ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা নিয়ে ফয়েজ আহমদ তৈয়্যবের খোলা চিঠি
প্রিয়,
বাংলাদেশের চলমান ডিজিটাল গভর্নেন্স সংস্কার কার্যক্রমে আপনার আগ্রহ ও ধারাবাহিক সম্পৃক্ততার জন্য আন্তরিক ধন্যবাদ।
শুরুতেই আমি পুনরায় নিশ্চিত করতে চাই যে, বাংলাদেশ সরকার ব্যক্তিগত উপাত্ত সুরক্ষা অধ্যাদেশ বা পারসোনাল ডেটা প্রোটেকশন অর্ডিন্যান্স (PDPO) প্রণয়নের পুরো প্রক্রিয়ায় দেশি-বিদেশি সব অংশীজনের সঙ্গে ব্যাপক পরামর্শ করেছে। বারবারই বলা হয়েছে—এই অধ্যাদেশ অনুযায়ী সরকার একটি “কর্তৃপক্ষ” গঠন করবে, যার ভূমিকা PDPO-এর কাঠামোর মধ্যেই নির্ধারিত।
এই অথরিটি শুধু PDPO বাস্তবায়নের জন্য নয়; বরং সরকারের অভ্যন্তরীণ, আন্তঃমন্ত্রণালয় ও মন্ত্রণালয়ের ভেতরের বিভিন্ন সংস্থার মধ্যে ডেটা গভর্নেন্স ও সমন্বয়ের প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামো হিসেবে কাজ করবে। এর কাঠামো, কার্যাবলি ও দায়িত্ব নির্ধারণ করা হয়েছে ব্যাপক আন্তঃমন্ত্রণালয় আলোচনার পর।
আমরা বিনয়ের সঙ্গে অনুরোধ করছি—সব পক্ষ যেন তাদের নিজ নিজ পেশাগত সীমার মধ্যে থেকে দায়িত্ব পালন করেন এবং এই আইন প্রণয়ন প্রক্রিয়া নিয়ে অপ্রয়োজনীয় জল্পনা বা বিভ্রান্তি না ছড়ান। পূর্ববর্তী পরামর্শ সভাগুলিতে দেওয়া সব প্রতিশ্রুতি ও আশ্বাস চূড়ান্ত PDPO-তে যথাযথভাবে প্রতিফলিত হয়েছে।
পরিষ্কারভাবে জানানো প্রয়োজন:
- সরকার কোনো বাধ্যতামূলক ডেটা লোকালাইজেশন (দেশের ভেতরেই সব তথ্য সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক করা) সংক্রান্ত বিধান অন্তর্ভুক্ত করেনি। সম্প্রতি একটি পত্রিকায় প্রকাশিত “সব ডেটা দেশে সংরক্ষণ বাধ্যতামূলক” – এই দাবি সম্পূর্ণ ভুল ও ভিত্তিহীন।
- PDPO কেবল নির্দিষ্ট কিছু অতি সংবেদনশীল ব্যক্তিগত তথ্য যেমন—জাতীয় পরিচয়পত্র (NID), বায়োমেট্রিক তথ্য, ভোটার তথ্য, জন্মতারিখ ও ব্যাংকিং তথ্য—এসব তথ্য বাংলাদেশের আইনের আওতায় রাখতে বলেছে। এটি আন্তর্জাতিকভাবে স্বীকৃত একটি প্রচলিত পদ্ধতি।
- সাধারণ তথ্য—যেমন টেক্সট মেসেজ, ছবি, কনটেন্ট, ভিডিও, ডকুমেন্ট বা ইমেইল—এই সংবেদনশীল শ্রেণির মধ্যে পড়ে না।
- এমনকি নিষিদ্ধ বা সীমিত ব্যক্তিগত তথ্য বিদেশে প্রক্রিয়াকরণও করা যাবে, যতক্ষণ পর্যন্ত তা বাংলাদেশের আদালতের বিচারিক এখতিয়ারের আওতায় আইনি দায়বদ্ধ থাকে।
- অর্ডিন্যান্সে “substantial volume” বা বৃহৎ পরিমাণে তথ্য হস্তান্তর কথাটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার মানে হলো—সংবেদনশীল তথ্যের বিপুল পরিমাণ বিদেশে পাঠাতে হলে নিরাপত্তা ও সার্বভৌমত্বের কারণে সরকারের অনুমোদন বা সম্মতি লাগবে।
সম্প্রতি ডেইলি স্টার-এ প্রকাশিত প্রতিবেদনটি সম্ভবত পূর্ববর্তী প্রশাসনের একটি পুরোনো খসড়া ভিত্তিক এবং বর্তমানের চূড়ান্ত ও ভারসাম্যপূর্ণ সংস্করণের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়। অর্ডিন্যান্সে কোম্পানির ৫% টার্নওভার জরিমানা সম্পর্কিত দাবি-ও সম্পূর্ণ ভুল। সরকার এসব ভ্রান্ত উপস্থাপনাকে দৃঢ়ভাবে প্রত্যাখ্যান করছে।
