জ্বালানি সংকটের স্থায়ী দাওয়াই

জ্বালানি সংকটের স্থায়ী দাওয়াই
২৪ এপ্রিল, ২০২৬ ২৩:৩৬  
২৫ এপ্রিল, ২০২৬ ০৬:৩৮  

এক সময় রাজপথে জ্বালানী তেলবাহী ট্যাঙ্কারের পেছনে লেখা 'জন্ম থেকে জ্বলছিকথাটি দেখে আমরা হয়তো একটু হাসতাম। কিন্তু সময়ের পরিহাসে সেই কৌতুক আজ বিশ্ব অর্থনীতির এক জ্বলন্ত বাস্তবতা। ইরান, যুক্তরাষ্ট্র আর ইসরাইলের মধ্যপ্রাচ্যীয় উত্তাপ আজ শুধু মানচিত্রের রেখা নয়, বরং আমাদের রান্নাঘর আর কারখানার চাকা পর্যন্ত পৌঁছে গেছে। বাংলাদেশও এর বাইরে নয়। সতেরো বছর আগে বিদ্যুতের জন্য যে হাহাকার আমরা দেখেছিলাম, আধুনিক প্রযুক্তির যুগে এসেও সেই একই ছায়া আমাদের দরজায় কড়া নাড়ছে।

তবে এই জ্বালা থেকে মুক্তির পথ কোনো আমদানিকৃত তরল জ্বালানিতে নেই; এর সমাধান লুকিয়ে আছে আমাদের মাথার ওপরের অফুরন্ত সূর্যালোকে। সরকার যদি আগামী কয়েক বছরের মধ্যে টেকসই সুফল পেতে চায়, তাহলে সরকারকে প্রথমেই শুল্কযুক্ত আমদানিনীতি থেকে একধাপ এগিয়ে শুল্কমুক্ত উৎপাদনবা লোকাল অ্যাসেম্বলিং-এ গুরুত্ব দিতে হবে সৌর বিদ্যুতের শক্তি সংরক্ষণে গড়ে তুলতে হবে ব্যাটারি হাব। পেট্রোলিয়াম জ্বালানীর খরচ কমাতে বাড়াতে বৈদ্যুতিক যান ও হোম অ্যাপলায়েন্সের ব্যবহার। এজন্য দরকার নিজস্ব নবায়নযোগ্য জ্বালানি, স্থিতিশীলতা, কম খরচ, দীর্ঘমেয়াদি নিরাপত্তা

এক্ষেত্রে শহরের প্রতিটি ছাদকে যদি বিদ্যুৎ কেন্দ্রে রূপান্তর করা যায়, তবে গ্রিডের ওপর চাপ কমে যাবে অর্ধেক সরকার চাইলেই উদ্যোক্তাদের মাধ্যমে সকরারি অফিসগুলোর ছাদকে সোলার হাব হিসেবে গড়ে তুলতে পারে। আমদানি নির্ভর জ্বালানী তেলের ওপর নির্ভরতা কমিয়ে দেশে বিদ্যমান অফুরন্ত প্রাকৃতিক সূর্যালোকে জ্বলানী সঙ্কটের আঁধার দূর করতে পারে স্থায়ী ভাবে। এক্ষেত্রে সোলার প্যানেল আমদানি সহজীকরণ করার বিকল্প নেই। পাশাপাশি সূর্যের শক্তিকে সংরক্ষণে লিথিয়াম-আয়ন বা আধুনিক সোডিয়াম-আয়ন ব্যাটারি সহজপ্রাপ্য করতে প্রয়োজনীয় কাঁচামাল আমদানিতে শুল্ক শূন্য করা এবং দেশে কারখানা স্থাপনে অন্তত ১০ বছরের ট্যাক্স হলিডে দেওয়া যেতে পারে পাশাপাশি সোলার প্যানেল বসানোর জন্য দীর্ঘমেয়াদী এবং স্বল্প সুদের গ্রিন লোননিশ্চিত করতে হবে এতে ব্যাটারির দাম কমলে সৌরবিদ্যুৎ শুধু দিনের আলোতে সীমাবদ্ধ থাকবে নাসরকারের এই ছোট্ট নীতিগত সহায়তায় ধনী-গরিব নির্বিশেষে সবাই উপকৃত হবে।

