শুধু তালাক-দেনমোহর নয়, পারিবারিক মামলায় আসছে নতুন অভিযোগ

ঢাকা: তালাক, ভরণপোষণ বা দেনমোহরের বিরোধের বাইরে বদলে যাচ্ছে পারিবারিক মামলার ধরণ। একাধিক বিয়ে, আগের বিয়ের তথ্য গোপন, প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্কের সূত্রে বিয়ে এবং পরে সম্পর্ক অস্বীকার— এই ধরনের অভিযোগও এখন আদালতে নিয়মিত আসছে। আইনজীবী ও আদালতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আইনি সচেতনতার ঘাটতি এই প্রবণতা বাড়ার পেছনে ভূমিকা […] The post শুধু তালাক-দেনমোহর নয়, পারিবারিক মামলায় আসছে নতুন অভিযোগ first appeared on Sarabangla | Br

শুধু তালাক-দেনমোহর নয়, পারিবারিক মামলায় আসছে নতুন অভিযোগ
১৩ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২৩:০০  

ঢাকা: তালাক, ভরণপোষণ বা দেনমোহরের বিরোধের বাইরে বদলে যাচ্ছে পারিবারিক মামলার ধরণ। একাধিক বিয়ে, আগের বিয়ের তথ্য গোপন, প্রতারণা, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে সম্পর্কের সূত্রে বিয়ে এবং পরে সম্পর্ক অস্বীকার— এই ধরনের অভিযোগও এখন আদালতে নিয়মিত আসছে। আইনজীবী ও আদালতসংশ্লিষ্টরা বলছেন, অর্থনৈতিক অস্থিরতা, পারিবারিক মূল্যবোধের পরিবর্তন, প্রযুক্তির অপব্যবহার ও আইনি সচেতনতার ঘাটতি এই প্রবণতা বাড়ার পেছনে ভূমিকা রাখছে।

একসময় পারিবারিক বিরোধের অধিকাংশ মামলা সীমাবদ্ধ ছিল তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ কিংবা সন্তানের হেফাজতকে ঘিরে। কিন্তু সময়ের সঙ্গে বদলেছে বিরোধের ধরণ। এখন বিয়ের আগে তথ্য গোপন, পূর্ববর্তী বৈবাহিক সম্পর্ক লুকানো, মিথ্যা পরিচয় দেওয়া কিংবা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে পরিচয়ের পর প্রতারণার অভিযোগে মামলা হচ্ছে। ঢাকার পারিবারিক আদালত, নারী ও শিশু নির্যাতন দমন ট্রাইব্যুনাল এবং বিচারিক আদালতে এসব অভিযোগে মামলা ও আইনি কার্যক্রম দেখা যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট আইনজীবীদের ভাষ্য, অনেক মামলার সূত্রপাত হচ্ছে বিয়ের আগে প্রয়োজনীয় তথ্য যাচাই না করা থেকে।

বাড়ছে যেসব অভিযোগ

অনেক ক্ষেত্রে একজন ব্যক্তি নিজের আগের বিয়ের তথ্য গোপন করে নতুন করে বিয়ে করেন। পরে বিষয়টি প্রকাশ্যে এলে শুরু হয় পারিবারিক বিরোধ। এর সঙ্গে যুক্ত হয় প্রতারণার অভিযোগ, দেনমোহর ও ভরণপোষণের দাবি এবং সন্তানের হেফাজত। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমও এ ধরনের বিরোধের একটি নতুন ক্ষেত্র তৈরি করছে। ফেসবুকসহ বিভিন্ন অনলাইন প্ল্যাটফর্মে পরিচয়ের পর দ্রুত সম্পর্ক গড়ে ওঠে। অনেক ক্ষেত্রে পারস্পরিক পরিচয়, বৈবাহিক অবস্থা, পেশা বা আর্থিক সক্ষমতা যথাযথভাবে যাচাই না করেই বিয়ের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এর বাইরে কেউ বিদেশে চাকরি দেওয়ার বা উচ্চ আয়ের সুযোগ করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়ে সম্পর্ক তৈরি করছেন এমন অভিযোগও রয়েছে। বিয়ের পর প্রতিশ্রুতি পূরণ না করা কিংবা সম্পর্ক অস্বীকার করার ঘটনায় তৈরি হচ্ছে পারিবারিক ও ফৌজদারি বিরোধ।

