বাংলাদেশে এআই ও আইনের শাসন: বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার নীতি ও কাঠামো
বিচারব্যবস্থায় কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI) ব্যবহারের আগে প্রয়োজন স্পষ্ট নীতি, নিরাপত্তা ও জবাবদিহির কাঠামো। সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে বিচারিক এআই কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা নিয়ে বিশ্লেষণাত্মক লেখা।
একসময় ধারণা করা হতো তথ্যপ্রযুক্তি কেবলই যোগাযোগের মাধ্যম, কিন্তু কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তার (এআই) আবির্ভাব সেই ধারণাকে পুরোপুরি বদলে দিয়েছে। এআই এখন বিচারব্যবস্থার মতো সংবেদনশীল জায়গায়ও প্রবেশ করছে। বিশ্বজুড়ে বিচারব্যবস্থাগুলো যখন এখনো ঠিক করে উঠতে পারেনি এই প্রযুক্তির ব্যবহার কীভাবে নিয়ন্ত্রিত হওয়া উচিত, তখনই বাংলাদেশেও এর ব্যবহারের প্রশ্নটি সামনে এসেছে। ইউনেস্কোর 'Global Toolkit on AI and the Rule of Law for the Judiciary' এ ক্ষেত্রে বাংলাদেশের জন্য একটি সময়োপযোগী নীতিগত ভিত্তি হতে পারে। তবে মনে রাখা প্রয়োজন, এআই ব্যবহারের মূল লক্ষ্য বিচারককে প্রযুক্তি দিয়ে প্রতিস্থাপন করা নয়। বরং বিচারিক স্বাধীনতা, ন্যায়বিচার, সমতা, গোপনীয়তা ও মানবীয় সিদ্ধান্তের মর্যাদা অক্ষুণ্ন রেখে বিচারপ্রাপ্তি সহজ করা ও আদালতের দক্ষতা বাড়ানোই এর উদ্দেশ্য হওয়া উচিত।
জেনারেটিভ এআই এবং সম্ভাবনার দুয়ার
একজন বিচারক জেনারেটিভ এআই ব্যবহার করে দীর্ঘ নথির সারসংক্ষেপ তৈরি করতে পারেন, একজন আইনজীবী নজির খুঁজতে পারেন, আর আদালত প্রশাসন মামলার শ্রেণিবিন্যাস, শুনানির সময়সূচি তৈরি, অনুবাদ, ট্রান্সক্রিপশন বা মামলার জট শনাক্তে অ্যালগরিদম ব্যবহার করতে পারে। বাংলাদেশের প্রেক্ষাপটে মামলার দীর্ঘসূত্রতা কমানো এবং প্রশাসনিক দক্ষতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে এআই নিঃসন্দেহে একটি বড় সম্ভাবনা।
তবে মূল প্রশ্নটি এটি নয় যে বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থা এআই ব্যবহার করবে কি না। আসল প্রশ্ন হলো—কোন নিয়মে, কী ধরনের সুরক্ষার মধ্যে এবং কার কাছে জবাবদিহির ভিত্তিতে এটি ব্যবহৃত হবে
[ সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্ব ] │ ┌───────────────────────┴───────────────────────┐ ▼ ▼ [ ঝুঁকিভিত্তিক প্রয়োগ ] [ Judicial AI Policy Lab ] (ট্রান্সক্রিপশন, ডকেট প্রসেসিং) (নিয়ন্ত্রিত পরীক্ষা, পরীক্ষা-নিরীক্ষা) │ │ └───────────────────────┬───────────────────────┘ ▼ [ প্রামাণ্য বিচারিক ভান্ডার ] (বাংলাদেশের আইন, নথি ও বাংলা ভাষা)
বিচারিক সিদ্ধান্তের বিকল্প নয়
এআই হয়তো মানুষের চেয়ে দ্রুত হাজার পৃষ্ঠার নথি বিশ্লেষণ করতে পারে, প্রাসঙ্গিক রায় খুঁজে দিতে পারে বা সাক্ষ্য ট্রান্সক্রাইব করতে পারে। কিন্তু বিচারিক প্রক্রিয়া কেবল তথ্য প্রক্রিয়াকরণের (Data Processing) কাজ নয়। আদালতকে মামলার সামাজিক ও মানবিক প্রেক্ষাপট বুঝতে হয়, সাক্ষ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা যাচাই করতে হয়, পরস্পরবিরোধী অধিকারের ভারসাম্য নির্ধারণ করতে হয় এবং যুক্তি উপস্থাপন করে সিদ্ধান্তের দায় নিতে হয়।
তাই আমাদের একটি মৌলিক নীতি নির্ধারণ করা আবশ্যক: কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বিচারিক সিদ্ধান্তকে সহায়তা করতে পারে, কিন্তু এটি কখনো বিচারকের দায়িত্বকে প্রতিস্থাপন করতে পারে না।
অনানুষ্ঠানিক ব্যবহারের ঝুঁকি ও সংবিধানের নীতি
নীতিমালা তৈরির আগেই প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু হয়ে যাওয়া এক বড় ঝুঁকি তৈরি করে। বিচারক, আইনজীবী বা আদালতের কর্মকর্তারা যদি নীতিমালার অভাবে উন্মুক্ত এআই প্ল্যাটফর্মে কোনো সংবেদনশীল বা গোপন বিচারিক নথি আপলোড করেন, তবে ব্যক্তিগত তথ্যের নিরাপত্তা ও গোপনীয়তা চরম হুমকির মুখে পড়তে পারে। তদুপরি, জেনারেটিভ এআই মাঝে মাঝে কাল্পনিক রায় বা ভুল নজির (Hallucination) তৈরি করে এবং ভুয়া তথ্যকেও চরম আত্মবিশ্বাসের সঙ্গে উপস্থাপন করে।
সংবিধানে বর্ণিত আইনের দৃষ্টিতে সমতা, ন্যায়বিচার, স্বাধীন ও নিরপেক্ষ বিচার এবং যথাযথ প্রক্রিয়ার নীতিই বিচারিক এআই ব্যবহারের প্রধান মানদণ্ড হওয়া উচিত। প্রতিটি এআই ব্যবস্থার ক্ষেত্রে কয়েকটি মৌলিক প্রশ্নের উত্তর থাকা বাধ্যতামূলক:
- এটি কি কোনো নাগরিকের প্রতি বৈষম্য তৈরি করছে?