অন্যদিকে, বাংলাদেশ ডেটা লোকালাইজেশন নয়—বরং “ক্লাউড-ফার্স্ট” নীতি গ্রহণ করেছে।
আমরা ১৮ মাসের রূপান্তরকালীন সময় দিচ্ছি এবং সম্মতি-ভিত্তিক ডেটা ফিডিউসিয়ারি ও প্রসেসিং কাঠামো চালু করছি, যা ইউরোপীয় ইউনিয়নের GDPR ও ASEAN মানদণ্ডের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
সরকারের দৃষ্টিভঙ্গি স্পষ্টভাবে প্রগতিশীল ও ভারসাম্যপূর্ণ:
✅ ডেটা লোকালাইজেশনের বাধ্যবাধকতা বাতিল করা হয়েছে — কোনো প্ল্যাটফর্মকে বাধ্য করা হবে না যে তাদের ডেটা কেবল বাংলাদেশেই সংরক্ষণ করতে হবে।
✅ কেবলমাত্র এটাই নিশ্চিত করা হচ্ছে যে, ডিজিটাল প্ল্যাটফর্মগুলো বাংলাদেশের আদালতের এখতিয়ারের আওতায় থাকবে — যা বৈশ্বিকভাবে প্রচলিত একটি নিয়ম; এটি ব্যবসা সীমাবদ্ধ না করেই দায়বদ্ধতা নিশ্চিত করে।
✅ তুলনামূলকভাবে, ভারত আর্থিক তথ্য লোকালাইজেশন বাধ্যতামূলক করেছে, আর ভিয়েতনাম ব্যক্তিগত তথ্য সংরক্ষণে কঠোর আইন প্রয়োগ করছে।
কিন্তু বাংলাদেশ সম্পূর্ণ বিপরীত পথে হেঁটেছে — আমরা উদ্ভাবন ও নিরাপত্তাকে একসঙ্গে এগিয়ে নিতে “ক্লাউড-ফার্স্ট” নীতি গ্রহণ করেছি।
এছাড়াও আইনটি অন্তর্ভুক্ত করেছে:
-
১৮ মাসের রূপান্তরকালীন সময়;
-
সম্মতি-ভিত্তিক ডেটা ফিডিউসিয়ারি ও প্রসেসিং কাঠামো;
-
এবং ইইউ, যুক্তরাজ্য ও আসিয়ান অঞ্চলে ব্যবহৃত আন্তর্জাতিক ডেটা সুরক্ষা নীতিমালার সঙ্গে সামঞ্জস্য।
একই সঙ্গে বাস্তবতাও বিবেচনায় নিতে হবে — ইতোমধ্যে ৫ কোটিরও বেশি বাংলাদেশি নাগরিকের ব্যক্তিগত তথ্য ডার্ক ওয়েবে ফাঁস হয়েছে, এবং আমাদের সফটওয়্যার খাত আন্তর্জাতিক চুক্তি হারাচ্ছে কারণ আমরা অনেক সময় বৈশ্বিক মানদণ্ডের সঙ্গে তাল মিলিয়ে চলতে পারছি না।
এই বাস্তবতা প্রমাণ করে, শক্তিশালী ও আধুনিক ডেটা গভর্নেন্স এখন আর পছন্দ নয়—এটি জাতীয় প্রয়োজন।
আমাদের লক্ষ্য অটুট:
নাগরিকদের তথ্যের সুরক্ষা, ডিজিটাল সার্বভৌমত্বের সংরক্ষণ, এবং একটি বিশ্বাসযোগ্য ও নৈতিক ডিজিটাল ভবিষ্যৎ নির্মাণ।
আমরা কোনো গোষ্ঠীর স্বার্থনির্ভর প্রচারণা বা ভুল তথ্যের মাধ্যমে জাতীয় সংস্কার প্রক্রিয়াকে বাধাগ্রস্ত হতে দেব না।
বাংলাদেশ খোলামেলা সংলাপ ও দায়িত্বশীল অংশগ্রহণকে স্বাগত জানায়,
কিন্তু একই সঙ্গে আমরা আমাদের নাগরিকদের অধিকার, আমাদের ডিজিটাল ভবিষ্যৎ, এবং আমাদের সার্বভৌম নীতিনির্ধারণ ক্ষমতা দৃঢ়ভাবে রক্ষা করব।
আমার বর্তমান দায়িত্বকাল শেষ হওয়ার আগে আমি শিল্পখাতের স্থানীয় ও আন্তর্জাতিক ব্যবসায়িক কাউন্সিলসহ সব অংশীজনের সঙ্গে খোলা আলোচনা ও স্পষ্টীকরণ সভা আয়োজনের ব্যবস্থা করব।
আপনার সহযোগিতা, বোঝাপড়া ও অব্যাহত সম্পৃক্ততার জন্য আবারও আন্তরিক ধন্যবাদ।
শুভেচ্ছান্তে,
ফাইজ আহমাদ তাইয়েব
প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী
ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি মন্ত্রণালয়
গণপ্রজাতন্ত্রী বাংলাদেশ সরকার







