প্রবীণদের সুরক্ষা ছাদ, নাকি শরিয়াহর সঙ্গে সংঘাত?

ঢাকা: মিরপুরের সত্তরোর্ধ্ব বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা শফিকুর রহমান । তিন বছর আগে আবদার ও ভালোবাসার মোহে নিজের শেষ সম্বল পাঁচ কাঠা জমির ওপর বানানো তিনতলা বাড়ির পুরোটাই রেজিস্ট্রি করে লিখে দেন একমাত্র ছেলের নামে। আশা ছিল, শেষ বয়সে ছেলে-বউয়ের আদর-যত্নে নাতি-নাতনি নিয়ে শান্তিতে দিন কাটাবেন। কিন্তু দলিল-রেজিস্ট্রি হওয়ার বছর না ঘুরতেই শুরু হয় দুর্ব্যবহার। […] The post প্রবীণদের সুরক্ষা ছাদ, নাকি শরিয়াহর সঙ্গে সংঘাত? first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

প্রবীণদের সুরক্ষা ছাদ, নাকি শরিয়াহর সঙ্গে সংঘাত?
২৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ১১:০০  

ঢাকা: মিরপুরের সত্তরোর্ধ্ব বয়সী অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তা শফিকুর রহমান । তিন বছর আগে আবদার ও ভালোবাসার মোহে নিজের শেষ সম্বল পাঁচ কাঠা জমির ওপর বানানো তিনতলা বাড়ির পুরোটাই রেজিস্ট্রি করে লিখে দেন একমাত্র ছেলের নামে। আশা ছিল, শেষ বয়সে ছেলে-বউয়ের আদর-যত্নে নাতি-নাতনি নিয়ে শান্তিতে দিন কাটাবেন। কিন্তু দলিল-রেজিস্ট্রি হওয়ার বছর না ঘুরতেই শুরু হয় দুর্ব্যবহার। ঘর থেকে জিনিসপত্র বের করে দেওয়া, ঠিকমতো খাবার না দেওয়া এবং শেষমেশ শারীরিক লাঞ্ছনা। একদিন নিজেরই রক্ত-পানি করে তৈরি করা বাড়ি থেকে বিতাড়িত হয়ে ঠাঁই হয় এক আশ্রমে।

শফিকুর রহমানের মতো এই করুণ পরিণতি কেবল একক কোনো ঘটনা নয়। রাজধানীর উত্তরায় জমি লিখে দেওয়ার পর ছেলের কাছ থেকে দৈনিক অপমান সহ্য করতে না পেরে বৃদ্ধাশ্রমে আশ্রয় নেওয়া রাবেয়া খাতুন, কিংবা সাভারে বসতবাড়ি হারিয়ে প্রবীণ বয়সে রাস্তার মোড়ে চা বিক্রি করে জীবন চালানো বৃদ্ধ দম্পতির গল্পগুলো আজ আমাদের সমাজের করুণ বাস্তবতা।

এই মানবিক ও সামাজিক সংকট থেকে প্রবীণদের সুরক্ষা দিতে সম্প্রতি জাতীয় সংসদে পাস হয়েছে ‘সম্পত্তি হস্তান্তর (সংশোধন) বিল, ২০২৬’। কিন্তু গত ৬ সেপ্টেম্বর কণ্ঠভোটে বিলটি পাস হওয়ার পর থেকেই আইনটির মূল স্পিরিট, বাস্তবায়নযোগ্যতা এবং ইসলামী শরিয়াহর সঙ্গে এর সম্ভাব্য সংঘাত নিয়ে শুরু হয়েছে ব্যাপক আইনি, রাজনৈতিক ও ধর্মীয় বিতর্ক। আইনটি আসলে কী পরিবর্তন আনছে, প্রবীণদের নিরাপত্তা কতটুকু নিশ্চিত হবে, আর শরিয়াহর দৃষ্টিতেই বা এর অবস্থান কোথায়?

