ভিউ শিকারিদের অপতথ্য মোকাবেলায় সাংবাদিকদের ‘অ্যাপ্রোচ’ বদলে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরমর্শ পিআইবি মহাপরিচলকের

ভিউ শিকারিদের অপতথ্য মোকাবেলায় সাংবাদিকদের ‘অ্যাপ্রোচ’ বদলে প্রযুক্তি ব্যবহারের পরমর্শ পিআইবি মহাপরিচলকের
১০ জানুয়ারি, ২০২৬ ১৬:২৭  

সংস্কার নিয়ে ‘ছলনা’ চলছে মন্তব্য করে ত্রয়োদশ নির্বাচনে ভোটের সংস্কারের নিয়ে ‘গণভোট’ বিষয়ে আলোচনা ও সচেতনতা বাড়াতে গণমাধ্যমকর্মীদের প্রতি অনুরোধ জানিয়েছেন প্রেস ইনস্টিটিউট অব বাংলাদেশের (পিআইবি) মহপারিচালক ফারুক ওয়াসিফ। নির্বাচনের গতানুগতিক আয় ব্যয়ের খবরের বাইরেও নতুন বাস্তবতার খবর তুলে ধরতে আহ্বান জানিয়ে ভিউ শিকারিদের অপতথ্য মোকাবেলায় সাংবাদিকদের ‘অ্যাপ্রোচ’ বদলে প্রযুক্তি ব্যবহারের আহ্বান দিয়েছেন তিনি। 

১০ জানুয়ারি (শনিবার) ঢাকা রিপোর্টাস ইউনিটির (ডিআরইউ) ৫০ জন নির্বাচিত সদস্যকে নিয়ে অনুষ্ঠিত দুই দিনব্যাপী নির্বাচন বিষয়ক সাংবাদিকতা প্রশিক্ষণের সমাপনীতে এই আহ্বান জানান  পিআইবি মহাপরিচালক।  

ফারুক ওয়াসিফ বলেন, ইতিমধ্যে যে সমাজ বাস্তবতা বা আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি বদলে গেছে। যাদের আমরা বলছি, তাদের মনোভঙ্গি আমূল বদলে গেছে এবং জনগণের বড় অংশই তারা। সেভেন্টি টু সেভেন্টি টু পার্সেন্টের বয়স ১৫ থেকে থেকে ৪৫ ধরলে। আমাদের এই গতানুগতিক সাংবাদিকতা দিয়ে তাদেরকে আমরা কিন্তু স্পর্শ করতে পারব না। তার নিজস্বভাবে তথ্য পাওয়ার উপায় আছে। সে গুগল করে, এআই করে প্রার্থী সম্পর্কিত জেনে নিতে পারবে। কিন্তু যে জিনিসটা ইন্টারেস্টিং করা যায় সেটা হচ্ছে, যদি আমরা একই সঙ্গে এই সংস্কারের প্রসঙ্গগুলো নির্বাচনী সাংবাদিকতার মধ্যে আনি। আমরা যদি একটা আসনে দশজন প্রার্থী, তার মধ্যে কয়জন সংস্কারের কথা বলছে, কয়জন বলছে না? এটা একটা খবর। তিনি তার দলে শীর্ষ পর্যায়ে হয়তো সংস্কারের পক্ষে কথাবার্তা আছে। কিন্তু মাঠ পর্যায়ে তার কোন বক্তব্যে এটা পাওয়া গেল না, যে সংস্কারের চার দফা তিনি হয়তো বলছেন, তার কর্মীরা মানে বাইরে বলছেন, কিন্তু কর্মীদের বলা হচ্ছে যে, তোমরা না ভোটের পক্ষে বলবা। আমি উপরে যা বলি...। ফলে আপনার ইন্টারভিউ শুধু প্রার্থীকে করলে হচ্ছে না, তার মিছিলের শেষ লোকটাকেও করা দরকার।  


