সমালোচনামূলক কনটেন্ট সরাতে গুগলকে সরকারের অনুরোধ কমেছে

সমালোচনামূলক কনটেন্ট সরাতে গুগলকে সরকারের অনুরোধ কমেছে

২০১০ সাল থেকে সরকারের কাছ থেকে ব্যবহারকারীর তথ্য চেয়ে আসা তথ্য অনুরোধ বিষয়ে ‘গুগল ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট’প্রকাশ করছে গুগল। ইতিমধ্যেই তিনবার স্বচ্ছতা প্রতিবেদন প্রকাশ করেছে। সবশেষ প্রকাশিস প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০১১ সাল থেকে চলতি বছরের জুন পর্যন্ত টেক জায়ন্ট বাংলাদেশ সরকারের পক্ষ থেকে কন্টেন্ট মুছে ফেলতে ১৯ হাজার ৪১৯টি কন্টেন্ট মুছতে ৪ হাজার ৫৩৫টি অনুরোধ পেয়েছে। 

এর মধ্যে সরকারের কাছ থেকে ২০২৪ সালে তৎকালীন সরকার গুগলের কাছে ৫ হাজার ৮২৭টি আধেয় সরানোর অনুরোধ করেছিল। এছাড়াও ৩ হাজার ৭৭১টি অ্যাকাউন্টের বিষয়ে তথ্য চেয়ে অনুরোধ ফেসবুকের মূল প্রতিষ্ঠান মেটার কাছে অনুরোধ পাঠিয়েছিলো। অনুরোধের পরিপ্রেক্ষিতে বাংলাদেশে ৪ হাজার ২২০টি কনটেন্টে ব্যবহারকারীদের প্রবেশ সীমিত করে দিয়েছিলো মেটা। এর আগে জানুয়ারি থেকে জুন পর্যন্ত ১ হাজার ৫০১টি অনুরোধের মাধ্যমে ২ হাজার ২৮৫টি অ্যাকাউন্টের বিষয়ে তথ্য চেয়েছিল সরকার। এ সময় ৬৮ দশমিক ৪০ শতাংশ ক্ষেত্রে সাড়া দেয় মেটা। সবমিলিয়ে ২০২৪ সালে ৩ হাজার ৭৭১টি অ্যাকাউন্টের বিষয়ে মেটার কাছে তথ্য চাওয়া হয়। ওই বছরের  শেষ ছয় মাসে মেটা বাংলাদেশে ১ হাজার ২৮০টির মতো কন্টেন্টে প্রবেশ সীমিত করে দেয়। এর মধ্যে ফেসবুকে মন্তব্য (কমেন্ট) ১ হাজার ১৪০টির বেশি, ১২৩টি পোস্ট, ৮টি প্রোফাইল রয়েছে। আর প্রথম ছয় মাসে মেটা ২ হাজার ৯৪০টির বেশি আধেয়তে প্রবেশ সীমিত করে দেয়। এর মধ্যে রয়েছে ২ হাজার ৬০০টির বেশি ফেসবুক মন্তব্য, পোস্ট ৩১৭টি, পেজ ও গ্রুপ ১টি এবং প্রোফাইল ৫টি।

এর আগে ২০২৩ সালের শেষ ৬ মাসে ২ হাজার ৯৪৩ কনটেন্ট সরাতে গুগলকে অনুরোধ করেছিলো বাংলাদেশ। এসব কনটেন্টের বেশির ভাগই ইউটিউবে প্রকাশ হওয়া ভিডিও। তার মধ্যে ৫২ শতাংশই সরকারের সমালোচনা ক্যাটাগরি এবং ১৭৫টি মানহানি-সংক্রান্ত। সরকারের এসব অনুরোধের ৫৮ দশমিক ৬ শতাংশে ক্ষেত্রে তেমন কোনো ব্যবস্থাই নেয়নি গুগল। ২০১১ সাল থেকে মোট ১২ হাজার ৫৬৯টি কনটেন্ট সরাতে সরকারের পক্ষ থেকে অন্তত ৩ হাজার ৭৬৬টি অনুরোধ করা হয়েছিলো।

