নমনীয় সিলিকন থেকে বাংলাদেশের স্বপ্ন
আজ অ্যাপল তাদের প্রথম ভাঁজযোগ্য আইফোন—আইফোন ডুও—নিয়ে এসেছে। অ্যাপল অবশ্যই প্রথম নয়। স্যামসাংসহ আরও অনেক প্রতিষ্ঠান অনেক আগেই ভাঁজযোগ্য ফোন বাজারে এনেছে। তারও আগে জন রজার্সসহ অসাধারণ গবেষকেরা নমনীয় ও প্রসারণযোগ্য ইলেকট্রনিক্স নিয়ে পথপ্রদর্শক কাজ করেছেন।
কিন্তু ১৩ বছর আগে আরেকটি দল একটু অন্য প্রশ্ন করেছিল।
নতুন কোনো অভিনব উপাদান নয়, প্লাস্টিক ইলেকট্রনিক্সও নয়—শিল্পমানের বাল্ক একক-স্ফটিক সিলিকন ওয়েফার এবং প্রচলিত সিএমওএস-সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন ইলেকট্রনিক্স তৈরি করে, সেই সিলিকনকেই কি পরে নমনীয় করা যায়? কর্মক্ষমতা, বৃহৎ পরিসরে উৎপাদনযোগ্যতা এবং সেমিকন্ডাক্টর উৎপাদনের মূল সুবিধাগুলো ধরে রেখেই?
জন রজার্স ও অন্য গবেষকেরা এর আগে সিলিকন-অন-ইনসুলেটর বা এসওআই, সিলিকন (১১১)সহ বিভিন্ন পদ্ধতি ব্যবহার করে নমনীয় সিলিকন ইলেকট্রনিক্স নিয়ে কাজ করেছিলেন। এসব পদ্ধতির কিছু ক্ষেত্রে সাবস্ট্রেটের খরচ, ত্রুটির ঘনত্ব বা কর্মক্ষমতা নিয়ে সীমাবদ্ধতা ছিল। আমাদের প্রশ্ন ছিল আরও সরাসরি: মূলধারার সেমিকন্ডাক্টর শিল্প যে বাল্ক সিলিকন (১০০) ওয়েফার ব্যবহার করে, সেটিকেই কি নমনীয় ইলেকট্রনিক্সের ভিত্তি করা যায়?
২০১৩ সালের ১০ সেপ্টেম্বর সায়েন্টিফিক রিপোর্টস-এ প্রকাশিত আমাদের গবেষণাপত্রটির শিরোনাম ছিল, “আমরা কি সত্যিই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন, নমনীয় ও স্বচ্ছ কম্পিউটার তৈরি করতে পারি?” গবেষণাটি দেখিয়েছিল, বাল্ক সিলিকন (১০০) ওয়েফার থেকে প্রচলিত মাইক্রোফ্যাব্রিকেশন ও সিএমওএস-সামঞ্জস্যপূর্ণ প্রক্রিয়া ব্যবহার করে উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিলিকন ইলেকট্রনিক্সকে নমনীয় ও আংশিক স্বচ্ছ করা সম্ভব।
গবেষণায় তৈরি সিলিকন ফ্যাব্রিকের পুরুত্ব ছিল প্রায় ১৫–১৭.৫ মাইক্রোমিটার এবং এটি প্রায় ৫ মিলিমিটার বাঁকন-ব্যাসার্ধ পর্যন্ত বাঁকানো সম্ভব হয়েছিল। ডিভাইসগুলোতে উচ্চ-কে/ধাতব-গেট প্রযুক্তির পি-টাইপ এমওএসএফইটি ব্যবহার করা হয়। একই সঙ্গে গবেষণায় দেখানো হয়েছিল, ব্যবহৃত বাল্ক সিলিকন সাবস্ট্রেট রাসায়নিক-যান্ত্রিক সমতলীকরণ প্রক্রিয়ার মাধ্যমে পুনরায় ব্যবহার করা সম্ভব।
সেই সময় ন্যানোওয়ার্ক এই কাজ নিয়ে লিখেছিল, “নমনীয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার তৈরির পথে।” ভবিষ্যৎ সম্ভাবনার আলোচনায় ভাঁজযোগ্য, কাগজের মতো পাতলা ট্যাবলেট কম্পিউটার ও স্মার্টফোনের কথাও উঠে এসেছিল।
এবার চমকটা বলি।
কাজটি এমআইটি, স্ট্যানফোর্ড বা সিলিকন ভ্যালিতে হয়নি। হয়েছিল সৌদি আরবের মরুভূমিতে, তখনকার সদ্য প্রতিষ্ঠিত কিং আবদুল্লাহ ইউনিভার্সিটি অব সায়েন্স অ্যান্ড টেকনোলজি বা কেএইউএসটির ইন্টিগ্রেটেড ন্যানোটেকনোলজি ল্যাবে। গবেষণাপত্রের লেখক ছিলেন জনাথান পি. রোজাস, গালো এ. টরেস সেভিয়া এবং আমি—মুহাম্মদ এম. হুসাইন। গবেষণাপত্রে আমাদের সবার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচয় হিসেবে কেএইউএসটির ইন্টিগ্রেটেড ন্যানোটেকনোলজি ল্যাবের নাম উল্লেখ করা হয়েছে।