‘ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বিলোপের পলিটিক্যাল আহ্বান থেকে আমরা একটা নরম সুশীল হচ্ছে সংস্কার শব্দের পর্যবসিত করছি। মূল ফ্যাসিবাদী ব্যবস্থা বলে অনেক কঠিন কাজ। আপনাকে অনেক লোককে বিচার করতে হবে। অনেকগুলো প্রতিষ্ঠান ভেঙে নতুন করে গড়তে হবে। আপনার আইন বদলাতে হবে। এখন যাক, এ পর্যন্ত যদি আসে, ভবিষ্যতে দেখা যাবে সেটা, যে সংস্কারটুকু হয় কিনা। কিন্তু যদি না হয়, মানুষের ক্ষোভ, বিক্ষোভ কিন্তু আবার হবে। এখানে ধিকিধিকি আগুন জ্বলছে। এই যে কারওয়ান বাজারে দেখা গেল যে, চাদাবাজি করতে গিয়ে ব্যবসায়ীরা মানে লাঠি হাতে নামলেন এবং মাস্তানদের ধাওয়া দিলেন। মানুষ সহ্য করবে না, মানুষ ওই আগের মতো অনিয়ম দুর্নীতি সহ্য করবে না। ক্যাম্পাসগুলোতে তারা আর আগের মতো দুর্নীতি সহ্য করবে না। তো, এই নতুন বাস্তবতার সাথে আমরা সাংবাদিকেরা থাকতে পারব কিনা? আমরা তাদের পক্ষে ওই জায়গায় বিশ্লেষক করতে পারব কিনা? কারণ অতীতে আমরা পারিনি। আমাদের মালিকানা, আমাদের প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি, তারা যেটাকে আমরা বলছি প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সংবাদ জগৎ যে একটা আগ্রাসনে আগ্রাসী ভূমিকা পালন করেছে। তারা এই যে পুরো উন্নয়ন প্রকল্প, এই প্রকল্পগুলো যে ট্রানজিটের প্রকল্প, এই যে পদ্মা সেতু থেকে শুরু করে বন্দর টন্দর সব এগুলো আসলে তো ট্রানজিটের শর্ত। আমার টাকায় ওদের জন্য ট্রানজিটে আমি বড় বড় চওড়া রাস্তা বানায় দিছি, লোন করে। পত্রিকা উদযাপন করছে পদ্মা, স্বপ্নের পদ্মা সেতু। কিন্তু এই সেতু তো আসলে মানে সরাসরি পশ্চিমবঙ্গ থেকে এখানে তাদের পণ্য এবং তাদের অন্য কিছু আসার সহজ সহজ করে দিতে। ওটাই ছিল পরিকল্পনা। এগুলো রিপোর্টে আসেনি, উন্নয়নের বয়ানে সব ভেসে গেছে। তো এই বয়ানগুলো মুক্তিযুদ্ধের বয়ানে...... অপরাধ, গুম, খুন, আইন আর ধরে গেলেই ঠিক হয়ে গেছে। এখন আজকে একাত্তর তো অবশ্যই আমাদের ভিত্তি, কিন্তু চব্বিশ তো আমাদের একরকম মুক্তি। সামান্য কিছু মুক্তি যদি আমরা পাই, পেয়ে থাকি তো তার প্রতি তো আমার একটা কৃতজ্ঞতা থাকে। সেই জায়গাটা বাংলাদেশে এখন দেখবেন যে আলোচনা নাই। সব সময় বিপ্লব তার সন্তানদের খেয়ে ফেলে এবং যারা বিপ্লবের নেতৃত্বে মূল জায়গায় ছিল না, তাদের কিন্তু ওই পরিবর্তন নিয়ে অস্বস্তি আছে। যে দলটা একাত্তরে শত্রুপক্ষে ছিল, তার যেমন একাত্তর নিয়ে অস্বস্তি থাকবে। আর যে দলটা চব্বিশে ফ্রন্টলাইনে প্রথম থেকে ছিল না বা শেষ মুহূর্তে এসে দৌড়ে এসে ওই অভ্যুত্থানের ট্রেনে উঠে পড়ছে, তার কিন্তু অস্বস্তি থাকবে। ফলে, সে চেষ্টাই করবে অভ্যুত্থানকে ছোট করে দেখাতে এবং নিজের কোন অতীতের পনেরো বছরের আন্দোলনকে বড় করে দেখাতে। তো, আমরা যখন এই রিপোর্টিং এ যাব, তখন কি এই জুলাইয়ের প্রসঙ্গটা যে, আপনি যে ভোট দিতে যাচ্ছেন, এখানে জুলাইয়ের কোন অনুভূতি বা আবেগ আপনার ভেতরে কাজ করবে কিনা? আপনি বলতে পারেন, আপনি কাকে ভোট দিবেন? তো, এই কথা তো আমরা বলতে পারি সাংবাদিক হিসেবে। কারণ, এটা সাংবাদিকতার নিরপেক্ষতার বিরুদ্ধে নয়। কারণ, জুলাইকে একটা ফাউন্ডেশনাল ইভেন্ট যদি ধরি, যার পরের বাস্তবতা আগের যুগ একেবারেই আলাদা হয়ে গেছে। তাহলে, সেই ফাউন্ডেশনের প্রতি তো আমার সততা থাকে। যেমন বাংলাদেশ রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠা একাত্তর সালের ফাউন্ডেশন, তার প্রতি যেমন আমার বিশ্বস্ততা লাগবে, জুলাইয়ের প্রতি তো আমার বিশ্বস্ততা লাগবে। এটা তো রাজনৈতিক বিষয় নয় আর, এটা তো দলীয় বিষয় না। এটাকে দলীয়করণ কেউ করলে করবে, কিন্তু ঘটনা তো নিজের মতো করে সে হচ্ছে, মানে সার্বজনীন হয়ে আছে।’- যোগ করেন তিনি। 

