স্মরণে সুরের কিংবদন্তি, কুমিল্লায় শচীন দেববর্মণের বাড়িতে মেলা
কুমিল্লা: সুরের জাদুতে যিনি জয় করেছিলেন উপমহাদেশের কোটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়, সেই কালজয়ী সংগীতসাধক শচীন দেববর্মণের স্মৃতিধন্য পৈতৃক বাড়িতে আবারও বসেছে উৎসবের আসর। সংগীত, সংস্কৃতি আর স্মৃতিচারণে মুখর কুমিল্লা নগরীর চর্থায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বাড়িটি। তবে উৎসবের এই আনন্দের মধ্যেও আক্ষেপের সুর তুলেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকেরা। তাদের দাবি, শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সীমাবদ্ধ না রেখে শচীন […] The post স্মরণে সুরের কিংবদন্তি, কুমিল্লায় শচীন দেববর্মণের বাড়িতে মেলা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

কুমিল্লা: সুরের জাদুতে যিনি জয় করেছিলেন উপমহাদেশের কোটি সংগীতপ্রেমীর হৃদয়, সেই কালজয়ী সংগীতসাধক শচীন দেববর্মণের স্মৃতিধন্য পৈতৃক বাড়িতে আবারও বসেছে উৎসবের আসর। সংগীত, সংস্কৃতি আর স্মৃতিচারণে মুখর কুমিল্লা নগরীর চর্থায় অবস্থিত ঐতিহাসিক বাড়িটি। তবে উৎসবের এই আনন্দের মধ্যেও আক্ষেপের সুর তুলেছেন স্থানীয় সংস্কৃতিকর্মী ও সচেতন নাগরিকেরা। তাদের দাবি, শুধু আনুষ্ঠানিক আয়োজনে সীমাবদ্ধ না রেখে শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়ির বেদখল হয়ে থাকা অংশ উদ্ধার, পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ এবং সেখানে একটি আধুনিক সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্স গড়ে তুলতে হবে।
উপমহাদেশের প্রখ্যাত সংগীতশিল্পী ও সুরকার শচীন দেববর্মণের ৫১তম মৃত্যুবার্ষিকী উপলক্ষ্যে শুক্রবার (৩০ অক্টোবর) বিকেল থেকে কুমিল্লায় শুরু হয়েছে দুই দিনব্যাপী ‘শচীন মেলা-২০২৬’। আগামী ৩১ অক্টোবর তার মৃত্যুবার্ষিকী। কুমিল্লা জেলা প্রশাসন ও জেলা শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে আয়োজিত এ মেলায় থাকছে সংগীত পরিবেশনা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানসহ নানা আয়োজন। স্থানীয় শিল্পী, সংস্কৃতিকর্মী ও সংগীতপ্রেমীদের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে শিল্পীর স্মৃতিবিজড়িত প্রাঙ্গণ।

কুমিল্লায় শচীন দেববর্মণের বাড়ি।
শচীন দেববর্মণ শুধু একজন সংগীতশিল্পী ছিলেন না, বাংলা ও ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে তিনি ছিলেন এক স্বতন্ত্র সুরস্রষ্টা। তার সৃষ্ট গান ও সুর আজও প্রজন্ম থেকে প্রজন্মে সমানভাবে সমাদৃত। কুমিল্লার মাটিতে জন্ম নেওয়া এই কিংবদন্তির স্মৃতি ধরে রাখতে প্রতিবছর শচীন মেলার আয়োজন করা হলেও তাঁর পৈতৃক বাড়ির যথাযথ সংরক্ষণ নিয়ে দীর্ঘদিন ধরেই রয়েছে নানা প্রশ্ন।
সংগীতশিল্পী ইশতিয়াক আহমেদ পল্লব বলেন, শচীন দেববর্মণ আমাদের সংগীতজগতের এক অমূল্য সম্পদ। তার জন্ম ও শৈশবের স্মৃতিবিজড়িত কুমিল্লার এই বাড়িটি শুধু স্থানীয় ঐতিহ্য নয়, উপমহাদেশের সংগীত ইতিহাসেরও গুরুত্বপূর্ণ অংশ। মেলার আয়োজন অবশ্যই প্রশংসনীয়। তবে এই আয়োজন যেন দুই দিনের মধ্যে সীমাবদ্ধ না থাকে। বাড়িটিকে কেন্দ্র করে সারা বছর সংগীতচর্চা, গবেষণা ও সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু করা প্রয়োজন।
কুমিল্লা নজরুল ইনস্টিটিউটের কর্মকর্তা মো. আল-আমীন বলেন, শচীন দেববর্মণ ও জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামের স্মৃতির সঙ্গে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ইতিহাস গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। এই বাড়ির ঐতিহাসিক গুরুত্ব বিবেচনায় নিয়ে এটিকে যথাযথভাবে সংরক্ষণ করা জরুরি। পাশাপাশি নতুন প্রজন্মের কাছে শচীন দেববর্মণের জীবন, কর্ম ও সংগীতের ইতিহাস তুলে ধরতে এখানে একটি সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক কেন্দ্র গড়ে তোলা যেতে পারে।
