বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত প্রবেশ করছে নতুন বাস্তবতায়

বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত প্রবেশ করছে নতুন বাস্তবতায়
২০ এপ্রিল, ২০২৬ ১৮:১৩  

বাংলাদেশের অর্থনৈতিক অগ্রযাত্রা এখন শুধু অবকাঠামো উন্নয়ন বা শিল্পায়নের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই; প্রযুক্তিনির্ভর উদ্ভাবন ও উদ্যোক্তা সংস্কৃতিও সমান গুরুত্ব নিয়ে সামনে এগিয়ে আসছে। গত এক দশকে দেশের স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ধীরে ধীরে পরিণত হয়েছে এবং এখন এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সন্ধিক্ষণে দাঁড়িয়ে, যেখানে সম্ভাবনা যেমন বড়, তেমনি নীতি, বিনিয়োগ ও কাঠামোগত সমন্বয়ের প্রয়োজনীয়তাও স্পষ্ট হয়ে উঠেছে।

এই প্রেক্ষাপটে সরকারি উদ্যোগগুলো বিশেষভাবে গুরুত্ব পাচ্ছে। আইসিটি ডিভিশনের অধীনে বাংলাদেশ হাইটেক পার্ক কর্তৃপক্ষ পরিচালিত ‘ডিজিটাল উদ্যোক্তা ও উদ্ভাবন ইকোসিস্টেম উন্নয়ন (ডিইআইইডি)’ প্রকল্পের মাধ্যমে দেশের স্টার্টআপ খাতকে আরও গতিশীল করার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

প্রকল্পটির আওতায় ‘স্টার্টআপ অ্যান্ড স্কেলআপ প্রোগ্রাম (এসএসপি)’ দেশের স্টার্টআপ খাতকে একটি কাঠামোবদ্ধ ও টেকসই রূপ দেওয়ার লক্ষ্যে কাজ করছে। উদ্যোক্তাদের দক্ষতা বৃদ্ধি, বাজার সংযোগ, বিনিয়োগ প্রস্তুতি এবং ব্যবসার সম্প্রসারণ, সবকিছু একত্রে এনে একটি সমন্বিত ইকোসিস্টেম তৈরির চেষ্টা চলছে।

এই উদ্যোগের অংশ হিসেবে আগারগাঁওয়ে বাংলাদেশ পর্যটন কর্পোরেশনের মিলনায়তনে আয়োজিত তিন দিনব্যাপী ‘ন্যাশনাল ডেমো ডে ২০২৬’ উদ্বোধন করেন প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ। 

তথ্য ও যোগাযোগ প্রযুক্তি বিভাগের সচিব কাজী আনোয়ার হোসেনের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ হাই-টেক পার্ক কর্তৃপক্ষের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মোহাম্মদ আনোয়ার উদ্দিন, বিশ্বব্যাংকের বেসরকারি খাতের সিনিয়র বিশেষজ্ঞ হোসনে ফেরদৌস সুমি, ডিইআইইডি প্রকল্পের পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ারসহ দেশি-বিদেশি বিনিয়োগকারী, আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিনিধিরা এবং সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা।


তথ্যানুযায়ী, মোট এক হাজার ৯১টি স্টার্টআপকে উন্নত প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়েছে, এর মধ্যে ৩০২টি স্কেলআপ পর্যায়ে উন্নীত হয়ে ‘ন্যাশনাল ডেমো ডে ২০২৬’ এ অংশগ্রহণ করেছে। রাজস্ব, কর্মসংস্থান এবং ভ্যালুয়েশনে ধারাবাহিক প্রবৃদ্ধি এই উদ্যোগের বাস্তব প্রভাবকে তুলে ধরে। একইসঙ্গে বিনিয়োগ প্রবাহও ধীরে ধীরে বাড়ছে, যা ভবিষ্যতের জন্য একটি ইতিবাচক ইঙ্গিত।

এছাড়াও ‘ন্যাশনাল ডেমো ডে ২০২৬’-এ প্রতিদিন সেশনভিত্তিক সাতটি সেক্টরাল ইন্ডাস্ট্রির স্টার্টআপ তাদের ব্যবসায়িক মডেল বিনিয়োগকারীদের সামনে উপস্থাপন করার পাশাপাশি এক্সপোতে পণ্য ও সেবাগুলো ডেমো হিসেবে প্রদর্শন করে। তিন দিনব্যাপী এ প্রোগ্রামে দেশের প্রথম সারির ব্যাংক, শিল্পপ্রতিষ্ঠান, ভেঞ্চার ক্যাপিটাল ও এঞ্জেল ইনভেস্টররা অংশ নেন, যা উদ্যোক্তাদের জন্য বিনিয়োগ ও বাজার সম্প্রসারণের বাস্তব সুযোগ তৈরি করে।