সবশেষ চলতি বছরের প্রথমার্ধে ১ হাজার ২৩টি বিষয়ে গুগল’র কাছে ২৭৯ কনটেন্ট সরানোর জন্য  অনুরোধ করেছে অন্তর্বর্তী সরকার।  এই সংখ্যাটা গণঅভ্যুত্থানে পতিত আওয়ামী লীগ সরকারের জুন-ডিসেম্বর ২০২২ সময়কালে পাঠানো ছয় মাসের মোট সংখ্যা ৮৬৭ এর তিন ভাগের এক ভাগের চেয়েও কম। এছাড়াও ২০২৪ সালের জুলাই-ডিসেম্বর সময়কালে আওয়ামী আমলের সর্বোচ্চ পাঠানো ১৫৩টি অনুরোধ সংখ্যার সাড়ে পাঁচ ভাগের একভাগ। একইভাবে জুন-ডিসেম্বর’২০২৩ সময়ে পাঠানো সর্বনিম্ন  ৫৯১টি অনুরোধের অর্ধেকেরও কম। 

গুগল বলেছে, বাংলাদেশ থেকে অনুরোধ করা আইটেমগুলোর ৬৫ শতাংশের বেশি ক্ষেত্রে যথেষ্ট তথ্য ছিল না। কোনো ব্যবস্থা নেওয়া হয়নি ১৬ দশমিক ১ শতাংশে, কনটেন্ট আগেই সরানো হয়েছে ৯ শতাংশ, আইনি প্রক্রিয়ায় ২ দশমিক ৫ শতাংশ সরানো হয়েছে, নীতি অনুযায়ী ৩ দশমিক ৭ শতাংশ সরানো হয়েছে এবং ৩ দশমিক ৫ শতাংশের ক্ষেত্রে কনটেন্ট পাওয়া যায়নি।

২০২৫ সালের জানুয়ারি থেকে জুন মাসের স্বচ্ছতা প্রতিবেদন বাংলাদেশ অংশে এমনটাই জানিয়েছে তথ্যপ্রযুক্তি প্রতিষ্ঠান গুগল (অ্যালফাবেট)। 

এই প্রতিবেদন বিষয়ে সোশ্যাল হ্যান্ডেলে দেয়া এক পোস্টে প্রধান উপদেষ্টার ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্ত বিষয়ক বিশেষ সহকারি ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব লিখেছেন,  সরকার বাংলাদেশের নাগরিকদের এই নিশ্চয়তা দিচ্ছে যে, মিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং মিসইনফরমেশন–কেন্দ্রিক চরিত্রহননের বাইরে দেশের কোনো পত্রিকার নিউজ, সোশ্যাল মিডিয়ায় প্রকাশিত পোস্ট, ভিডিও কনটেন্ট, রিলস, অনলাইনে প্রকাশিত আর্টিকেল, অভ্যন্তরীণ কোনো সমালোচকের রাজনৈতিক সমালোচনামূলক কোনো কনটেন্ট সরাতে সরকার কোনো প্ল্যাটফর্মকে অনুরোধ করেনি।

তার ভাষায়,  আওয়ামী লীগ সরকারের তুলনায় বর্তমান সরকার এত কমসংখ্যক রিকুয়েস্ট পাঠাচ্ছে, যা উল্লেখযোগ্য নয়। এখানে আরও উল্লেখ্য যে, গুগলের ট্রান্সপারেন্সি রিপোর্ট মতে ৬৫ শতাংশ অনুরোধ হচ্ছে ‘Not enough information’ ক্যাটাগরিতে, অর্থাৎ এসব বিষয় বিশেষ উদ্দেশ্যপূর্ণ ছিল না। 

পাশাপাশি এসময়ে সন্ত্রাসবিরোধী আইনে আওয়ামীলীগের কার্যক্রমে নিষিদ্ধ হয় এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ আদালতে  (আইসিটি) জুলাইগণঅভ্যুত্থানে মানুষ খুনেরর বিচার শুরু হলে আওয়ামীলীগ সাইবার স্পেইসে ক্রমাগত বাংলাদেশের  বিরুদ্ধে এবং সরকারের বিরুদ্ধে ক্রমাগত মিস-ইনফো ক্যাম্পেইন সহ সন্ত্রাসের আহ্বা শুরু করে। 

