জলবায়ু অর্থায়নে অনুদান চায় বাংলাদেশ
কপ-৩১ সামনে রেখে ছয় দফা দাবি তরুণদের
- জলবায়ু ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় উন্নত দেশগুলোর প্রতিশ্রুত অর্থায়ন নিশ্চিত করার আহ্বান
- এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত প্রয়োজন ১১৬.১৮ বিলিয়ন ডলার
- জলবায়ু নীতিনির্ধারণে তরুণ, নারী ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ বাড়ানোর দাবি
জলবায়ু পরিবর্তনের ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলা, গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন কমানো এবং অভিযোজন কার্যক্রম বাস্তবায়নে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত বাংলাদেশের প্রয়োজন ১১৬.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এই বিপুল অর্থের মধ্যে ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে সংগ্রহের লক্ষ্য রয়েছে। এ অবস্থায় জলবায়ু সংকটে ক্ষতিগ্রস্ত দেশগুলোর ঋণের বোঝা না বাড়িয়ে উন্নত দেশগুলোকে প্রতিশ্রুত অর্থ অনুদানভিত্তিক পদ্ধতিতে দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ ইসলাম। একই সঙ্গে আসন্ন জাতিসংঘ জলবায়ু সম্মেলন কপ-৩১-এ বাংলাদেশের দাবি জোরালোভাবে তুলে ধরতে সরকার, বেসরকারি খাত, নাগরিক সমাজ ও তরুণদের সমন্বিত উদ্যোগের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
২৪ অক্টোবর, শনিবার রাজধানীর সিরডাপ মিলনায়তনে ‘জনবান্ধব জলবায়ু নীতি: কপ-৩১-এ বাংলাদেশের অবস্থান’ শীর্ষক জাতীয় সংলাপে প্রধান অতিথির বক্তব্যে এসব কথা বলেন শামা ওবায়েদ ইসলাম। বাংলাদেশে জলবায়ু নিয়ে কাজ করা ৩৩টি জাতীয় ও আন্তর্জাতিক সংস্থা এবং নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা যৌথভাবে এ সংলাপের আয়োজন করেন।
শামা ওবায়েদ ইসলাম বলেন, প্যারিস জলবায়ু চুক্তির এক দশক পর এখন শুধু অঙ্গীকার করলেই চলবে না, সেগুলোর বাস্তবায়নের অগ্রগতিও নিশ্চিত করতে হবে। বাংলাদেশের জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ক্ষয়ক্ষতি মোকাবিলায় পর্যাপ্ত অর্থায়ন প্রয়োজন। পাশাপাশি অভিযোজন ও প্রশমন কার্যক্রমে সমান গুরুত্ব দিতে হবে এবং আন্তর্জাতিক আলোচনায় স্বচ্ছতা বাড়াতে হবে।
তিনি জানান, জলবায়ু ইস্যুতে পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এবং পরিবেশ ও জলবায়ুবিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মধ্যে সমন্বয় জোরদারের উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। এ প্রক্রিয়ায় জলবায়ু নিয়ে কাজ করা তরুণদেরও সম্পৃক্ত করার আগ্রহ প্রকাশ করেন তিনি।
কপ-৩১-এ বাংলাদেশের পরিবেশবান্ধব পাটজাত পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরার পরিকল্পনার কথাও জানান পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী। তিনি বলেন, বিশেষ ‘জুট প্যাভিলিয়নের’ মাধ্যমে আন্তর্জাতিক পর্যায়ে এসব পণ্য তুলে ধরার উদ্যোগ নেওয়া হচ্ছে। এতে পাটের বৈশ্বিক বাজার সম্প্রসারণের পাশাপাশি দেশের কৃষকদের জীবনমান উন্নয়নের সুযোগ তৈরি হতে পারে।
অনুষ্ঠানে বিশেষ অতিথির বক্তব্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের পরিচালক মির্জা শওকত আলী বলেন, শিল্প খাতে নির্গমন কমাতে বিভিন্ন উদ্যোগ চলছে। আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের দাবি কার্যকরভাবে তুলে ধরতে নির্ভরযোগ্য তথ্য-প্রমাণ ও সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা প্রয়োজন।
জলবায়ু মোকাবিলায় ১১৬ বিলিয়ন ডলারের বেশি প্রয়োজন
সংলাপে উপস্থাপিত তথ্য অনুযায়ী, বাংলাদেশের হালনাগাদ জাতীয়ভাবে নির্ধারিত অবদান (এনডিসি ৩.০) বাস্তবায়নের আওতায় ২০৩৫ সালের মধ্যে গ্রিনহাউস গ্যাস নির্গমন ২০.৩১ শতাংশ বা ৮৪.৯৭ মিলিয়ন টন কার্বন ডাই-অক্সাইড সমতুল্য কমানোর লক্ষ্য নির্ধারণ করা হয়েছে।
২০২৬ থেকে ২০৩৫ সাল পর্যন্ত এ পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রয়োজন হবে ১১৬.১৮ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। এর মধ্যে ৯০.২৩ বিলিয়ন ডলার আন্তর্জাতিক সহায়তা থেকে সংগ্রহ করতে হবে।
