জিনোমিক্স ও এআই-নির্ভর বায়োইনোভেশনের মাধ্যমে
দেশকে উদীয়মান বৈশ্বিক বায়োটেক হাব হিসেবে গড়ে তোলার প্রত্যয়
জিনোমিক্স ও এআই-নির্ভর বায়োইনোভেশনের মাধ্যমে দেশকে একটি উদীয়মান বৈশ্বিক বায়োটেক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার শপথ নিলেন শিক্ষাবিদ, গবেষক ও উদ্ভাবকেরা। আন্তর্জাতিক ডিএনএ দিবস উপলক্ষে অনুষ্ঠিত ‘ফিউচার বায়োটেক সামিট’ এবং ‘৬ষ্ঠ আন্তর্জাতিক ইয়াং বায়োটেকনোলজিস্টস কংগ্রেস ২০২৬’- এ এই প্রত্যয় ব্যক্ত করেন অংশগ্রহণকারীরা। “Omics and AI 2026” প্রতিপাদ্যে এবারের সম্মেলনে আধুনিক বায়োটেকনোলজি ও এআই-এর সমন্বিত প্রয়োগ, গবেষণার ভবিষ্যৎ দিকনির্দেশনা এবং বৈশ্বিক উদ্ভাবন ব্যবস্থায় বাংলাদেশের অবস্থানকে শক্তিশালী করার বিষয়গুলো গুরুত্ব পেয়েছে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নবাব আলী চৌধুরী সিনেট ভবনে ২৫ এপ্রিল, শনিবার অনুষ্ঠিত এই সম্মেলনের আয়োজন করেন নেটওয়ার্ক অব ইয়াং বায়োটেকনোলজিস্টস অব বাংলাদেশ (NYBB)। তরুণ বিজ্ঞানীদের ক্ষমতায়ন, উদ্ভাবন উৎসাহ এবং গবেষণাভিত্তিক দক্ষতা উন্নয়নে জীবপ্রযুক্তি, জিনোমিক্স এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাভিত্তিক গবেষণার সমন্বিত ভবিষ্যৎ নিয়ে একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্ম হিসেবে কাজ করেছে আন্তর্জাতিক এই সম্মেলনটি।
দিনব্যাপী আয়োজনে প্লেনারি সেশন, নীতি সংলাপসহ বিভিন্ন আলোচনা অনুষ্ঠিত হয়। আলোচনায় মাইক্রোবিয়াল জিনোমিক্স, মানব জেনেটিক্স, সংক্রামক রোগবিজ্ঞান, প্রিসিশন মেডিসিন এবং এআই-নির্ভর বায়োটেকনোলজির মতো সমসাময়িক বিষয়গুলো উঠে আসে। অস্ট্রেলিয়া, কোরিয়া, চীনসহ বিভিন্ন দেশের আন্তর্জাতিক গবেষক ও বিশেষজ্ঞরা এতে অংশগ্রহণ করেন, যা সম্মেলনটিকে একটি বহুজাতিক জ্ঞান বিনিময় ও গবেষণা সহযোগিতার মঞ্চে পরিণত করে। প্রায় ৭৫০ জন অংশগ্রহণকারী—শিক্ষার্থী, গবেষক, তরুণ শিক্ষক ও উদ্যোক্তা—দেশের ২৯টি বিশ্ববিদ্যালয়, গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং স্টার্টআপ থেকে এতে অংশ নেন।
উদ্বোধনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (প্রশাসন) প্রফেসর ড. সায়েমা হক বিদিশা। তিনি তাঁর বক্তব্যে বলেন, বর্তমান শতাব্দীতে তাল মিলিয়ে চলতে হলে বায়োটেকনোলজির কোনো বিকল্প নেই। তাই এই সেক্টরে আমাদের বিশেষ যত্ন দেয়া এখন সময়ের দাবি। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বাংলাদেশ বিজ্ঞান ও শিল্প গবেষণা পরিষদ (BCSIR)-এর চেয়ারম্যান ড. সামিনা আহমেদ এবং অ্যারিস্টোফার্মার পরিচালক সাদমান শাহরিয়ার হাসান। প্রত্যেকেই তাঁদের বক্তব্যে বায়োটেকনোলজির প্রয়োজনীয়তা বিশেষভাবে তুলে ধরেন।