দেশের সাইবার স্পেইসকে নিরাপদ রাখা, দেশের রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা রক্ষা, সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষা, ধর্মীয়, জাতিগত এবং নৃতাত্ত্বিক গোষ্ঠীগুলোকে অনলাইনে ও অফলাইনে সুরক্ষা দান সরকারের দৈনিক দায়িত্বের অংশ। যেহেতু সোশ্যাল মিডিয়া এবং সাইবার স্পেইস দেশের সামাজিক ও রাজনৈতিক স্থিতিশীলতার অন্যতম এলিমেন্ট হয়ে উঠেছে, তাই বিশ্বের সব দেশের মতই বাংলাদেশ সরকারকে এখানে রেগুলেশনের নিমিত্তে কিছু রিপোর্ট করতে হয়। পাশাপাশি সরকার অনলাইন জুয়া এবং গ্যাম্বলিং সংক্রান্ত কিছু টেক-ডাউন রিকুয়েস্টও করেছে।

মিসইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং মিসইনফরমেশন–কেন্দ্রিক বেআইনি মানহানিকর তথ্য দিয়ে কারো চরিত্রহননের চেষ্টা সংক্রান্ত তথ্য অপসারণের অনুরোধ আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এবং জাতীয় সাইবার সুরক্ষা এজেন্সির মাধ্যমে বিটিআরসিতে পাঠানো হয় বলে জানিয়েছেন প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী। তিনি লিখেছেন,  জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়কালে বাংলাদেশ ভেতর ও বা্ইরে থেকে এক অনাকাঙ্ক্ষিতহারে মিস-ইনফরমেশন ক্যাম্পেইনের শিকার হয়। প্রতিবেশী দেশের মিডিয়া থেকে ক্রমাগত বাংলাদেশের বিরুদ্ধে মিস-ইনফরমেশন ও প্রোপাগান্ডা ক্যাম্পেইন শুরু হয়। সরকারকে এসবের বিরুদ্ধে বেশকিছু রিপোর্ট প্ল্যাটফর্‌ম হিসেবে গুগলকে দিতে হয়েছে।  

কৈফিয়তের সুরে তিনি আরও বলেছেন, জানুয়ারি-জুন ২০২৫ সময়ে দেশে অস্থিতিশীলতা সৃষ্টিকারী বেশ কিছু ঘটনা ঘটেছে, শতাধিক বড়ো আন্দোলন হয়েছে, বেশকিছু মব হয়েছে, মাজার ভাংগা সহ সাম্প্রদায়িক ঘটনা ঘটেছে। বিশেষকরে "মব লিঞ্ছিং" বা গণপিটুনিতে হত্যার মতো ঘটনাও ঘটেছে কয়েকটি। বছরের শুরুতে, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়ে উঠেছিল, যার সাথে সরকারের একটি স্বাস্থ্য কার্ড বিতরণ কার্যক্রমও সম্পর্কিত ছিল। ২০২৫ সালের প্রথম ছয় মাসে বাংলাদেশ বিভিন্ন ধরনের অভ্যন্তরীণ চ্যালেঞ্জের সম্মুখীন হয়েছে। অন্যদিকে, রাজনৈতিক অঙ্গনেও ভিন্নমতের প্রতি অসহিষ্ণুতা এবং প্রতিশোধের প্রবণতা দেখা গেছে। ফলে সামাজিক স্থিতিশীলতা রক্ষায় নিয়মিত কাজের অংশ হিসেবে সোশ্যাল হারমনি রক্ষায় সরকার প্ল্যাটফর্‌ম গুলোকে সরকারি দায়িত্বশীল রিপোর্ট করেছে। 

তবে ‘বর্তমান সরকার সোশ্যাল মিডিয়া নিয়ন্ত্রণে আওয়ামী লীগের সিআরআই বা এ জাতীয় কোনো বট বাহিনী পরিচালনা করে না। বিটিআরসি বা এনটিএমসি সহ বাংলাদেশের কোন এজেন্সি বা সংস্থা সোশ্যাল মিডিয়া প্ল্যাটফর্মের কন্টেন্ট ডাউন করার ক্ষমতা রাখে না, সেজন্য যেকোনো অনুরোধ সোশ্যাল মিডিয়া ও টেক প্ল্যাটফর্মকে জানাতে হয়’- যোগ করেন তিনি।  তার যুক্তি অনুযায়ী,  যেহেতু গুগলের স্বচ্ছতা রিপোর্টে মিস ইনফরমেশন, প্রোপাগান্ডা এবং ক্যারেক্টার এসাসিনেশন বিষয়ক আলাদা কোনো  ক্যাটাগরি নেই, এসব রিপোর্ট সরকারের সমালোচনা ক্যাটাগরিতে দেখানো হয়েছে। তথাপি এই সংখ্যা আওয়ামী সরকারের তুলনায় সংখ্যায় পাঁচ ভাগের এক ভাগেরও কম।  