আইনে যা পরিবর্তন এলো

প্রচলিত ‘ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্ট, ১৮৮২’-এর ১২২ ধারায় সাধারণ দানের যে বিধান এতদিন কার্যকর ছিল, তাতে সম্পত্তি হস্তান্তর বা রেজিস্ট্রি হওয়ার সঙ্গে সঙ্গে দাতার সমুদয় আইনি ও ভোগদখলের অধিকারের পূর্ণ বিলুপ্তি ঘটতো। ফলে সন্তানকে জমি লিখে দেওয়ার পর অভিভাবকেরা পুরোপুরি অসহায় ও নিঃস্ব হয়ে পড়তেন। এই জটিলতা কাটাতে সরকার আইনে যুক্ত করেছে নতুন দুটি ধারা ‘১২২-এ’ এবং ‘১২২-বি’।

নতুন বিধান অনুযায়ী, বাবা-মা, সন্তান, দাদা-দাদি/নানা-নানি, নাতি-নাতনি এবং স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সম্পত্তি দান করলেও দাতা চাইলেই দলিলের শর্তানুসারে তার জীবদ্দশায় ওই সম্পত্তির ‘ভোগ ও ব্যবহারের অধিকার’ (Life Interest) নিজের কাছে রেখে দিতে পারবেন। অর্থাৎ, সম্পত্তির আইনি মালিকানা গ্রহীতার (যেমন সন্তান) কাছে চলে গেলেও দাতা বেঁচে থাকা পর্যন্ত তাকে নিজের বসতবাড়ি থেকে উৎখাত করা যাবে না।

‘হেবা’ ও নতুন আইন

আইনটি পাসের পর থেকেই সবচেয়ে বড় বিতর্ক তৈরি হয়েছে ইসলামী আইনি ব্যবস্থা বা শরিয়াহর সঙ্গে এর সংঘাত নিয়ে। ইসলামী ফিকহ ও আইন বিশেষজ্ঞদের মতে, ফিকহ শাস্ত্রে সম্পত্তি হস্তান্তরের একটি অন্যতম প্রধান মাধ্যম হলো ‘হেবা’। হেবা শব্দের অর্থ হলো ‘স্বত্ব’ ত্যাগ করে কোনো প্রতিদান ছাড়া সম্পূর্ণ স্বেচ্ছায় কাউকে সম্পত্তি দান করা।

ইসলামী আইন বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, নতুন আইনে দাতা সম্পত্তি দান করার পরও জীবিত থাকা পর্যন্ত ভোগাধিকার ও নিয়ন্ত্রণ নিজের কাছে রাখায় গ্রহীতার ‘পূর্ণ দখল’ বা ‘কবয’ প্রতিষ্ঠা হচ্ছে না, যা শরিয়াহ বিধানের সঙ্গে সরাসরি সাংঘর্ষিক।

চট্টগ্রাম পার্ক ভিউ জামে মসজিদের খতিব ও চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের যোগাযোগ ও সাংবাদিকতা বিভাগের শিক্ষক প্রফেসর ড. মো. শহীদুল হক বিষয়টি ব্যাখ্যা করে সারাবাংলাকে বলেন, ‘হেবা ইসলামের সিদ্ধ একটি বিষয় এবং বৈষম্যহীনভাবে সম্পত্তি দান করা জায়েজ। হেবা সম্পূর্ণ হওয়ার জন্য ইসলামী শরিয়াহ ও ফিকহে হানাফিতে তিনটি মৌলিক শর্ত বাধ্যতামূলক। ইজাব (প্রস্তাব), দাতা কর্তৃক সম্পত্তি দেওয়ার প্রস্তাব। কবুল (গ্রহণ), গ্রহীতা কর্তৃক তা গ্রহণের সম্মতি। আল-কবজু ওয়াত-তাসলিম (দখল ও হস্তান্তর), দাতা কর্তৃক সম্পত্তির সব স্বত্ব ত্যাগ করে সম্পূর্ণ নিয়ন্ত্রণ বুঝিয়ে দেওয়া এবং গ্রহীতার পূর্ণ ‘কবয’ বা দখল প্রতিষ্ঠা হওয়া। অর্থাৎ, একজন স্বত্ব ত্যাগ করে সম্পত্তি বুঝিয়ে দেবে আর অন্যজন তা পুরোপুরি দখল নেবে। যখনই এই তিনটি প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ হয়ে যায়, তখনই হেবা পরিপূর্ণ হয়।’

