টেলিকম নীতিমালায় বিদেশী বিনিয়োগ প্রীতি নিয়ে শঙ্কা দেশীয় উদ্যোক্তাদের

টেলিকম নীতিমালায় বিদেশী বিনিয়োগ প্রীতি নিয়ে শঙ্কা দেশীয় উদ্যোক্তাদের
২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩:০৩  
২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ১৩:১৩  

এক বছর ধরে উদ্যোক্তা ও বিনিয়োগকারীদের সঙ্গে বৈঠকের পর ২৫ এপ্রিল, শনিবার প্রথমবারের মতো দেশের টেলিকম খাতের নীতি ও অবকাঠামো নিয়ে নতুন সরকারের সঙ্গে খাত সংশ্লিষ্টদের নিয়ে বিশেষায়িত সংলাপ করলো টিআরএনবি। 

রাজধানীর হলিডে ইন হোটেলের ইলিশ হলে অনুষ্ঠিত এই সংলাপে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত আছেন প্রধানমন্ত্রীর তথ্যপ্রযুক্তি ও টেলিকম উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। বিশেষ অতিথি হিসেবে আছেন বিটিআরসি চেয়ারম্যান এমদাদ উল বারী।

সভায় জানানো হয়, বর্তমানে টেলিযোগাযোগ খাতকে আরও আধুনিক ও বিনিয়োগবান্ধব করার লক্ষ্যে নতুন নীতিমালার আলোচনা চলছে। এই নীতিতে লাইসেন্স সংখ্যা কমানো, প্রযুক্তি নিরপেক্ষতা নিশ্চিত করা এবং বিদেশি বিনিয়োগ আকর্ষণের সুযোগ রাখা হয়েছে। তবে একই সঙ্গে বড় বিদেশি প্রতিষ্ঠানের বাজার নিয়ন্ত্রণ বৃদ্ধি, স্থানীয় উদ্যোক্তাদের প্রতিযোগিতায় পিছিয়ে পড়া, বৈদেশিক মুদ্রা বহির্গমন বৃদ্ধি এবং ডাটা নিরাপত্তা ঝুঁকির মতো বিষয়েও উদ্বেগ রয়েছে। তাই নতুন নীতিমালা প্রণয়নের ক্ষেত্রে জাতীয় স্বার্থ, ন্যায্য প্রতিযোগিতা এবং স্থানীয় বিনিয়োগ সুরক্ষাকে গুরুত্ব দেওয়া প্রয়োজন।

সংগঠনের সভাপতি সমির কুমার দে'র সঞ্চালনায় সূচনা বক্তব্য দেন সাধারণ সম্পাদক মাসুদুজ্জামান রবিন। সংলাপের শুরুতেই টেলিকম নীতিমালার আদ্যোপান্ত তুলে ধরেন প্রযুক্তিবিদ সুমন আহমেদ সাবির। তিনি জানান, ২০০৭ সালে রাজনৈতিক বিবেচনায় লাইসেন্স দিয়ে এই খাতে লুটপাটের সুযোগ তৈরি করা হয়। এনটিটিএন এর ফাইবারের বিস্তৃতির কারণে ২০১৫ সালে বাড়তে থাকে আইএসপি।

তিনি জানান, নতুন নীতিমালায় মোবাইল অপারেটরদের কথা ভেবে ওপরের লেয়ারে সার্বভৌমত্ব ঝুঁকিতে ফেলা হয়েছে। দেশীয় উদ্যক্তাদের চেয়ে বিদেশী উদ্যোক্তাদের তুলনামূলক অধিক সুযোগ দেওয়া হয়েছে। এর মাধ্যমে দেশের টেলিকম খাতে ইস্ট ইন্ডিয়া কোম্পানি গড়ে তোলা হচ্ছে। অথচ দেশের আইেসপি'রা ব্যাপক কর্মসংস্থান সৃষ্টি করেছে। 

আর এই বিকাশকে ত্বরান্বিত করতে রেভিনিউ শেয়ার উঠিয়ে দিয়ে বিটিআরসি'র সক্ষমতা বাড়ানোর পরামর্শ দেন এই প্রযুক্তিবিদ। 

তিনি বলেন, বিদেশীদের প্রতি বেশি ভালোবাসা না দেখিয়ে দেশীয় উদ্যোক্তাদের সক্ষমতা বাড়াতে হবে। তাদের ওপর থেকে রেভিনিউ শেয়ার  উঠিয়ে নিলে সেবা যেমন সহজলভ্য হবে, তেমনি মানও বাড়বে। সার্বভৌমত্ব রক্ষায় অবকাঠামো তৈরিতে শতভাগ দেশীয় কোম্পানিকে নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশেই রাউটার, মডেম ইত্যাদি তৈরিতে এগিয়ে আসতে হবে। 

বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের উন্নয়ন ও ভবিষ্যৎ সম্ভাবনা তুলে ধরে সুমন আহমেদ জানান, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত গত দুই দশকে দেশের অন্যতম দ্রুত বিকাশমান ও গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক খাতে পরিণত হয়েছে। একসময় সীমিত মোবাইল সংযোগ, ব্যয়বহুল ইন্টারনেট সেবা এবং শহরকেন্দ্রিক যোগাযোগ ব্যবস্থার মধ্যে সীমাবদ্ধ এই খাত বর্তমানে জাতীয় উন্নয়ন, ডিজিটাল অর্থনীতি, শিক্ষা, স্বাস্থ্যসেবা ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের মূল ভিত্তি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। ১৯৯০-এর দশকে ই-মেইল ও প্রাথমিক ইন্টারনেট সেবার মাধ্যমে যাত্রা শুরু হলেও ধীরে ধীরে মোবাইল নেটওয়ার্ক, ব্রডব্যান্ড, ফাইবার অপটিক এবং আন্তর্জাতিক সংযোগ বৃদ্ধির ফলে দেশের যোগাযোগ ব্যবস্থায় বৈপ্লবিক পরিবর্তন এসেছে।
২০০৭ সালের পর টেলিযোগাযোগ খাতে নীতিগত সংস্কার নতুন গতি এনে দেয়। আন্তর্জাতিক ভয়েস ও ডাটা সেবা নিয়ন্ত্রণ, অবৈধ VoIP কার্যক্রম বন্ধ এবং সরকারি রাজস্ব সুরক্ষার লক্ষ্যে নতুন লাইসেন্সিং কাঠামো চালু করা হয়। এর ফলে আন্তর্জাতিক যোগাযোগ ব্যবস্থায় শৃঙ্খলা আসে এবং সরকার রাজস্ব আয় বৃদ্ধি করতে সক্ষম হয়। একই সময়ে জাতীয় পর্যায়ে টেলিযোগাযোগ অবকাঠামো বিস্তারের জন্য ফাইবার অপটিক নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণ শুরু হয়, যা দেশের ডিজিটাল অগ্রগতির অন্যতম ভিত্তি হিসেবে কাজ করে।
Nationwide Telecommunication Transmission Network বা NTTN চালুর মাধ্যমে জেলা, উপজেলা এবং ইউনিয়ন পর্যায়ে ফাইবার সংযোগ পৌঁছে যায়। এর ফলে ইন্টারনেটের গতি বৃদ্ধি পায়, ব্যান্ডউইথের দাম কমে আসে এবং সারা দেশে ব্রডব্যান্ড সেবা সহজলভ্য হয়। মোবাইল অপারেটর, ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান, ব্যাংক, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, সরকারি অফিস ও বেসরকারি খাত এই অবকাঠামো ব্যবহার করে দ্রুত সেবা সম্প্রসারণ করতে সক্ষম হয়। এর ফলে শহর ও গ্রামের ডিজিটাল বৈষম্য অনেকাংশে কমে আসে।
তার ভাষায়, এই উন্নয়নের ফলে দেশের অর্থনীতিতে বড় ধরনের পরিবর্তন দেখা যায়। ই-কমার্স, মোবাইল ব্যাংকিং, অনলাইন শিক্ষা, ফ্রিল্যান্সিং, আউটসোর্সিং, টেলিমেডিসিন এবং তথ্যপ্রযুক্তিনির্ভর নতুন কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হয়। বহু স্থানীয় উদ্যোক্তা ISP, ফাইবার নেটওয়ার্ক, ডাটা সেন্টার এবং প্রযুক্তি সেবায় বিনিয়োগ করে নতুন শিল্পখাত গড়ে তুলেছেন। ফলে টেলিযোগাযোগ খাত এখন শুধুমাত্র যোগাযোগের মাধ্যম নয়, বরং জাতীয় অর্থনীতির অন্যতম চালিকাশক্তি।
সুমন বলেন, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাতের ভবিষ্যৎ অত্যন্ত সম্ভাবনাময়। 5G প্রযুক্তি, Internet of Things, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, স্মার্ট সিটি, ক্লাউড সেবা এবং ডিজিটাল শিল্পায়নের মাধ্যমে এই খাত আরও বিস্তৃত হতে পারে। সঠিক পরিকল্পনা, শক্তিশালী নিয়ন্ত্রক কাঠামো, স্থানীয় ও বিদেশি বিনিয়োগের ভারসাম্য এবং আধুনিক প্রযুক্তি ব্যবহবাংলাদেশ দক্ষিণ এশিয়ার অন্যতম শক্তিশালী ডিজিটাল অর্থনীতিতে পরিণত হওয়ার সুযোগ রাখে।
'সার্বিকভাবে বলা যায়, বাংলাদেশের টেলিযোগাযোগ খাত দেশের উন্নয়ন যাত্রায় একটি বড় সফলতার গল্প। ভবিষ্যতে দূরদর্শী নীতি ও কার্যকর বিনিয়োগ নিশ্চিত করা গেলে এই খাত জাতীয় অগ্রগতির আরও বড় চালিকাশক্তি হয়ে উঠবে'- যোগ করেন এই প্রযুক্তিবিদ।

সেমিনারে অন্যান্যের মধ্যে বক্তব্য রাখছেন এআইওবি সাধারণ সম্পাদক নূরুল আলম, টিআইওবি সদস্য সচিব দিদারুল ইসলাম, আইজিডব্লিউ অপারটর্স ফোরামের মুশফিক মঞ্জুর, এমটব মহাসচিব মোহাম্মদ জুলফিকার, আইআইজিডব্লিউ ফোরামের সাধারণ সম্পাদক আহমেদ জুনায়েদ, আইএসপিএবি সভাপতি আমিনুল হাকিম এবং ফাইবার অ্যাট হোম চেয়ারম্যান মইনুল হক সিদ্দিকী।

ডিবিটেক/এসএ/ইকে