রাজধানীর আজমল হাসপাতাল

ভুল চিকিৎসায় ‘অপমৃত্যু’র শিকার প্রকৌশলীর স্ত্রী ও গর্ভের সন্তান

ভুল চিকিৎসায় ‘অপমৃত্যু’র শিকার প্রকৌশলীর স্ত্রী ও গর্ভের সন্তান
২৫ জুলাই, ২০২৫ ২৩:১২  
২৬ জুলাই, ২০২৫ ০৯:৫৭  

রাজধানীর মিরপুর-১০ নম্বরের ডা. আজমল হাসপাতালে ভুল চিকিৎসায় একজন প্রকৌশলীর (সিভিল)  প্রসূতি স্ত্রী ও তার অনাগত সন্তানের ‘অপমৃত্যু’ হয়েছে। ওই প্রকৌশলীর নাম আব্দুর রহমান। তার অভিযোগ, সিজার হওয়ার আগেই স্যালাইন পুশ করারর পর একটি ইনজেকশন দিলে প্রসূতি আইরিন পারভীন ও তার গর্ভের সন্তানকে মেরে ফেলা হয়েছে। 

জানাগেছে, ২৫ জুলাই, শুক্রবার সকালে প্রসূতি আইরিন ও তার গর্ভের সন্তানের অপমৃত্যু হলে হাসপাতালের কর্তব্যরত সেবিকাদের জেররা মুখে ফেলেন রোগীর স্বজনেরা। এসময় হাসাপাতালে অন্যান্য রোগীর স্বজনরাও এই ঘটনায় বিক্ষুব্ধ হয়ে ওঠে। খবর পেয়ে ঘটনাস্থলে আসে স্থানীয় আইন-শৃঙ্খলা রক্ষাবাহিনী।

এক পর্যায়ে হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ নিজেদের ভুল শিকার করে মৃত্যু সনদের কারণ হিসেবে ‘চিকিৎসা অবহেলা’ লিখে রোগীর স্বজনের কাছে লাশ হস্তান্তর করে।   

নিহত আইরিন ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জের বাসিন্দা আব্দুর রহমানের স্ত্রী। নিহতের স্বামী ঢাকায় একটি বেসরকারি আর্কিটেক্ট কোম্পানিতে চাকরি করেন। মিরপুর-৬ এ স্ত্রী আইরিনসহ ভাড়া বাসায় থাকেন। আট বছর আগে আইরিনকে বিয়ে করেন। এই দম্পতির ৫ বছরের একটি সন্তান রয়েছে। আজ ছিলো দ্বিতীয় সন্তানের ভূমিষ্ঠের দিন। 

ফলে সাত সকালেই স্ত্রীকে সিজারের জন্য মিরপুর-১০ নম্বরের ডা. আজমল হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলেন আব্দুর রহমান। জানাগেছে, সেখানে তার রাক্তচাপ সহ শারীরিক অবস্থা ঠিকই ছিলো। সিজারের প্রস্তুতির জন্য স্যালাইন পুশ করার আগে তিনি প্রথম সন্তান আয়ানের সঙ্গে হেসে খেলে সময়ও কাটিয়েছেন। কিন্তু স্যালাইন পুশ করার পর একটি ইনজেকশন দিলে তিনি বুকের ভেতর জ্বালা-পোড়া অনুভব করতে থাকেন। কিছুক্ষণ পরই আইরিনের পালস জিরোতে নেমে আসে। প্রাণ হারান আইরিন ও তার অনাগত সন্তান। তবে নিস্তেজ অবস্থায় তাকে আইসিইউতে নিয়ে গিয়ে কিছুক্ষণ পড়ে মৃত ঘোষণা করা হয়। 

আব্দুর রহমান ডিজিবাংলাটেক-কে বলেন, ‘সিজারের জন্য সকালে আমার স্ত্রীকে হাসপাতালে নিয়ে গিয়েছিলাম। আর এখন, স্ত্রী ও আমার অনাগত সন্তানের মৃতদেহ নিয়ে বাড়ি ফিরছি। এই মুহূর্তে আমার সন্তানকে নিয়ে আনন্দে থাকার কথা ছিল। এই সবকিছুর জন্য ওই হাসপাতাল এবং ডাক্তার-নার্সরাই দায়ী। সিজার হলো না, অথচ আমার স্ত্রীকে মেরে ফেলা হলো। আমি আমার সন্তানের মুখও দেখতে পারলাম না; পেটের মধ্যেই মারা গেল। আমি চাই, আর কারো কপালে যেন এমন দুর্বিষহ পরিস্থিতি না আসে।’