একইভাবে ঘণ্টার পর ঘণ্টা দাঁড়িয়ে জমিতে সেচের জন্য ব্যবহৃত স্যালো মেশিন, ধানকাটা, মাড়াইয়ে ব্যবহৃত হার্ভেস্ট মেশিন সহ মোটর চালিত সরঞ্জামের জন্য প্রয়োজনীয় তেল সংগ্রহকে জীবনের তেল ছুটে যাওয়ার মতো ত্রাহি অবস্থা থেকে নাগরিকদের মুক্তি দিতে হলে তাদের জন্য কৃষি-পরিবহন সব ক্ষেত্রেই ইভি সহজলভ্য করে দিতে হবে। কেননা, ইভি শুধু আজকের দিনে আস্ত একটা গাড়ি নয় এটি হয়ে উঠেছে প্রগতির গতি। তাই বৈদ্যুতিক যানের মোটর, কন্ট্রোলার এবং চার্জিং স্টেশনের যন্ত্রাংশ আমদানিতে বিশেষ ছাড় দিলে দেশে সাশ্রয়ী মূল্যের ই-বাইক বা থ্রি-হুইলার যেমন তৈরি হবে; তেমনি দেশের প্রয়োজনীয় কৃষি ও শিল্পকাজের জন্য ‍উদ্ভাবিত হবে নতুন নতুন যানইভি আমদানিতে শুল্ক মুক্ত সুবিধা দিলে তেলের গাড়ির সংখ্যা কমার পাশাপাশি জ্বালানী তেল আমদানিতে বাড়তি ব্যয় ও এই খাতের ওপর চাপ কমবে। কমবে শব্দ দূষণ, বায়ু দূষণও।

হ্যা, রাস্তায় বৈদ্যুতিক গাড়ি নামলেই হবে না, সেগুলোকে চার্জ করার সক্ষমতা থাকতে হবে আমাদের এজন্য দেশের প্রতিটি ফিলিং স্টেশনে বাধ্যতামূলকভাবে ডিসি ফাস্ট চার্জিং পয়েন্ট স্থাপনের নীতি গ্রহণ করতে হবে রাস্তার পাশে কিংবা গ্যারেজগুলোতে চার্জিং স্টেশন স্থাপন কিংবা উবারের মতো চার্জিং ইভি’র মতো ব্যবস্থা করা যেতে পারে।  একইসঙ্গে স্মার্ট মিটারিংয়ের মাধ্যমে রাতের বেলায় (যখন বিদ্যুতের চাহিদা কম থাকে) ইভি চার্জ দিলে বিশেষ ছাড় দেওয়ার ব্যবস্থা করতে হবে। এতে গ্রিড ম্যানেজমেন্ট সহজ হবে

বাংলাদেশের ডিজেল আমদানির একটা বড় অংশ ব্যয় হয় সেচ পাম্পে তাই দেশের প্রতিটি ডিজেলচালিত সেচ পাম্পকে সোলার পাম্পে রূপান্তর করতে সরকারি ভর্তুকি বাড়ানো আবশ্যক। এটি একদিকে কৃষকের খরচ কমাবে, অন্যদিকে জ্বালানি তেলের ওপর চাপ কমাবে

ইভি’র বৈদ্যুতিক চাহিদা মেটাতে নেট মিটারিং সহজীকরণ হতে পারে সহজ সমাধান। এক্ষেত্রে সাধারণ মানুষ যখন দেখবে তার ছাদের সোলার প্যানেল থেকে উৎপাদিত বিদ্যুৎ ব্যবহারের পর অতিরিক্ত অংশ সে সরকারের কাছে বিক্রি করতে পারছে এবং মাস শেষে বিদ্যুৎ বিল 'শূন্য' বা 'নেগেটিভ' আসছে, তখন এটি একটি সামাজিক আন্দোলনে পরিণত হবে

আর বিনিয়োগকারীরা তখনই আগ্রহী হবে যখন তারা দেখবে সরকারের নীতি দীর্ঘমেয়াদী তাই নবায়নযোগ্য জ্বালানি নিয়ে কাজ করতে গিয়ে যেন উদ্যোক্তাদের ১০টি দপ্তরে ঘুরতে না হয়। স্রেডা (SREDA)-কে আরও শক্তিশালী করে সব অনুমোদন এক জায়গা থেকে দেওয়ার ব্যবস্থা করা যেতে পারে