যা বলছে আইন

বাংলাদেশের মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী, বিদ্যমান বৈবাহিক সম্পর্ক বহাল থাকা অবস্থায় দ্বিতীয় বিয়ে করতে হলে সংশ্লিষ্ট আরবিট্রেশন কাউন্সিলের লিখিত অনুমতি নেওয়ার বিধান রয়েছে। অনুমতি ছাড়া দ্বিতীয় বিয়ে করলে আইনে শাস্তি ও জরিমানার বিধান রয়েছে। একই সঙ্গে বিদ্যমান স্ত্রীর দেনমোহর তাৎক্ষণিকভাবে পরিশোধের দায়ও সৃষ্টি হতে পারে।

আইনজীবীরা বলছেন, দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে এই বিধানকে কেবল একটি প্রশাসনিক প্রক্রিয়া হিসেবে দেখলে চলবে না। এর অন্যতম উদ্দেশ্য হলো বিদ্যমান স্ত্রীর অধিকার ও স্বার্থ রক্ষা এবং বিয়ের ক্ষেত্রে একতরফা সিদ্ধান্তের সুযোগ কমানো।

পারিবারিক আদালতের এখতিয়ার

পারিবারিক আদালতে সাধারণত তালাক, দেনমোহর, ভরণপোষণ, দাম্পত্য অধিকার পুনঃপ্রতিষ্ঠা এবং সন্তানের অভিভাবকত্ব ও হেফাজতসংক্রান্ত বিরোধের বিচার হয়। বৈবাহিক সম্পর্কের বৈধতা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে সংশ্লিষ্ট আদালত প্রয়োজন অনুযায়ী সেই প্রশ্নও বিবেচনা করতে পারে। ফলে একটি বিয়েকে কেন্দ্র করে শুরু হওয়া বিরোধ পরবর্তী সময়ে একাধিক আইনি প্রক্রিয়ায় রূপ নিতে পারে।

আদালতের দৃষ্টিভঙ্গি

উচ্চ আদালতের বিভিন্ন রায়ে দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বিধানকে গুরুত্বপূর্ণ আইনি সুরক্ষা হিসেবে বিবেচনা করা হয়েছে। আদালতের পর্যবেক্ষণে, এই বিধানের মূল উদ্দেশ্যের মধ্যে রয়েছে বিদ্যমান স্ত্রীর অধিকার সংরক্ষণ এবং স্বেচ্ছাচারিতা প্রতিরোধ। তাই আগের বিয়ের তথ্য গোপন করে নতুন বিয়ে করার ঘটনাকে শুধু পারিবারিক বিরোধ হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। ঘটনার ধরণ ও প্রমাণের ওপর নির্ভর করে তা প্রতারণাসহ অন্যান্য আইনি প্রশ্নও তৈরি করতে পারে।

আইনজীবীদের পর্যবেক্ষণ

সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী সিরাজ প্রামাণিক এক নিবন্ধে উল্লেখ করেছেন, মুসলিম পারিবারিক আইন অধ্যাদেশ, ১৯৬১-এর ৬ ধারা অনুযায়ী দ্বিতীয় বিয়ের ক্ষেত্রে আরবিট্রেশন কাউন্সিলের অনুমতির বিধান রয়েছে। তার মতে, প্রথম বিয়ের তথ্য গোপন করে দ্বিতীয় বিয়ে করলে তা আইনি জটিলতা তৈরি করতে পারে। এ ধরনের তথ্য গোপন করার ঘটনাকে কেন্দ্র করে প্রতারণা, দেনমোহর ও পারিবারিক বিরোধের মামলাও হতে পারে।

অন্যদিকে, সুপ্রিম কোর্টের আইনজীবী ইশরাত হাসান কাবিননামায় পূর্ববর্তী বিয়ে, তালাক ও সন্তানের তথ্য আরও কার্যকরভাবে অন্তর্ভুক্ত ও যাচাইয়ের দাবি জানিয়েছেন। এ বিষয়ে তিনি লিগ্যাল নোটিশও পাঠিয়েছেন। তার মতে, বিয়ের সময় এসব তথ্য যাচাইয়ের কার্যকর ব্যবস্থা না থাকায় প্রতারণার সুযোগ তৈরি হচ্ছে। তিনি বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন ডিজিটাল করার ওপরও গুরুত্ব দিয়েছেন। আইনজীবীদের মতে, বিয়ের আগে বৈবাহিক অবস্থা যাচাই করা গেলে অনেক বিরোধ শুরু হওয়ার আগেই প্রতিরোধ করা সম্ভব।