ঐতিহ্য কুমিল্লার সভাপতি জাহাঙ্গীর আলম ইমরুল বলেন, শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়ি কুমিল্লার গর্ব ও অমূল্য ঐতিহাসিক সম্পদ। দীর্ঘদিন ধরে বাড়িটির একটি অংশ বেদখলে রয়েছে। বিভিন্ন সময়ে উদ্যোগ নেওয়া হলেও পুরো বাড়িটি উদ্ধার ও সংরক্ষণের কাজ এখনো সম্পন্ন হয়নি। আমরা চাই, অবশিষ্ট অংশ দ্রুত উদ্ধার করে বাড়িটিকে একটি পূর্ণাঙ্গ সাংস্কৃতিক কমপ্লেক্সে রূপ দেওয়া হোক। এটি বাস্তবায়িত হলে কুমিল্লার সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য সংরক্ষণের পাশাপাশি পর্যটন সম্ভাবনাও বাড়বে।
শুধু একটি পুরোনো স্থাপনা নয়, শচীন দেববর্মণের পৈতৃক বাড়িটি বাংলা সংগীতের ইতিহাসের এক গুরুত্বপূর্ণ স্মারক। কথিত আছে, এই বাড়িতেই একসময় সংগীতের আসর বসত। সেই আসরে শচীন দেববর্মণের সঙ্গে মিলিত হতেন জাতীয় কবি কাজী নজরুল ইসলামসহ তৎকালীন অনেক খ্যাতিমান সংগীতজ্ঞ। ফলে বাড়িটি কেবল শচীন দেববর্মণের স্মৃতিই বহন করে না, ধারণ করে কুমিল্লার সমৃদ্ধ সাংস্কৃতিক ইতিহাসের নানা অধ্যায়।
১৯৪৭ সালে দেশভাগের পর বাড়িটির বড় একটি অংশে সরকারি হাঁস-মুরগির খামার স্থাপন করে তৎকালীন পাকিস্তান সরকার। এরপর দীর্ঘ সময় ধরে বাড়িটির একটি অংশ অব্যবস্থাপনা ও বেদখলে পড়ে থাকে। বিভিন্ন সামাজিক ও সাংস্কৃতিক সংগঠনের উদ্যোগে বিষয়টি প্রশাসনের নজরে এলে ২০১৩ সালে বাড়িটির একাংশ বেদখলমুক্ত করা হয়। পরবর্তী বছর শুরু হয় সংস্কারকাজ।
তবে সংস্কারকাজের পরও ঐতিহাসিক বাড়িটির পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণ নিশ্চিত হয়নি। নিয়মিত সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের অভাব, যথাযথ রক্ষণাবেক্ষণ ও অবশিষ্ট অংশ উদ্ধার না হওয়ায় স্থাপনাটির ভবিষ্যৎ নিয়ে উদ্বেগ রয়েছে স্থানীয় সংস্কৃতিপ্রেমীদের মধ্যে। তাদের মতে, কেবল বিশেষ দিবসকেন্দ্রিক আয়োজন দিয়ে এমন ঐতিহাসিক স্থাপনার গুরুত্ব ধরে রাখা সম্ভব নয়। প্রয়োজন দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্থায়ী জনবল ও নিয়মিত সাংস্কৃতিক কার্যক্রম।
সংস্কৃতিপ্রেমীদের দাবির বিষয়ে ইতিবাচক অবস্থানের কথা জানিয়েছেন কুমিল্লার অতিরিক্ত জেলা প্রশাসক (সার্বিক) আলী রাজিব মাহমুদ মিঠুন। তিনি বলেন, শচীন দেববর্মণের স্মৃতিবিজড়িত এই বাড়িটি কুমিল্লার ঐতিহাসিক ও সাংস্কৃতিক সম্পদ। এর যথাযথ সংরক্ষণ এবং সারা বছর সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড চালু রাখার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করা হচ্ছে। এ বিষয়ে সংশ্লিষ্ট মন্ত্রণালয়ে প্রস্তাব পাঠানোর উদ্যোগ নেওয়া হবে। প্রয়োজনীয় সহযোগিতা ও সমন্বয়ের মাধ্যমে বাড়িটির ঐতিহ্য রক্ষায় কার্যকর পদক্ষেপ নেওয়ার চেষ্টা থাকবে।
শচীন দেববর্মণের সুর আজও বেঁচে আছে মানুষের হৃদয়ে। তাঁর গান নতুন প্রজন্মের কাছেও সমান আবেদন তৈরি করে। অথচ তার জন্মভূমির স্মৃতিবিজড়িত বাড়িটি এখনো পূর্ণাঙ্গ সংরক্ষণের অপেক্ষায়। তাই কুমিল্লার সংস্কৃতিপ্রেমীদের প্রত্যাশা, শচীন মেলা কেবল বার্ষিক উৎসব হিসেবেই সীমাবদ্ধ থাকবে না; বরং এই আয়োজনকে কেন্দ্র করে গড়ে উঠবে একটি স্থায়ী সাংস্কৃতিক বলয়। যেখানে থাকবে সংগীতচর্চা, গবেষণা, স্মৃতি সংরক্ষণ ও নতুন প্রজন্মের জন্য জ্ঞানচর্চার সুযোগ। সুরের এই কিংবদন্তির স্মৃতি যেন আর অবহেলায় হারিয়ে না যায়, সেটিই এখন কুমিল্লাবাসীর প্রত্যাশা।
The post স্মরণে সুরের কিংবদন্তি, কুমিল্লায় শচীন দেববর্মণের বাড়িতে মেলা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





