১টি আইএমইআই নাম্বারেই প্রায় ৪ কোটি মোবাইলফোন!

১টি  আইএমইআই নাম্বারেই প্রায় ৪ কোটি মোবাইলফোন!
২ জানুয়ারি, ২০২৬ ২০:২০  
৩ জানুয়ারি, ২০২৬ ০১:৪২  
১ জানুয়ারি থেকে এনইআইআর চালুর পরে 'ক্লোন ফোন' নিয়ে ভয়াবহ তথ্য বেরিয়ে এসেছে! শীর্ষ কিছু আইএমইআই নম্বরের তালিকা থেকে দেখা গেছে, মাত্র একটি আইএমইআই নম্বরের (৪৪০০১৫২০২০০০) অধীনে দেশে ১৯ লাখ ৪৯ হাজার ৮৮টি ডিভাইস আমদানি করা হয়েছে। ৩৫২২৭৩০১৭৩৮৬৩৪ নাম্বারে ১৭ লাখ ৫৮ হাজার ৮৪৮টি; ৩৫২৭৫১০১৯৫২৩২৬ নাম্বারে ১৫ লাখ ২৩ হাজার ৫৭১টি এবং শুধুমাত্র ১ ডিজিটের শূন্য আইএমইআই নাম্বারে আছে ৫ লাখ ৮৬ হাজার ৩৩১টি সেট। 

এছাড়াও দেশের মোবাইল নেটওয়ার্কে সচল “1111111111111”, “0000000000000”, “9999999999999” এবং এ ধরনের অনুরূপ প্যাটার্নে থাকা লক্ষ লক্ষ ভুয়া আইএমআই নম্বর সনাক্ত করেছে বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রক সংস্থা (বিটিআরসি)। এনইআইআর সফটওয়্যারে ধরা পড়া বিগত ১০ বছরের সর্বমোট সংখ্যা হিসেবে, শুধুমাত্র একটি আইএমইআই নাম্বার 99999999999999 এ পাওয়া গেছে ৩ কোটি ৯১ লক্ষ ২২ হাজার ৫৩৪টি!
তবে গ্রাহক ভোগান্তির কথা মাথায় রেখে এখনই এসব ‘ক্লোন’; ‘অবৈধ’ বা ‘নকল’ ফোনের আইএমইআই ‘গ্রে’ হিসাবে তালিকাভূক্ত করে এখনই সেগুলো ‘ব্লক’ করা হচ্ছে না বলে আশ্বস্ত করেছেন প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের দায়িত্বপ্রাপ্ত বিশেষ সহকারি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব। 
তিনি বলেছেন, বিভিন্ন কম্বিনেশন (Document ID+MSISDN+IMEI)। স্মার্টফোনের পাশাপাশি এ ধরনের আইএমইআই বিভিন্ন আইওটি ডিভাইসেরও হতে পারে। যদিও অপারেটর মোবাইল ডিভাইস, সিম সংযুক্ত ডিভাইস এবং IOT ডিভাইসের আইএমইআই আলাদা করতে পারে না। যেমন হতে পারে, সিসিটিভি বা এ ধরনের ডিভাইস হয়ত একই আইএমইআইনম্বরে আনা হয়েছে। তাই আমরা বৈধভাবে আমদানি করা IOT আমরা আলাদাভাবে ট্যাগের কাজ শুরু করেছি। খেয়াল করলে ১ লক্ষের উপর নেটওয়ার্কে সচল আছে এরকম ফেক এবং ডুপ্লিকেট IMEI দেখলে আপনি নিজেই চমকে উঠবেন।
তিনি আরও বলেন, আসলে না বুঝেই লক্ষ লক্ষ নাগরিক এসব নিম্নমানের নকল ফোন ব্যবহার করছেন। এসব ফোনের রেডিয়েশন টেস্ট, Specific Absorption Rate (SAR) Testing সহ বিভিন্ন ধরনের নিরাপত্তা টেস্ট হয়নি কখনও। চারটি মোবাইল অপারেটরের নেটওয়ার্কে ব্যাপকভাবে সচল এসব ফোন ছড়িয়ে রয়েছে। জনজীবনে অসুবিধা তৈরি হয় এমন কোনো পদক্ষেপে সরকার যাবে না। এসব ফোন বন্ধ করা হবে না, গ্রে হিসেবে ট্যাগ করা হবে।
প্রাপ্ত তথ্য বলছে, ফেক এবং ডুপ্লিকেট আইএমইআই হিসেবে এরইমধ্যে বিটিআরসি ২৪টি আইএমইআই সনাক্ত করেছে যেগুলোর প্রতিটির অধীনে বাজারে লক্ষাধিক মোবাইল সেট সচল রয়েছে। আইএমইআই নাম্বর ৩৫৪৬৪৮০২০০০২৫ এর অধীনে ৫ লাখ ৩৯ হাজার ৬৪৮টি; ৫৮৬৮৮০০০০০০১৫ নাম্বারের অধীনে ৫ লাখ ৩২ হাজার ৮৬৭টি; ৮৬৭৪০০০২০৩১৬৬১ নাম্বারের অধীনে ৪ লাখ ৬৩ হারা ১০৭টি, ৮৬৭৪০০০২০৩১৬৬২ নাম্বারের অধীনে ৪ লাখ ১৩ হাজার ৮১৪টি এবং ১৩৫৭৯০২৪৬৮১১২২ নাম্বারের অধীনে ২ লাখ ৭৬ হাজার ৯০৭টি ফোন রয়েছে।