জানা গেছে, আইরিনের গর্ভাবস্থার বয়স ছিল ৯ মাসেরও বেশি। এসময় সবকিছু স্বাভাবিক ছিল। দুই দিন আগে তিনি ডাক্তার হাজেরা খাতুনকে দেখান। ডাক্তার আজমল হাসপাতালে সকাল ৮টায় সিজার করানোর কথা বলে আইরিনকে ভর্তি হতে বলেন। সেই অনুযায়ী, ব্যবস্থাপত্র অনুযায়ী, সকাল ৬টার দিকে আইরিনকে ৬০৩ নম্বর কেবিনে ভর্তি করা হয়। 

স্বজনদের পক্ষ থেকে জানতে চাইলে তারা বলেন, ডাক্তার সকাল ৮টার দিকে সিজার করবেন জানিয়েছিলেন। সে অনুযায়ী, ইনজেকশন দেওয়ার কারণে প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। সঙ্গে পেটে থাকা সন্তানও মারা গেছে। এরপর পুলিশ আসে ঘটনাস্থলে। প্রসূতি ও গর্ভের সন্তানের মৃত্যুর পর হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ডেথ সার্টিফিকেট দিয়েছে, যেখানে মৃত্যুর কারণ হিসেবে 'হাসপাতালের অবহেলা' উল্লেখ করা হয়েছে।

ওই সময় হাসপাতালে উপস্থিত ছিলেন আব্দুর রহমানের অফিসের সিনিয়র সাহাব উদ্দিন শিপন। তিনি বলেন, "অবহেলায় দুটি প্রাণ শেষ হয়ে গেল, অথচ তাদের (হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের) মধ্যে কোনো অনুশোচনা নেই। এক পর্যায়ে তারা ৫ লাখ টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেয়। যখন পুলিশ আসে, তখন মামলায় না যেতে ১০ লাখ টাকা দিতে চায়।" এ সময় আব্দুর রহমান তাদের প্রস্তাব প্রত্যাখ্যান করে বলেন, "যেখানে আমার স্ত্রী-সন্তানকে হারালাম, সেখানে এই টাকা নিয়ে কী করবো?"

তিনি আরও জানান, ঠাকুরগাঁওয়ের পীরগঞ্জে মরদেহ নিয়ে যাচ্ছেন দাফন করতে। দাফন শেষে ঢাকায় ফিরে পরবর্তী ব্যবস্থা নেবেন। 

এ বিষয়ে জানতে হাসপাতালের পরিচালক আতাহার আলীকে ফোন করা হলে তিনি সরাসরি কথা বলার জন্য হাসপাতালে ডাকেন। ফোনে তিনি কোনো বক্তব্য দেবেন না বলেও জানান।

হাসপাতালের ম্যানেজার আবুল খায়ের জানান, ‘ঘটনা যা ঘটেছে তা তো ঘটেই গেছে। এখন তিনি সমাধানের প্রয়োজন।’

মিরপুর মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ (ওসি) সাজ্জাদ রোমন জানান, ‘আজমল হাসপাতালে একজন প্রসূতির মৃত্যু হয়েছে। ভুল চিকিৎসায় মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। পুলিশ গিয়েছিল। ভুক্তভোগীর পরিবার দাফন-কাফনের জন্য গ্রামে গেছে। ফিরে এসে মামলা করলে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া হবে।’

নামে-বেনামে গড়ে ওঠা হাসপাতালগুলোতে ভুল চিকিৎসায় রোগী মৃত্যুর অভিযোগ যেন এখন নিয়মিত ঘটনা হয়ে দাঁড়িয়েছে। স্বাস্থ্য অধিদফতরের নিয়মিত তদারকির অভাবে ব্যাঙের ছাতার মতো গজিয়ে ওঠা এই হাসপাতালগুলো অপরাধ করেও পার পেয়ে যাচ্ছে। সাধারণ মানুষের দাবি, এসব হাসপাতালের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়া উচিত। ভুক্তভোগীর স্বজনরা জানিয়েছেন, হাসপাতালের বিরুদ্ধে অনেকেরই অভিযোগ রয়েছে। এ বিষয়ে বিভাগীয় তদন্ত করে বিচার হওয়া উচিত।