এই পুরো আয়োজনের মধ্যে সবচেয়ে তাৎপর্যপূর্ণ অংশ ছিল উদ্বোধনী দিনে অনুষ্ঠিত ‘স্টার্টআপ পলিসি, বিনিয়োগ ও সম্ভাবনা’ শীর্ষক প্যানেল আলোচনা। এটি শুধু একটি আনুষ্ঠানিক সেশন ছিল না; বরং দেশের স্টার্টআপ খাতের ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা নির্ধারণে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে।

আলোচনাটি সঞ্চালনা করেন অ্যাকসেলারেটিং বাংলাদেশের ন্যাশনাল প্রোগ্রাম কো-অর্ডিনেটর মো. আরিফুর রহমান। প্যানেলে অংশ নেন ইনোভেশন ডিজাইন অ্যান্ড এন্টারপ্রেনারশিপ একাডেমির (আইডিইএ) প্রজেক্ট ডিরেক্টর মুর্তুজা জুলকার নাঈন নোমান, বাংলাদেশ ব্যাংকের এসএমই ও স্পেশাল প্রোগ্রামস বিভাগের পরিচালক নওশাদ মোস্তফা, স্টার্টআপ বাংলাদেশ লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল হাই, অ্যাঙ্করলেস বাংলাদেশের ম্যানেজিং ডিরেক্টর ও সিইও রাহাত আহমেদ এবং টেন মিনিট স্কুলের ফাউন্ডার ও সিইও আয়মান সাদিক।

এ আলোচনায় স্টার্টআপ ইকোসিস্টেমের বিভিন্ন দিক উঠে আসে, বিশেষ করে নীতিগত সহায়তা, বিনিয়োগ প্রবাহের সীমাবদ্ধতা, উদ্যোক্তাদের বাস্তব চ্যালেঞ্জ এবং আন্তর্জাতিক বাজারে প্রবেশের সম্ভাবনা। 

বক্তারা উল্লেখ করেন, বাংলাদেশের স্টার্টআপ খাত এখন আর কেবল আইডিয়া-ভিত্তিক নয়; বরং এটি ধীরে ধীরে একটি বিনিয়োগযোগ্য ও স্কেলযোগ্য খাতে রূপ নিচ্ছে। এই অগ্রগতিকে টেকসই করতে হলে প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি নীতি সহায়তা, স্থানীয় বিনিয়োগকারীদের অংশগ্রহণ বৃদ্ধি এবং উদ্যোক্তাদের জন্য বাস্তবমুখী সহায়তা কাঠামো।

এ প্রসঙ্গে প্রকল্প পরিচালক মনজুর মোহাম্মদ শাহরিয়ার বলেন, আমাদের লক্ষ্য শুধু স্টার্টআপ তৈরি করা নয়; বরং একটি টেকসই ও বিনিয়োগযোগ্য ইকোসিস্টেম গড়ে তোলা, যেখানে উদ্ভাবন, নীতি সহায়তা এবং বাজার সংযোগ সমন্বিতভাবে কাজ করে উদ্যোক্তাদের টেকসই প্রবৃদ্ধি নিশ্চিত করবে। সঠিক নীতি, বিনিয়োগ এবং উদ্ভাবনের সমন্বয় নিশ্চিত করা গেলে বাংলাদেশ খুব দ্রুতই আঞ্চলিক, এমনকি বৈশ্বিক স্টার্টআপ মানচিত্রে একটি শক্ত অবস্থান তৈরি করতে সক্ষম হবে।

প্যানেল আলোচনায় আরও গুরুত্ব দেওয়া হয় সরকার, আর্থিক প্রতিষ্ঠান এবং বেসরকারি খাতের মধ্যে সমন্বয় বৃদ্ধির ওপর। বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধুমাত্র ফান্ডিং নয়, মেন্টরশিপ, বাজারে প্রবেশের সুযোগ এবং আন্তর্জাতিক সংযোগও সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ। এই দিকগুলোতে সমন্বিত উদ্যোগ নিলে বাংলাদেশের স্টার্টআপগুলো বৈশ্বিক প্রতিযোগিতায় আরও শক্ত অবস্থান তৈরি করতে পারবে।

বর্তমানে বাংলাদেশ একটি রূপান্তরমূলক পর্যায়ে রয়েছে, যেখানে স্টার্টআপ ইকোসিস্টেম ধীরে ধীরে একটি কাঠামোবদ্ধ ও সম্ভাবনাময় খাতে পরিণত হচ্ছে। এই যাত্রায় প্যানেল আলোচনার মতো প্ল্যাটফর্মগুলো অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এখান থেকেই উঠে আসে বাস্তব অভিজ্ঞতা, নীতিগত দিকনির্দেশনা এবং ভবিষ্যৎ করণীয়।

ডিবিটেক/এনএ/ইকে