এ ছাড়া জাতীয় অভিযোজন পরিকল্পনার আওতায় ২০২৩ থেকে ২০৫০ সাল পর্যন্ত ১১৩টি উদ্যোগ বাস্তবায়নে প্রায় ২৩০ বিলিয়ন ডলারের প্রয়োজন চিহ্নিত করা হয়েছে।
সংলাপে জলবায়ু অর্থায়ন, বায়ুদূষণ, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, শিল্প খাতের নির্গমন, ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর এবং সামুদ্রিক সম্পদ ব্যবস্থাপনার মতো গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ে আলোচনা হয়।
সিএপিএসের চেয়ারম্যান অধ্যাপক ড. আহমদ কামরুজ্জামান মজুমদার বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ ও শিল্প খাতে নির্গমন কমানোর ওপর গুরুত্ব দেন। অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের প্রতিনিধিরা ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর, সামুদ্রিক সম্পদ সংরক্ষণ ও আন্তর্জাতিক অর্থায়ন নিয়ে আলোচনা করেন।
জলবায়ু অর্থায়নে তরুণদের ছয় দফা দাবি
সংলাপে তরুণ প্রতিনিধিরা জলবায়ু অর্থায়ন, শিক্ষা, কর্মসংস্থান, সামাজিক সুরক্ষা এবং সিদ্ধান্ত গ্রহণ প্রক্রিয়ায় তরুণদের অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ছয় দফা দাবি তুলে ধরেন।
আলোচনায় জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের কাছে অর্থায়নের সুফল পৌঁছানো, বাস্তুচ্যুত মানুষের পুনর্বাসন এবং নারী, প্রতিবন্ধী ব্যক্তি ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়।
স্বাগত বক্তব্যে ন্যাচার কনজার্ভেশন ম্যানেজমেন্টের (ন্যাকম) নির্বাহী পরিচালক ড. এস এম মঞ্জুরুল হান্নান খান বলেন, প্যারিস চুক্তির ১০ বছর পর এর বাস্তবায়নের অগ্রগতি পর্যালোচনা করা প্রয়োজন। বাংলাদেশ নিজস্ব এনডিসি বাস্তবায়নে কাজ করছে। তবে জলবায়ু অর্থায়ন, নীল অর্থনীতি, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং নগরাঞ্চলের তাপজনিত ঝুঁকি মোকাবিলায় সমন্বিত পরিকল্পনা জরুরি।
সংলাপের সমাপনী বক্তব্যে অ্যাকশনএইড বাংলাদেশের কান্ট্রি ডিরেক্টর ফারাহ্ কবির বলেন, বাংলাদেশ জলবায়ু পরিবর্তনের অন্যতম প্রধান ভুক্তভোগী। তাই আন্তর্জাতিক সম্মেলনগুলোতে ঋণের বোঝা বাড়ানোর পরিবর্তে অনুদানভিত্তিক আর্থিক সহায়তা আদায়ে সবাইকে ঐক্যবদ্ধভাবে কাজ করতে হবে।
জাতীয় অবস্থানপত্রে ছয়টি প্রধান সুপারিশ
নাগরিক সমাজ ও সুশীল সমাজের জাতীয় অবস্থানপত্রে কপ-৩১ সামনে রেখে ছয়টি প্রধান দাবি ও সুপারিশ তুলে ধরা হয়েছে।
ঋণমুক্ত জলবায়ু অর্থায়ন: এনডিসি ৩.০ বাস্তবায়নসহ আন্তর্জাতিক জলবায়ু অর্থায়ন অনুদানভিত্তিক করতে হবে।
সম্মিলিত অবস্থান: আন্তর্জাতিক আলোচনায় সরকার, নাগরিক সমাজ, তরুণ ও বেসরকারি খাতের সমন্বিত অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
পরিবেশবান্ধব পণ্যের প্রসার: কপ-৩১-এ পাটের মতো দেশীয় পরিবেশবান্ধব পণ্যের সম্ভাবনা তুলে ধরতে হবে।
শিল্প ও বায়ুদূষণ নিয়ন্ত্রণ: শিল্প খাতে নির্গমন কমানোর পাশাপাশি শ্রমিকদের সুরক্ষা ও ন্যায্য জ্বালানি রূপান্তর নিশ্চিত করতে হবে।
তরুণ ও প্রান্তিক জনগোষ্ঠীর অংশগ্রহণ: জলবায়ুবিষয়ক নীতিনির্ধারণ ও জাতীয় প্রতিনিধিদলে নারী, তরুণ ও ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অর্থবহ অংশগ্রহণ নিশ্চিত করতে হবে।
নগরাঞ্চলের জলবায়ু সংকট মোকাবিলা: জলবায়ু অভিবাসীদের নিরাপদ আবাসন, উন্নত বর্জ্য ব্যবস্থাপনা এবং তাপপ্রবাহ মোকাবিলায় প্রয়োজনীয় অর্থায়ন নিশ্চিত করতে হবে।
আয়োজকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশের নাগরিক সমাজ, আন্তর্জাতিক বেসরকারি সংস্থা, গবেষণা প্রতিষ্ঠান ও তরুণদের ৩৩টি সংগঠনের সমন্বয়ে জাতীয় অবস্থানপত্রটি তৈরি করা হয়েছে। এতে আন্তর্জাতিক জলবায়ু আলোচনায় বাংলাদেশের দাবি জোরালো করা এবং জলবায়ু পরিবর্তনে ক্ষতিগ্রস্ত মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে।
//ডিবিটেক/জেডএইচআই/এমএসআই/এসএমপি//