সামনের দিনে সাংবাদিকতার চ্যালেঞ্জ তুলে ধরে ফারুক ওয়াসিফ আরও বলেন, সাংবাদিকতার যে জায়গা, সে জায়গাটা কিন্তু সামনের দিনে যে খুব সহজ হবে এটা আমরা বলতে পারি না। সামনের দিনে সাংবাদিকতায় সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ সোশ্যাল মিডিয়া, ইউটিউবার, টিকটকার, ভিডিও ব্লগার। এরা ভিউ কামানোর জন্য যেকোনো কিছু করছে এবং করবে। এরা সাংবাদিকতা পেশার পাশাপাশি পাঠককে কেড়ে নিচ্ছে। আপনার দর্শককে কেড়ে নিচ্ছে। তো আমাদেরও যদি অ্যাপ্রোচ না বদল হয়, আমরা যদি এরকম আকর্ষণীয় এবং আরও উচ্চতর প্রযুক্তি বা এআই ব্যবহার করে সেটা না করতে পারি, আমরা হেরে যাব। নির্বাচনের সময়ে ওই দিক থেকে একটা বড় হুমকি থাকবে। কোন একটা প্রার্থীর নকল কন্ঠ দিয়ে যদি এমন একটা ভিডিও প্রচার করে দেওয়া হয় যে, উনি নির্বাচন বর্জন করলেন। তাহলে তার দলের লোকেরা ভোটে যাবে না, বরং উল্টা তারা গিয়া হচ্ছে ভোটকেন্দ্রে হামলা করবে। তখন পাল্টা পক্ষও যদি এটা করবে, একটা কি মানে ভয়াবহ ব্যাপার! এরকম যদি পনেরো, বিশ, ত্রিশটা জায়গায় করা সম্ভব হয়, তাহলে তো ইলেকশনকে অনেকটা ভণ্ডুল করে দেয়া যায়। তো এগুলো আমরা মানে, এই ব্যাপারগুলো ফলে আমাদের সোশ্যাল মিডিয়া ব্যবহারের ক্ষেত্রে শেয়ার দেওয়ার ক্ষেত্রেও আমাদের একটা সতর্কতা করা দরকার। যাচাই করা দরকার। আমাদের যে ফ্যাক্ট চেকিং ভিডিও একটা বোধহয় দেওয়ার কথা আপনাদের গ্রুপে, সেটা একটু দেখবেন। আমাদের যে বাংলা ফ্যাক্ট আছে, বাংলা ফ্যাক্টের পেইজে ফলো দিয়ে রাখবেন, বিআইবি যে ফ্যাক্ট চেকিং টিম এবং ওখানে অনেকগুলো ম্যানুয়াল দেওয়া আছে, অনেকগুলো জিনিস দেওয়া আছে, টুল দেওয়া আছে যেগুলো আপনারা চাইলে ওখান থেকে নিজেরা লাভ করতে পারেন।

এসময় বিগত সময়ের সুবিধাবাদি মধ্যবিত্ত্বদের ভুলের কারণে বাংলাদেশে ফ্যাসিবাদ জেঁকে বসেছিলো বলেও মন্তব্য করেন তিনি। একইসঙ্গে নির্বাচনকালীন রিপোর্টিংয়ে যেন রাজনীতি ও অর্থনৈতিক বিষয়কে সাম্প্রদায়িকতার সঙ্গে গুলিয়ে না ফেলার তাগিদ দেন এই সাংবাদিক। 

ঢাকা রিপোর্টার্স ইউনিটির প্রযুক্তি ও প্রশিক্ষণ সম্পাদক মাহমুদ সোহেল,  অর্থ সম্পাদক নিয়াজ মাহমুদ সোহেল, দপ্তর সম্পাদক মো. রাশিম, সাংবাদিক কল্যাণ ট্রাস্টের পরিচালক শাহীন হাসনাত প্রমুখ সমাপনীতে উপস্থিত ছিলেন। এদিন প্রশিক্ষক হিসেবে উপস্থিত ছিলেন দৈনিক আমার দেশ এর ডেপুটি এডিটর সুলতান মাহমুদ এবং পিআইবি’র সিনিয়র প্রশিক্ষক গোলাম মুর্শেদ।