আলহামদুলিল্লাহ, সেই দলটি ছিল আমাদের।
আমরা আজকের অ্যাপল বা স্যামসাংয়ের ভাঁজযোগ্য ফোন বানিয়েছি—এমন দাবি করছি না। নমনীয় ইলেকট্রনিক্সও আমরা আবিষ্কার করিনি। আমাদের প্রশ্নটি ছিল আলাদা: বিদ্যমান সেমিকন্ডাক্টর ব্যবস্থাকে বাদ না দিয়েই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন সিলিকন ইলেকট্রনিক্সকে নমনীয় করা যায় কি? আলহামদুলিল্লাহ, আমরা দেখিয়েছিলাম—যায়।
তখন কেএইউএসটি নতুন। সৌদি আরবকে প্রযুক্তির অগ্রভূমি হিসেবে দেখার লোকও কম ছিল। তাই হয়তো কাজটি তার প্রাপ্য আলো পায়নি। কিন্তু বিজ্ঞানের কোনো পাসপোর্ট নেই। উদ্ভাবনের কোনো ঠিকানাও নেই।
আর ঠিক এখানেই সিলিকন রিভার বাংলাদেশের দুঃসাহসী স্বপ্নের সঙ্গে গল্পটি মিলে যায়—ভীষণ নয়, ভিশন!
আজ কেউ বলবে, বাংলাদেশ কেন উন্নত মেমোরি, এজেন্টিক এআই, এআইওটি, ডিজিটাল টুইন, বিশেষায়িত পরীক্ষা, স্বয়ংক্রিয় সংযোজন, প্যাকেজিং, কৌশলগত ফ্যাব্রিকেশন, মেধাস্বত্ব বা পণ্য উন্নয়ন নিয়ে ভাববে? সক্ষমতা কোথায়?
আমার উত্তর খুব সহজ।
সক্ষমতা সবসময় শুরু করার আগে তৈরি থাকে না। কাজ করতে করতেই সক্ষমতা তৈরি হয়।
২০১৩ সালে মরুভূমির একটি নতুন বিশ্ববিদ্যালয় যদি ভবিষ্যতের নমনীয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটিং নিয়ে প্রশ্ন করতে পারে, ২০২৬ সালে বাংলাদেশ কেন সেমিকন্ডাক্টর ও গভীর প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নিয়ে প্রশ্ন করবে না?
অন্যের প্রযুক্তি সফল হওয়ার পরে সস্তা সেবা-দাতা হিসেবে প্রবেশ করা সহজ।
আমাদের লক্ষ্য হলো তার আগেই জ্ঞান, মেধাস্বত্ব, পণ্য ও কোম্পানি তৈরির টেবিলে বসা।
কারণ ভবিষ্যৎ যখন সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে যায়, সবচেয়ে মূল্যবান চেয়ারগুলো সাধারণত ততক্ষণে দখল হয়ে গেছে।
সিলিকন রিভার সেই চেয়ারগুলোর একটিতে বাংলাদেশের নাম লিখতে চায়।
ইনশাআল্লাহ; বাংলাদেশ।
তথ্যসূত্র:
জনাথান পি. রোজাস, গালো এ. টরেস সেভিয়া ও মুহাম্মদ এম. হুসাইন, “আমরা কি সত্যিই উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন, নমনীয় ও স্বচ্ছ কম্পিউটার তৈরি করতে পারি?”, সায়েন্টিফিক রিপোর্টস, ১০ সেপ্টেম্বর ২০১৩।
ন্যানোওয়ার্ক, “নমনীয় উচ্চক্ষমতাসম্পন্ন কম্পিউটার তৈরির পথে”, সেপ্টেম্বর ২০১৩।
লেখক || প্রধান স্থপতি, সিলিকন রিভার; অধ্যাপক, পারডু ইউনিভার্সিটি, ইন্ডিয়ানা, যুক্তরাষ্ট্র
সম্পাদকীয় নোট || প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব এবং তা ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের সম্পাদকীয় অবস্থানকে অপরিহার্যভাবে প্রতিফলিত করে না। মতপ্রকাশের বৈচিত্রময়তাকে সমুন্নত রাখতে কোনো সম্পাদকীয় সেন্সরশিপ ছাড়াই টেক-থট প্রকাশ করা হয়।





