ইনফরমাল অর্থনীতির মধ্যে রয়েছে, ফলে এই রাজস্বের বড় অংশই সরকার পায় না। অন্যদিকে যদি উদ্যোক্তাদের ব্যবসা গড়ে ওঠার সুযোগ দেওয়া হয়, তাহলে কয়েক বছরের মধ্যেই তারা ফরমাল অর্থনীতির অংশ হয়ে কর ও ভ্যাট প্রদানের সক্ষমতা অর্জন করবে।
ভাবুন তো, পাঁচ বছর পর এই উদ্যোক্তাদের একটি বড় অংশ স্থায়ী ব্যবসায় পরিণত হলো এবং তাদের সম্মিলিত ব্যবসা ৭৫ হাজার কোটি টাকায় পৌঁছালো। তখন কর ও ভ্যাট মিলিয়ে সরকার বছরে পাঁচ হাজার কোটির বেশি রাজস্ব পেতে পারে। অর্থাৎ স্বল্পমেয়াদে কিছু রাজস্ব ছাড় দিলেও দীর্ঘমেয়াদে একটি বড় করভিত্তি তৈরি হবে।
সবচেয়ে বড় বিষয় হলো এই খাতের মাধ্যমে দেশের বিপুল সংখ্যক শিক্ষিত তরুণ-তরুণীর কর্মসংস্থান তৈরি হবে। একই সঙ্গে গ্রামীণ উৎপাদন, নারী উদ্যোক্তা, ক্ষুদ্র শিল্প এবং ডিজিটাল অর্থনীতি নতুন গতি পাবে।
বাংলাদেশ এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ট্রান্সফর্মেশনের পথে দাঁড়িয়ে আছে। এই সময়ে যদি ই-কমার্স খাতকে একটি কৌশলগত শিল্পখাত হিসেবে বিবেচনা করে দক্ষতা উন্নয়ন, উদ্যোক্তা তৈরি এবং প্রাথমিক নীতিগত সহায়তা দেওয়া যায়, তাহলে এটি আগামী দশকে দেশের অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অন্যতম চালিকাশক্তি হয়ে উঠতে পারে। এই শক্তিকে সঠিকভাবে কাজে লাগাতে পারলে লাখো মানুষের জীবন বদলে দিতে পারে।
লেখকঃ সাবেক সভাপতি (ভারপ্রাপ্ত), ই-ক্যাব



