ডিজিটাল ফরেনসিকে নির্দোষের মুক্তি
লগফাইলের অন্ধকারে লুকানো অপরাধী
ফোনের ওপাশ থেকে ভেসে এলো মালিহার (ছদ্মনাম) আতঙ্কিত কণ্ঠ। গভীর রাত, পাশে ঘুমিয়ে আছে তাঁর দুই বছরের ফুটফুটে কন্যাসন্তান। অথচ মা দুচোখের পাতা এক করতে পারছেন না। তাঁর কিছু পুরোনো ব্যক্তিগত ছবি পাঠিয়ে অজানা এক নম্বর থেকে ব্ল্যাকমেইল করা হচ্ছে।
পরিস্থিতির প্রেক্ষাপটে স্বাভাবিকভাবেই প্রথম সন্দেহ গিয়ে পড়েছিল তাঁর সাবেক প্রেমিকের দিকে। সামাজিকভাবে এমন ক্ষেত্রে আঙুল তো সেদিকেই ওঠে। সাবেক প্রেমিক ব্যাকুল হয়ে শপথ করে বললেন, “বিশ্বাস করুন, আমি কিছুই করিনি।”
আমি কেবল চুপ করে শুনলাম।
আমাদের বাস্তবতায় অনেক সময় মানুষ কোনো অপরাধ না করেও পরিস্থিতির শিকার হয়ে অপরাধীর কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে যায়। কিন্তু অনুমানের ওপর তো আর বিচার চলে না। সত্যিটা তবে লুকিয়ে থাকে কোথায়? সত্যি থাকে অপারেটিং সিস্টেমের গভীরে, লগফাইলের অন্ধকারে, হার্ডড্রাইভের অপরিচিত সেক্টরে কিংবা গুগল ক্লাউডের নীরব অ্যাক্টিভিটি লগে।
ডিভাইসটি ফরেনসিক পর্যালোচনার জন্য হাতে নিলাম। সামনে এলো এক ভয়াবহ চিত্র—একটি মারাত্মক র্যাট (Remote Access Trojan - RAT)-এর মাধ্যমে সিস্টেমের ‘রুট অ্যাক্সেস’ নিয়ে বসে রয়েছে এক অচেনা হ্যাকার। সে দূর থেকেই মালিহার ক্লাউড ও ডিভাইসের গুগল ফটোজ ঘেঁটে সংবেদনশীল ছবিগুলো হাতিয়ে নিয়েছে। বিস্ময়কর বিষয় হলো, সাবেক প্রেমিকের ফোনটিও একই কৌশলে অন্য কারো নিয়ন্ত্রণে চলে গিয়েছিল, যা তিনি নিজেও ঘুণাক্ষরে টের পাননি।
এখানেই দৃশ্যপটে এলো ডিজিটাল ফরেনসিকের বৈজ্ঞানিক তদন্ত:
-
চেইন অব কাস্টডি ও হ্যাশ ভ্যালু: আইনি মান বজায় রেখে শুরুতেই ডিভাইসের ক্রিপ্টোগ্রাফিক হ্যাশ ভ্যালু সংরক্ষণ করা হলো, যাতে কোনো ডেটা সামান্যতম বিকৃত না হয়।
-
ফিজিক্যাল ইমেজিং ও সিস্টেম বিশ্লেষণ: ফোনের ফিজিক্যাল ইমেজ তৈরি করে অভ্যন্তরীণ ফাইল সিস্টেম ঘেঁটে সুকৌশলে লুকিয়ে থাকা আরএটি (RAT) ম্যালওয়্যারটির ডিজিটাল স্বাক্ষর শনাক্ত করা হলো।
-
ক্লাউড ও নেটওয়ার্ক ফরেনসিক: ক্লাউড হিস্ট্রি উন্মোচন করতেই দেখা গেল অজ্ঞাত আইপি (IP) অ্যাড্রেস থেকে বারবার অননুমোদিত অ্যাক্সেস। এরপর নেটওয়ার্ক ফরেনসিকে ধরা পড়ল দূরবর্তী এক বিদেশি কমান্ড-অ্যান্ড-কন্ট্রোল (C2) সার্ভারের সঙ্গে ডেটার গোপন সংযোগ।
-
ম্যালওয়্যার অ্যানালাইসিস: বিশ্লেষণে অকাট্যভাবে বেরিয়ে এলো যে ব্যাকগ্রাউন্ডে নিয়মিত ‘ডেটা এক্সফিলট্রেশন’ বা সংবেদনশীল ফাইল পাচার হচ্ছিল।
প্রমাণভিত্তিক তদন্তের প্রতিটি ধাপে মেঘ সরে গিয়ে আলো ফুটে উঠল। আসল অপরাধী মালিহার পরিচিত বৃত্তের কোনো মানুষ নয়; লুকিয়ে ছিল সাইবার জগতের অন্ধকারের এক অদৃশ্য হ্যাকার।
মানুষ স্বভাবসুলভ আবেগে মানুষকে ভুল সন্দেহ করে; কিন্তু প্রযুক্তি নিরপেক্ষ থেকে নির্ভুল সত্যটি সামনে তুলে ধরে। ন্যায়বিচার কেবল কোনো অপরাধীকে চিহ্নিত করার নাম নয়—একজন নির্দোষকে অপবাদের হাত থেকে মুক্ত করাও ন্যায়বিচারের সমান মর্যাদাপূর্ণ অংশ।
আমার হাতের ফরেনসিক কিবোর্ডে ন্যায়বিচার কখনো পথ হারায় না; সত্য কেবল নিজেকে উন্মোচনের সঠিক উপায় ও কিছুটা সময় চায়।
লেখক || সাইবার ফরেনসিক বিশেষজ্ঞ এবং আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের (আইসিটি) প্রসিকিউটর ও তদন্ত কর্মকর্তা
লেখাটি লেখকের নিজস্ব চিন্তার ফসল। এর সঙ্গে কারও চরিত্রের মিল পাওয়া গেলে তা একান্তই কাকতাল মাত্র। একইসঙ্গে লেখকের ব্যক্তিগত বিশ্লেষণী মূল্যায়নে ‘ডিজিবাংলাটেক.নিউজ’-এর কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। ‘টেক-থট’-এ প্রকাশিত মতামত লেখকের নিজস্ব; এর সাথে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের সম্পাদকীয় নীতিমালার প্রত্যক্ষ সংশ্লিষ্টতা নেই। মতপ্রকাশের উদারতা সমুন্নত রাখতে লেখাটি অবিকৃত রেখে প্রকাশ করা হলো।