সমাজবিজ্ঞানীদের বিশ্লেষণ

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সমাজবিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. ফাতেমা রেজিনা ইকবাল সারাবাংলাকে বলেন, ‘মানুষের ব্যস্ততা বেড়ে যাওয়া, পারিবারিক বিচ্ছিন্নতা, পরকীয়াসহ নানা কারণে পারিবারিক সংকট বাড়ছে। এর সঙ্গে স্মার্টফোন ও ইন্টারনেটের অতিরিক্ত ব্যবহারও অনেক ক্ষেত্রে ভূমিকা রাখছে। ফলে পারিবারিক সম্পর্কের ক্ষেত্রে পারস্পরিক যোগাযোগ, দায়িত্ববোধ ও আস্থার ঘাটতি তৈরি হলে বিরোধ দ্রুত জটিল আকার ধারণ করতে পারে।’

পরিবার, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান ও সমাজে পারিবারিক দায়িত্ববোধ, পারস্পরিক শ্রদ্ধা এবং সম্পর্কের মূল্যবোধের চর্চা কমে যাওয়াও উদ্বেগের বিষয় বলে মনে করছেন সমাজবিজ্ঞানীরা।

প্রতিরোধে যা করা যেতে পারে

বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু মামলা ও শাস্তি দিয়ে এই প্রবণতা ঠেকানো কঠিন। প্রতারণার সুযোগ কমাতে বিয়ে নিবন্ধনের পুরো প্রক্রিয়াকে আরও স্বচ্ছ ও প্রযুক্তিনির্ভর করা প্রয়োজন। এ ক্ষেত্রে কয়েকটি উদ্যোগ গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। যেমন—

  • বিয়ে ও তালাক নিবন্ধন সম্পূর্ণ ডিজিটাল করা।
  • জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যের সঙ্গে বৈবাহিক নিবন্ধনের তথ্য সমন্বয় করা।
  • কাজীদের জন্য কেন্দ্রীয় অনলাইন যাচাই ব্যবস্থা চালু করা।
  • বিয়ের আগে উভয়পক্ষের বৈবাহিক অবস্থা যাচাইয়ের সুযোগ নিশ্চিত করা।
  • কাবিননামায় পূর্ববর্তী বিয়ে, তালাক ও সন্তানের তথ্য যাচাইযোগ্যভাবে সংযুক্ত করা।
  • পারিবারিক আদালতে বিকল্প বিরোধ নিষ্পত্তি বা এডিআর কার্যকর করা।
  • বিয়ে ও পারিবারিক আইন সম্পর্কে জনসচেতনতা বাড়ানো।
  • মিথ্যা তথ্য বা প্রতারণার অভিযোগের ক্ষেত্রে দ্রুত ও কার্যকর আইনি ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।

বিচ্ছেদের প্রভাব পড়ে সন্তান, পরিবার ও সমাজে

গবেষণায় দেখা গেছে, একটি পারিবারিক বিরোধ শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না। এর প্রভাব পড়ে সন্তান, দুই পরিবারের সম্পর্ক ও বৃহত্তর সমাজের ওপর। বিশেষ করে বিয়ের তথ্য গোপন বা প্রতারণার মতো ঘটনায় একটি পরিবার দীর্ঘমেয়াদি সামাজিক ও আর্থিক সংকটে পড়তে পারে। তাই আদালতে পারিবারিক বিরোধের ধরণ বদলে যাওয়া কেবল মামলার পরিসংখ্যানের বিষয় নয়, এটি সমাজ ও পারিবারিক সম্পর্কের পরিবর্তনেরও প্রভাব ফেলে।

সমাজবিজ্ঞানীরা বলছেন, এই পরিস্থিতিতে আইনের কঠোর প্রয়োগের পাশাপাশি বিয়ের আগে তথ্য যাচাই, ডিজিটাল নিবন্ধন ব্যবস্থা, আইনি সচেতনতা এবং পারিবারিক দায়িত্ববোধ বাড়ানো জরুরি। প্রযুক্তিকে প্রতারণার হাতিয়ার না বানিয়ে যদি তথ্য যাচাই ও নিবন্ধনের স্বচ্ছ ব্যবস্থায় কাজে লাগানো যায়, তাহলে একাধিক বিয়ে, তথ্য গোপন এবং বিয়েকে কেন্দ্র করে প্রতারণাজনিত অনেক বিরোধই শুরু হওয়ার আগেই শেষ করা সম্ভব।

The post শুধু তালাক-দেনমোহর নয়, পারিবারিক মামলায় আসছে নতুন অভিযোগ first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.