এভাবেই ‘সবুজ জ্বালানি’ আন্দোলনের মাধ্যমে আমরা যদি আজ ব্যাটারি প্রযুক্তি আর সৌরশক্তির দুয়ার পুরোপুরি খুলে দিই, তবে আগামী কয়েক বছরে লোডশেডিংয়ের শব্দটা আমাদের অভিধান থেকে মুছে যাবে। বাংলাদেশ তখন আর জ্বালানি সংকটে জ্বলবে না, বরং সূর্যের আলোয় আলোকিত এক টেকসই ভবিষ্যতের পথে এগিয়ে যাবে

লেখার শেষভাগে এসে মনে হলো- টেলিকম খাতের উদ্যোক্তা হিসেবে আমি জ্বালানী খাত নিয়ে এতো উদ্বিগ্ন কেন? সরকার কেনই বা আমার কথাকে আমলে নেবেন। সংশয় দূর করতে বলতে চাই- বাংলাদেশের গ্রাম থেকে শহর- প্রতিটি কল, প্রতিটি ডেটা প্যাকেট ভেসে যায় হাজারো টেলিকম টাওয়ারের ভেতর দিয়ে। আমরা যারা ব্রডব্যান্ড ক্যাবল টেনে নেটওয়ার্ক দেই তাদের সার্ভার জীবন্ত রাখতে লাগে বিদ্যুত। অর্থাৎ টেলিকম নেটওয়ার্কের এই অবকাঠামোর বড় একটি অংশ এখনো নির্ভরশীল ডিজেল জেনারেটর আর অস্থির গ্রিড বিদ্যুতের ওপর। জ্বালানি ব্যয় বাড়ছে, কার্বন নিঃসরণ বাড়ছে, আর সংকটের সময় নেটওয়ার্কও পড়ে যাচ্ছে ঝুঁকিতে। এই বাস্তবতায় “নিরবচ্ছিন্ন, পরিচ্ছন্ন শক্তি” আর বিলাসিতা নয়- এটি হয়ে উঠেছে টেলিকম খাতের টিকে থাকার পূর্বশর্ত

কল্পনা করুন, দেশের প্রত্যন্ত অঞ্চলের একটি টাওয়ার কিংবা আইএসপিদের পপ যেখানে গ্রিড বিদ্যুৎ আসে-যায়। আগে সেখানে দিনে কয়েক ঘণ্টা ডিজেল জেনারেটর চালিয়ে নেটওয়ার্ক সচল রাখা হতো। এখন সেই টাওয়ারের মাথায় বসেছে সোলার প্যানেল, পাশে লিথিয়াম-আয়ন ব্যাটারি ব্যাংক।  দিনে সূর্যের আলো থেকে বিদ্যুৎ উৎপন্ন হচ্ছে, রাতে সেই শক্তি জমা থাকছে ব্যাটারিতে। জেনারেটর চালু হচ্ছে কেবল জরুরি প্রয়োজনেএই “হাইব্রিড পাওয়ার সিস্টেম” শুধু খরচ কমাচ্ছে না-এটি কার্বন নিঃসরণও কমাচ্ছে ৪০-৬০% পর্যন্ত টেলিকম খাতের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো “নিরবচ্ছিন্নতা”। এখানে এক সেকেন্ডের বিদ্যুৎ বিভ্রাট মানেই হাজারো কল ড্রপ, ডেটা লস।

এখানেই আসে ইনগ্রিড এনার্জি স্টোরেজ সিস্টেম (ESS) তথা বড় আকারের ব্যাটারি (লিথিয়াম-আয়ন, LFP); স্মার্ট এনার্জি ম্যানেজমেন্ট সফটওয়্যার; গ্রিড, সোলার, জেনারেটর—সব উৎসের সমন্বয়এই সিস্টেম টেলিকম টাওয়ারকে ছোট একটি “স্বয়ংসম্পূর্ণ বিদ্যুৎ কেন্দ্র”-এ পরিণত করতে পারে। বাংলাদেশে ঘূর্ণিঝড়, বন্যা, ঝড়—সবই নিয়মিত। এই সময়ে টেলিকমই হয়ে ওঠে জীবনরেখা। সৌরশক্তি + স্টোরেজ + স্মার্ট UPS মিলিয়ে তৈরি করা যায় “ডিজাস্টার-রেজিলিয়েন্ট নেটওয়ার্ক”