- সংক্ষুব্ধ ব্যক্তি কি জানতে পারছেন যে সিদ্ধান্তে এআই ব্যবহৃত হয়েছে?
- এআই-এর সুপারিশকে চ্যালেঞ্জ করার সুযোগ আছে কি না?
- ব্যবস্থাটি কোনো ভুল করলে দায় কে নেবে?
কম ঝুঁকির ক্ষেত্র থেকে শুরু ও জাতীয় কাঠামোর প্রয়োজনীয়তা
বাংলাদেশকে দুটি চরম অবস্থান এড়িয়ে চলতে হবে—এআইকে পুরোপুরি প্রত্যাখ্যান করা কিংবা তাড়াহুড়ো করে পুরোপুরি স্বয়ংক্রিয় বিচারব্যবস্থার দিকে ঝুঁকে পড়া। সঠিক পথ হলো ঝুঁকিভিত্তিক প্রয়োগ। প্রথম পর্যায়ে এআই কেবল ট্রান্সক্রিপশন, নথি শ্রেণিবিন্যাস, অনুবাদ, শুনানির সময়সূচি ব্যবস্থাপনা ও ডুপ্লিকেট আবেদন শনাক্তকরণের মতো কম ঝুঁকির প্রশাসনিক কাজে ব্যবহার করা যেতে পারে। কিন্তু জামিন প্রদান, শাস্তির মাত্রা নির্ধারণ বা সাক্ষীর বিশ্বাসযোগ্যতা মূল্যায়নের মতো সংবেদনশীল ক্ষেত্রে এআই-এর ব্যবহার থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে।
এ জন্য সুপ্রিম কোর্টের নেতৃত্বে একটি 'Bangladesh Judicial AI and Rule of Law Framework' গঠন করা যেতে পারে। এই কাঠামোর মূল ভিত্তি হবে মানবীয় সিদ্ধান্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত গ্রহণ ক্ষমতা, গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্তে এআই ব্যবহারের স্বচ্ছতা, উচ্চতর ডেটা নিরাপত্তা এবং প্রযুক্তি ক্রয়ের স্বচ্ছতা নিশ্চিতকরণ।
স্থানীয় বাস্তবতা, প্রশিক্ষণ ও দৃষ্টিভঙ্গি
আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক এআই মডেলগুলো প্রধানত ইংরেজি ভাষা ও পশ্চিমা ডেটাসেটে প্রশিক্ষিত। বাংলাদেশের বিচারব্যবস্থায় বাংলা ভাষা, স্ক্যান করা পুরোনো নথি এবং নিজস্ব আইনের জটিলতা রয়েছে। ফলে বিদেশি মডেলের ওপর ভরসা না করে দেশের নিজস্ব প্রামাণ্য আইন, বিধি ও রায়ের ওপর ভিত্তি করে একটি নিরাপদ ডিজিটাল ভান্ডার গড়ে তোলা জরুরি। একই সাথে বিচার বিভাগীয় প্রাতিষ্ঠানিক নেতৃত্বে একটি 'Judicial AI and Rule of Law Lab' স্থাপন করা যেতে পারে, যা এই প্রযুক্তিগুলোকে নিয়ন্ত্রিত পরিবেশে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করবে।
প্রযুক্তি কেনার পর প্রশিক্ষণের প্রথাগত অভ্যাস বদলে, প্রযুক্তি বাস্তবায়নের আগেই বিচারক, আইনজীবী ও কর্মকর্তাদের এআই-এর কার্যপ্রণালী, এর সীমাবদ্ধতা এবং ঝুঁকি সম্পর্কে সচেতন করতে হবে। কারণ বিচার বিভাগ কেবল এআই-এর ব্যবহারকারী নয়, ভবিষ্যতে এআই-সম্পর্কিত জটিল আইনি বিরোধেরও বিচারক।
শেষ কথা
বিচারের প্রধান উদ্দেশ্য দ্রুত সিদ্ধান্ত দেওয়া নয়, বরং সঠিক, স্বাধীন ও যুক্তিনির্ভর ন্যায়বিচার নিশ্চিত করা। প্রযুক্তিকে বিচারকের পাশে স্থান দিতে হবে, বিচারকের আসনে নয়। নীতিগত সীমারেখা যদি আমরা এখনই নির্ধারণ না করি, তবে ভবিষ্যতে অনিয়ন্ত্রিত প্রযুক্তিই আমাদের বিচারিক সিদ্ধান্ত নিয়ন্ত্রণ করতে শুরু করবে।
লেখক: ডিজিটাল গণতন্ত্র, তথ্যের অখণ্ডতা ও গণমাধ্যম উন্নয়নবিষয়ক বিশেষজ্ঞ