একইভাবে ৩৫২১০৮০১০০০২৩০ নাম্বারের অধীনে লাখ ১৩ হাজার ৭৮৯টি; ১৫১৫১৫১৫১৫১৫ নাম্বারের অধীনে লাখ ১০ হাজার  ৩৭টি; ৩৫৯৭৫৯০০২৫১৪৯৩ নাম্বারের অধীনে লাখ  ৯৪ হাজার ৭৮২টি; ৩৫৮৬৮৮০০০৯৩৮৫ নাম্বারের অধীনে লাখ ৯০ হাজার ৩৯৩টি; ৩৫৫০৫০০২০৯৮৪৫১ নাম্বারের অধীনে লাখ ৬৮ হাজার ৫৬০টি; ৩৫৯৪৫৪৭৮৪৯৮১৮৮ নাম্বারের অধীনে লাখ ৫৮ হাজার ৫৫৬টি; ৩৫৪৬৪৮০২০০০০০ নাম্বারের অধীনে লাখ ৫০ হাজার ৫৪৬টি; ৩৫৩৯১৯০২৫৬৮০১৩ নাম্বারের অধীনে লাখ ৪৭ হাজার ৬৫টি; ৩৫৯৭৩৮০০৯৫৫৩৪০ নাম্বারের অধীনে লাখ ২৭ হাজার ১৮৪টি এবং ৩৫৩২৫৯০৫৪৫৭৪৬৮ নাম্বারের অধীনে লাখ ২৬ হাজার ৫৯৬টি সেট সনাক্ত করা হয়েছে। 
এ বিষয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন, আমরা অনুমান করেছি যে ক্লোন ও নকল ফোনের ছড়াছড়ি আছে, তবে বুঝতে পারিনি ভয়াবহতা এতটা গভীর। তাই বাংলাদেশের নাগরিকদের কাছে এভাবে আন-অফিশিয়াল নতুন ফোনের নামে নকল ফোন বিক্রি করা হয়েছে, এমন প্রতারণা অভাবনীয়, নজিরবিহীন। এই চক্রের লাগাম টানা জরুরি। 
প্রসঙ্গত, বাংলাদেশ ব্যাংকের ২০২৪ সালের একটি প্রতিবেদন মতে, ৭৩ শতাংশ ডিজিটাল জালিয়াতি ঘটে অনিবন্ধিত ডিভাইসে। বিটিআরসি ও এমএফএস প্রতিষ্ঠানগুলোর যৌথ তথ্য অনুযায়ী, ২০২৩ সালে ই[কেওয়াইসি  জালিয়াতির ৮৫ শতাংশ ঘটেছিল অবৈধ ফোন, কিংবা পুনঃপ্রোগ্রাম করা হ্যান্ডসেট ব্যবহার করে। ২০২৩ সালে ১,৮ লাখ ফোন চুরির রিপোর্ট হয় (রিপোর্ট হয়নি এমন সংখ্যা আছে আরও কয়েক লক্ষ), এসব ফোনের অধিকাংশই উদ্ধার করা যায়নি।
সূত্রমতে, চার অপারেটরের নেটওয়ার্কে সচল ১৯ লাখ ৭৬ হাজার আইফোনের মধ্যে ১৯ লাখ ৫৫ হাজারই বৈধ আমদানির তালিকায় নেই–অর্থাৎ অবৈধ। চোরাই পথে এসেছে। সাম্প্রতিক হিসাব অনুযায়ী এই সংখ্যা ২১ লাখের কাছাকাছি হতে পারে। একইভাবে, দেশে সচল ২ কোটি ৩১ লাখ ২৯ হাজার স্যামসাং ফোনের ১ কোটি ৪৯ লাখ ২৬ হাজার অবৈধ। ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে দেশে এনে বিক্রি করা হয়েছে। ১০ আইএমইআই নম্বরের বিপরীতে ৫০ লাখ মোবাইল ফোন আছে! বিশ্লেষণে দেখা যায়,  বাংলাদেশে ব্যবহৃত অধিকাংশ মোবাইল ফোন অবৈধভাবে বাজারে এসেছে। লাগেজ পার্টি ট্যাক্স ফাঁকি দিয়ে এসব ফোন এনেছে। এ কারণে শোরুমের যে মোবাইল ফোনের দাম ৩০ হাজার টাকা, সেটাই বসুন্ধরা-ইস্টার্নের ননব্র্যান্ড দোকানে ২০ হাজার টাকায় বিক্রি হয়। আবার এসব নকল মোবাইল ফোন বিক্রি চালিয়ে যেতে এনাইআইআর বন্ধের দাবিতে ১ জানুয়ারি বিটিআরসি’তে হামলা ও ভাঙচুরও করা হয়েছে। এক্ষেত্রে ব্যবসায়ীরা যুক্তি দেন, মোবাইল ফোনে ৩৫ থেকে ৬১ শতাংশ পর্যন্ত ট্যাক্স বসিয়েছে সরকার। তাই তারা বিদেশ থেকে লাগেজে মাল এনে, কম দামে বিক্রি করেন। সাধারণ মানুষ তাদের কারণেই কম দামে মোবাইল ফোন পাচ্ছে। এই ব্যবসাকে চোরাই নয়, গ্রে-মার্কেট নাম দিয়ে বুক ফুলিয়ে ব্যবসা করছেন।
ডিবিটেক/এফএ/জেইউ/ইকে