এদিকে, ফ্রিডম হাউসের ফ্রিডম অন দ্যা রিপোর্ট অনুযায়ী এ বছর বাংলাদেশ ইন্টারনেট স্বাধীনতার ক্ষেত্রে একক দেশ হিসেবে সারা বিশ্বে সর্বোচ্চ অগ্রগতি অর্জন করেছে। দেশটির স্কোর গত বছরের ৪০ থেকে বেড়ে ৪৫ হয়েছে, যা সাত বছরে সর্বোচ্চ। রিপোর্টে বলা হয়েছে, ২০২৪ সালের আগস্টে শিক্ষার্থী নেতৃত্বাধীন আন্দোলনের ফলে দমনমূলক সরকার অপসারিত হওয়ায় এবং অন্তর্বর্তী সরকার ইন্টারনেট বন্ধ প্রতিরোধে পদক্ষেপ এবং সাইবার সুরক্ষায় ইতিবাচক সংস্কার নেয়ার ফলে এই উন্নতি হয়েছে। আন্তর্জাতিক এই র‍্যাংকিংয়ে প্রকাশিত সূচকে দেশের বাক্স্বাধীনতা ও  ইন্টারনেট সূচকের অসামান্য অগ্রগতি লক্ষ্য করা গেছে। বিশ্বব্যাংক এবং আন্তর্জাতিক টেলিকমিউনিকেশন সংস্থার মতো আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলো বাংলাদেশের বাক্ স্বাধীনতা ও ইন্টারনেট সূচকের অগ্রগতিকে স্বীকৃতি দিয়েছে।

এ ধরনের ব্যাখ্যাকে স্বাগত জানিয়ে বিডিসাফ মহাসচিব মুহিবুল মুক্তাদির তানিম বলেছেন, সরকারের পক্ষ থেকে এমন ব্যাখ্যা সাধুবাদের। তবে ‘Government Criticism’ ট্যাগ পাওয়া ২৭৯টির মধ্যে কতটি বিদেশি উৎসের প্রোপাগান্ডা, কতটি সন্ত্রাস–বিরোধী কার্যক্রম, কতটি অনলাইন জুয়ার সাথে যুক্ত— একটি পৃথক তথ্যসেট প্রকাশ করলে সরকারের অবস্থান আরো শক্তিশালী হতো। 

তিনি আরও বলেছেন, গুগলের সাম্প্রতিক স্বচ্ছতা প্রতিবেদনে বাংলাদেশের কনটেন্ট–সরানোর সরকারি অনুরোধ কমেছে। ২০২৫ সালের জানুয়ারি–জুন সময়ে এমন অনুরোধ ছিল  ২৭৯টি—যা আগের সরকারের সর্বোচ্চ সময়ে পৌঁছেছিল ৮৬৭–এ। সংখ্যার এ পতন  ইতিবাচক; ইন্টারনেট স্বাধীনতার বৈশ্বিক সূচকেও বাংলাদেশ সামান্য এগিয়েছে। কেননা, গুগলের মতে- বাংলাদেশ সরকারের  ৬৯% অনুরোধে প্রয়োজনীয় তথ্য ছিল না। অর্থাৎ সুনির্দিষ্ট লিংক, প্রমাণ, আইনগত ভিত্তি স্পষ্ট ছিল না। ফলে সরকারের এই প্রক্রিয়া পরিচালনায় প্রশাসনিক দক্ষতা আরও বাড়ানো উচিত।
ডিবিটেক/জিইউ/আইএইচ

২৮ নভেম্বর, ২০২৫ ২৩:৪৭  
২৯ নভেম্বর, ২০২৫ ০১:০২