ভাবুনতো, এই ইকো সিস্টেমে একজন উদ্যোক্তা গ্রামে একটি “এনার্জি সার্ভিস কোম্পানি (ESCO)” তৈরি করলেনতিনি টেলিকম টাওয়ার, স্থানীয় ব্যবসা, এমনকি চার্জিং স্টেশন—সবকিছুতে সৌরবিদ্যুৎ সরবরাহ করছেন তিনি বিদ্যুৎ বিক্রি করছেন “Power-as-a-Service” মডেলেঅপারেটররা বিনিয়োগ না করে শুধু ব্যবহার করছে  একসময়  যে টেলিকম টাওয়ার ছিল শুধু যোগাযোগের প্রতীক; এখন এটি হতে পারে শক্তির উৎস, স্থিতিশীলতার কেন্দ্র, এমনকি স্থানীয় অর্থনীতির চালিকাশক্তি

বাংলাদেশের জ্বালানি খাত আজ এক অস্বস্তিকর বাস্তবতার মুখোমুখি। আমরা যে মডেলের ওপর দাঁড়িয়ে আছি, সেটি টেকসই নয়; এটা এখন আর তর্কের বিষয় নয়, বাস্তবতা। বিশ্ববাজারে তেলের দাম বাড়লে, মধ্যপ্রাচ্যে উত্তেজনা তৈরি হলে বা ডলারের ওপর চাপ বাড়লে তার সরাসরি প্রভাব পড়ে আমাদের ঘরে, শিল্পে, কৃষিতে। অথচ সূর্যের আলো তো প্রতিদিনই মেলে। প্রশ্ন হলো, আমরা সেটিকে কেবল আলো হিসেবে দেখবো, নাকি শক্তিতে রূপান্তর করে ভবিষ্যৎ গড়বো? পরিসংখ্যান বলছে, বাংলাদেশে গড়ে ৪ থেকে ৫ কিলোওয়াট আওয়ার প্রতি বর্গমিটার প্রতিদিন সৌর বিকিরণ রয়েছে, যা জার্মানির চেয়ে দ্বিগুণ। অথচ জার্মানি তার বিদ্যুতের ৬০ শতাংশেরও বেশি নবায়নযোগ্য উৎস থেকে পাচ্ছে। এই একটি তথ্যই বলে দেয়, সূর্যের আলো আমাদের সম্পদ হওয়ার কথা, কিন্তু সেটা হয়ে উঠছে না। বিশেষজ্ঞদের মতে, শিল্প, বাণিজ্যিক ভবন ও বাসাবাড়ির ছাদ ব্যবহার করে ৩ হাজার থেকে ৪ হাজার মেগাওয়াট বিদ্যুৎ উৎপাদন সম্ভব। তাদের মতের সমান্তরালে আমার বিশ্বাস, বাংলাদেশের টেলিকম খাত যদি এই রূপান্তরকে আলিঙ্গন করে, তাহলে “নেটওয়ার্ক কভারেজ” শুধু মানচিত্রে নয়—এটি ছড়িয়ে পড়বে টেকসই উন্নয়নের প্রতিটি স্তরে

কেননা, প্রযুক্তি এখন সস্তা, বিনিয়োগকারীরা আগ্রহী, সম্ভাবনাও অফুরন্ত; তবু পরিবর্তন ধীর। কারণটা প্রযুক্তিগত নয়, নীতিগত। নবায়নযোগ্য প্রযুক্তিতে শুল্ক প্রত্যাহার, ৫ শতাংশের নিচে সুদে দীর্ঘমেয়াদি অর্থায়ন, দ্রুত অনুমোদনপ্রক্রিয়া (সর্বোচ্চ ৩০ দিন), বাধ্যতামূলক ছাদভিত্তিক সৌর সংযোগ, গ্রিড আধুনিকীকরণ এবং কার্যকর নেট মিটারিং—এসব নীতি বাস্তবায়ন ছাড়া কোনো পরিবর্তনই টেকসই হবে না।


লেখক: প্রকাশক, ডিজিবাংলা, সম্পাদক, সারবাংলা, উদ্যোক্তা ও জ্যেষ্ঠ সহ-সভাপতি, আইএসপিএবি


 

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।