তিনি আরও বলেন, ‘কুরআনে পরিষ্কার বলা হয়েছে, আমল বা চুক্তি বাতিল না করতে। হাদিসে (সুনানে দারে কুতনি: ২৯৭৯) এসেছে, রক্তসম্পর্কীয় আত্মীয়ের অনুকূলে দান করা হলে তা আর ফিরিয়ে নেওয়া যায় না। কিন্তু এই আইনে দাতা দান করার পরও ভোগাধিকার নিজের কাছে রাখছেন, যা ইসলামী শরিয়তে কোনোভাবেই বৈধ নয়। সন্তানকে বাধ্য করার অন্য মানবিক আইনি পথ থাকতে পারে, কিন্তু কুরআন-হাদিসের সঙ্গে সাংঘর্ষিক আইন করে মানবিকতা দেখানোর সুযোগ নেই।’

এ বিষয়ে বিশিষ্ট ধর্মীয় বিশ্লেষক ও আলেম ড. সাইয়্যেদ মুহাম্মাদ এনায়েতুল্লাহ আব্বাসী সারাবাংলাকে বলেন, ‘পিতা যদি হেবা করে দেন এবং ইজাব, কবুল ও সাক্ষীর মাধ্যমে সন্তানের কবয বা দখল প্রতিষ্ঠা হয়ে যায়, তবে ওই সম্পদের ওপর পিতার আর কোনো আইনি হক থাকে না। কিন্তু নতুন আইনে বলা হয়েছে, পিতা সারাজীবন ভোগাধিকার রাখতে পারবেন। এর মাধ্যমে সরাসরি শরীয়াহ আইনকে চ্যালেঞ্জ করা হয়েছে, যা কেবল অপরাধ নয়, একটি মহাপরাধ।’

সরকার ও প্রগতিশীলরা বলছে— এটি হেবা নয়, নাগরিক সুরক্ষার আইন

শরিয়াহ আইনের দোহাই দিয়ে বিলটির বিরোধিতার জবাবে সরকার দলীয় চিফ হুইপ নূরুল ইসলাম মনি সারাবাংলাকে বলেন, ‘বাংলাদেশে প্রচলিত ফৌজদারি আইনসহ বহু আইন রয়েছে, যা সাধারণ নাগরিক সুরক্ষায় কাজ করে। সরকার কখনো বলেনি যে, শরিয়াহ আইন চালু হচ্ছে। ইসলামে মা-বাবার প্রতি সম্মান ও দায়িত্ব পালনের ওপর সর্বোচ্চ গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। দেশের সাধারণ মানুষের মা-বাবাকে সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তো এই উদ্যোগ। এটি সম্পূর্ণ জনকল্যাণমূলক একটি আইন।’

সরকারের পক্ষ থেকে স্পষ্ট করা হয়েছে যে, এই নতুন বিধানটি ‘হেবা’ বা মুসলিম উত্তরাধিকার আইনকে প্রতিস্থাপন করছে না, বরং এটি ট্রান্সফার অব প্রপার্টি অ্যাক্টের অধীনে সব ধর্মের মানুষের জন্য প্রযোজ্য একটি পৃথক আইনি কাঠামো।

একই মত মানবাধিকারকর্মী নূর খান লিটনের। সারাবাংলাকে তিনি বলেন, ‘এটি একটি বাস্তবসম্মত ও প্রগতিশীল পদক্ষেপ। এখানে পিতামাতা সন্তানকে সম্পত্তি দান করলেও তাদের নিরাপত্তা নিশ্চিত হচ্ছে, আবার সন্তানও ভবিষ্যতে মালিকানা পাচ্ছে। তাই একে শুধু ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে না দেখে নাগরিক অধিকার ও সামাজিক সুরক্ষার জায়গা থেকে দেখা উচিত।’