পরবর্তীতে বাংলাদেশের জৈবপ্রযুক্তি ক্ষেত্রের চালেঞ্জ ও সম্ভাবনা নিয়ে বিশেষ পলিসি টকে মুল বক্তব্য উপস্থাপন করেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিয়ারিং বিভাগের অধ্যাপক ড. আদনান মান্নান। এছাড়াও অনুষ্ঠানে সঞ্চালক হিসেবে বক্তব্য রাখেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জেনেটিক ইঞ্জিনিয়ারিং অ্যান্ড বায়োটেকনোলজি বিভাগের প্রফেসর ড. মুশতাক ইবনে আইয়ুব ও প্রফেসর ড. মাহবুবুর রশীদ।
দিনব্যাপী বায়োটেকনোলজি বিষয়ক নানা আয়োজনে মুখর ছিল পরিবেশ। গবেষণাপত্র প্রদর্শনী, থিসিস উপস্থাপনা, পোস্টার প্রেজেন্টেশন, বিজনেস আইডিয়া কন্টেস্ট, ফটোগ্রাফি প্রতিযোগিতা এবং বায়োটেকনোলজি বিষয়ক ভিডিও প্রদর্শন—প্রতিটি আয়োজনেই অংশগ্রহণকারীদের স্বতঃস্ফূর্ত উপস্থিতি অনুষ্ঠানটিকে করে তোলে প্রাণবন্ত ও আকর্ষণীয়।
সবশেষে সমাপনী অধিবেশনে প্রধান অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন পরিবেশ, বন ও জলবায়ু পরিবর্তন মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী আব্দুল আউয়াল মিন্টু। তিনি বায়োটেকনোলজির গুরুত্ব তুলে ধরে বায়োটেকনোলজি বিষয়ক বিজনেসের বিভিন্ন পরিকল্পনা দেন এবং এই বিজনেস বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অর্থ সহায়তা দেয়ার ইচ্ছাও ব্যক্ত করেন। বিশেষ অতিথি হিসেবে উপস্থিত ছিলেন বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন, মাওলানা ভাসানী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপাচার্য অধ্যাপক ড. আনোয়ারুল আজিম আখন্দ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রো-ভাইস চ্যান্সেলর (একাডেমিক) অধ্যাপক ড. আবদুস সালাম এবং প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ের SDG বিষয়ক প্রধান সমন্বয়ক প্রফেসর ড. এস. এম. আবদুল আওয়াল। সভাপতিত্ব করেন ন্যাশনাল ইন্সটিটিউট অফ বায়োটেকনোলজির মহাপরিচালক অধ্যাপক ড. সগির আহমেদ| তাঁরা প্রত্যেকেই বায়োটেকনোলজিকে এগিয়ে নেয়ার আগ্রহ প্রকাশ করেন এবং এই সেক্টরে যে বৈষম্যগুলোর মুখোমুখি হতে হয়, তা নিরসনের অঙ্গীকার করেন। গবেষণা ক্ষেত্রে অবদান রাখার জন্য এওয়ার্ড অফ এক্সিলেন্স অর্জন করেন তরুন জীবপ্রযুক্তিবিদ ড. মোঃ মাহবুব হাসান, ড. শিপন দাশ গুপ্ত, সেজান রহমান, মো: আরিফ খান, উজ্জ্বল হোসেন, ড. রাসেল দাশ, ড. সাইদ আনোয়ার, ড. মীর মুবাশির খালিদ, ড. জান্নাতুল ফেরদৌস পাপড়ি| সেরা শিক্ষার্থী নির্বাচিত হয় ফারিহা আহমেদ রাইসা, ইয়াসিন রহমান, মুহাইমিনুর রহমান, তাহিয়া আকতার তান্মি, মামুনুজ্জামান|
সমাপনী অধিবেশনের সভাপতিত্ব করেন জাতীয় বায়োটেকনোলজি ইনস্টিটিউট-এর পরিচালক অধ্যাপক ড. মো. সগীর আহমেদ।
আয়োজকরা মনে করেন, এই সম্মেলন বাংলাদেশের বায়োটেকনোলজি খাতে নতুন গবেষণা দিগন্ত উন্মোচন করেছে এবং জিনোমিক্স ও এআই-নির্ভর বায়োইনোভেশনের মাধ্যমে দেশকে একটি উদীয়মান বৈশ্বিক বায়োটেক হাব হিসেবে প্রতিষ্ঠার পথে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে।
ডিবিটেক/এমআইএ/এমইউআইএম







