দ্রুত টিকাদান এবং রোগের প্রাদুর্ভাব মোকাবিলায় জোরালো পদক্ষেপ না নেওয়া হলে সংক্রমণ বাড়তে থাকবে, তাতে স্বাস্থ্য সেবা খাতের ওপর বাড়তি চাপ তৈরি হবে এবং শিশু স্বাস্থ্যের গুরুতর অবনতির ঝুঁকি তৈরি করবে। এই জরুরি টিকাদান কর্মসূচি নিয়মিত টিকাদান প্রচেষ্টার সম্পূরক হিসেবে কাজ করবে এবং এটি হলো টিকাদানের লক্ষ্য পূরণ, স্বাস্থ্যব্যবস্থা শক্তিশালী এবং ভবিষ্যতে সংক্রমণ প্রতিরোধের সক্ষমতা তৈরির একটি বৃহত্তর কৌশলের অংশবিশেষ।
বাংলাদেশে ইউনিসেফের প্রতিনিধি রানা ফ্লাওয়ার্স বলেন, “শিশুদের সুস্থভাবে বেঁচে থাকার ক্ষেত্রে টিকা একটি মৌলিক উপাদান। বাংলাদেশজুড়ে হামের সংক্রমণ বৃদ্ধিতে হাজার হাজার শিশু, বিশেষ করে ছোট শিশু ও সবচেয়ে অসহায় অবস্থায় থাকা শিশুরা গুরুতর ঝুঁকির মুখে পড়ায় ইউনিসেফ গভীরভাবে উদ্বিগ্ন। এভাবে সংক্রমণ ফিরে আসাটা গুরুতর রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতির (ইমিউনিটি গ্যাপ) দিকটি তুলে ধরছে, বিশেষ করে যেসব শিশুরা একেবারেই কোনও টিকা পায়নি (জিরো-ডোজ) অথবা টিকার আংশিক ডোজ পেয়েছে এমন শিশুদের ক্ষেত্রে। পাশাপাশি নয় মাসের কম বয়সী শিশু যারা এখনও নিয়মিত টিকাদানের জন্য উপযুক্ত নয়, তাদেরও সংক্রমিত হওয়ার বিষয়টা বিশেষভাবে উদ্বেগজনক।”
রানা ফ্লাওয়ার্স আরও বলেন, “যেসব পরিবার তাদের প্রিয়জনদের হারিয়েছে, তাদের প্রতি আমরা গভীর সমবেদনা জানাচ্ছি এবং বাংলাদেশ সরকার এই জরুরি টিকাদান কার্যক্রম নিয়ে যে প্রচেষ্টা গ্রহণ করেছে তাতে সহায়তা প্রদান করছি। সমন্বিত পদক্ষেপের মাধ্যমে সংক্রমণের এই ফিরে আসাটা নিয়ন্ত্রণ করা সম্ভব। প্রতিটি শিশু যেন টিকার আওতায় আসে, রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার ঘাটতি পূরণ করা যায় এবং এই প্রতিরোধযোগ্য রোগ থেকে বাংলাদেশের শিশুদের সুরক্ষিত রাখতে ইউনিসেফ সরকার ও অংশীজনদের সঙ্গে নিবিড়ভাবে কাজ করছে।”
বাংলাদেশে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার (ডব্লিউএইচ) প্রতিনিধি ডা. আহমেদ জামশিদ মোহামেদ বলেন, “সুনির্দিষ্ট ও সময়োচিত পদক্ষেপ নেওয়ার জন্য বাংলাদেশ সরকারের প্রশংসা করছে বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা।” তিনি বলেন, “দেশজুড়ে সংক্রমণ দেখা দেওয়ার পর উচ্চ ঝুঁকির এলাকাগুলোর ৬ মাস থেকে ৫৯ মাস বয়সী শিশুদের টিকার আওতায় আনার লক্ষ্যে গৃহীত এই টিকাদান কর্মসূচি আরও শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যু ঠেকানো এবং এই প্রাদুর্ভাব দেখা দেওয়ার পেছনে যে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার (ইমিউনিটি গ্যাপ) ঘাটতি রয়েছে তা দূর করতে সহায়তা করবে। হাম-রুবেলার টিকা নিরাপদ ও কার্যকর এবং তা বিশ্বজুড়ে কোটি কোটি শিশুকে সুরক্ষিত করেছে— দ্রুত সংক্রমিত হওয়া এই রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তোলার ক্ষেত্রে এটাই আমাদের সবচেয়ে শক্তিশালী হাতিয়ার।”
ডা. আহমেদ জামশিদ মোহামেদ আরও বলেন, “বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা সব বাবা-মা ও অভিভাবকদের (কেয়ারগিভার) প্রতি তাদের সন্তানদের নিকটস্থ টিকাদান কেন্দ্রে নিয়ে টিকা দেবার জন্য আহ্বান জানাচ্ছে এবং বাংলাদেশজুড়ে প্রতিটি শিশুর স্বাস্থ্য সুরক্ষায় বাংলাদেশ সরকার ও অংশীজনদের সহায়তা দিতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ রয়েছে।”
বাংলাদেশে গ্যাভি, দ্য ভ্যাকসিন অ্যালায়েন্সের সিনিয়র কান্ট্রি ম্যানেজার ডির্ক গেহল বলেন, “এই প্রাদুর্ভাবে শিশুদের প্রাণহানি একটি মর্মান্তিক বিষয়কে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে, রোগপ্রতিরোধে ঘাটতি থাকলে হাম দ্রুতই প্রাণঘাতী হয়ে উঠতে পারে। স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ মন্ত্রণালয়, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ও ইউনিসেফের সঙ্গে যৌথভাবে গ্যাভি ইতিমধ্যে দেশে থাকা হাম-রুবেলার টিকাদান কর্মসূচি বাস্তবায়নে বাংলাদেশকে সহায়তা করছে। বর্তমান পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে আমাদের সর্বোচ্চ কার্যকর উপায়ে একসঙ্গে কাজ করা এখন অত্যন্ত জরুরি।”
ইউনিসেফ বলছে, বাংলাদেশে উচ্চ হারে শিশুদের টিকাদানের একটি সফল ইতিহাস রয়েছে। কিন্তু সামান্য বিঘ্নও, সময়ের সাথে সাথে পর্যায়ক্রমে রোগপ্রতিরোধ ক্ষমতার বড় ঘাটতি (ইমিউনিটি গ্যাপ) দেখা দেওয়ার কারণ হতে পারে। বর্তমানে যেভাবে হামের প্রাদুর্ভাব দেখা দিয়েছে তা সাধারণত কোনো একক কারণে নয়, বরং এ ধরনের ঘাটতিগুলোর সামগ্রিক ফলাফল। টিকা সংগ্রহের প্রধান সংস্থা হিসেবে ইউনিসেফ সরকারের সঙ্গে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করছে, যাতে সময়মতো মানসম্মত টিকা পাওয়াটা নিশ্চিত করা যায় এবং চাহিদা বৃদ্ধির প্রেক্ষিতে সরবরাহ দ্রুততর করা যায়।
ডিবিটেক/এমএআর/ইকে