অন্যদিকে অ্যাসোসিয়েশন ফর ল্যান্ড রিফর্ম অ্যান্ড ডেভেলপমেন্ট (ALRD)-এর নির্বাহী পরিচালক শামসুল হুদা আইনের উদ্দেশ্যকে স্বাগত জানিয়ে সতর্ক করেন যে, “প্রান্তিক ও গ্রাম পর্যায়ে সাধারণ মানুষের অসচেতনতার কারণে যেন সাব-রেজিস্ট্রি কার্যালয়ে দলিলে ‘ভোগাধিকারের শর্ত’ বাদ না পড়ে, সেদিকে খেয়াল রাখতে হবে। তা না হলে ভবিষ্যতে নতুন পারিবারিক মামলার জটিলতা তৈরি হতে পারে।”

সাধারণ মানুষের যে বিষয়গুলো জানা জরুরি

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, আইন শুধু পাস করলেই হবে না। বিষয়টি সাধারণ মানুষদের জানা থাকতে হবে। সে ক্ষেত্রে সম্পত্তি হস্তান্তর আইনের পাঁচটি বিষয় জেনে রাখা জরুরি।

স্বয়ংক্রিয় নয়: সাধারণ দলিলের ক্ষেত্রে এই সুবিধা পাওয়া যাবে না; রেজিস্ট্রি দলিলে সুনির্দিষ্টভাবে দাতার জীবনকালীন ভোগাধিকারের শর্ত উল্লেখ করতে হবে।

নিবন্ধিত দলিল বাধ্যতামূলক: পারিবারিক সমঝোতা বা মৌখিক ঘোষণায় এই আইনি সুরক্ষা পাওয়া যাবে না।

মালিকানা ও ভোগাধিকারের পৃথকীকরণ: হস্তান্তরের পর সন্তান মালিক হলেও, দাতা জীবিত থাকা পর্যন্ত ব্যবহার ও থাকার একচ্ছত্র অধিকার দাতারই থাকবে।

গ্রহীতার মৃত্যুতেও অধিকার বহাল: দাতা জীবিত থাকা অবস্থায় সন্তান মারা গেলেও সম্পত্তির মালিকানা সন্তানের ওয়ারিশদের কাছে যাবে, তবে দাতার থাকার বা ভোগের অধিকার ক্ষুণ্ন হবে না।

একতরফা বাতিল অসম্ভব: একবার রেজিস্ট্রি হয়ে গেলে দাতা চাইলেই একতরফা দান বাতিল করতে পারবেন না; উভয় পক্ষের সম্মতি বা আদালতের সিদ্ধান্তের প্রয়োজন হবে।

সংকট নাকি সমাধান?

বিলটি জাতীয় সংসদে পাস হলেও এটি এখনো রাষ্ট্রপতির সম্মতির অপেক্ষায় রয়েছে। একদিকে অসহায় প্রবীণ বাবা-মায়ের শেষ বয়সের ভিটেমাটি রক্ষার আকুলতা, অন্যদিকে মুসলিম ফারায়েজ ও হেবা আইনের শরিয়াহসম্মত প্রয়োগের ধর্মীয় সংবেদনশীলতা এই দুইয়ের টানাপোড়েনে আইনটি এখন আলোচনার কেন্দ্রে। প্রবীণদের সম্মানজনক আশ্রয় নিশ্চিত করার এই প্রচেষ্টা পরিবারে শান্তি ফেরাবে, নাকি নতুন আইনি ও সামাজিক জটিলতার জন্ম দেবে তা নির্ভর করবে এর চূড়ান্ত প্রয়োগ ও সামাজিক সচেতনতার ওপর।

The post প্রবীণদের সুরক্ষা ছাদ, নাকি শরিয়াহর সঙ্গে সংঘাত? first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.