কলেজ গেটে ম্যাসঞ্জারের স্ক্রিনশট টানিয়ে মানববন্ধন

কলেজ গেটে ম্যাসঞ্জারের স্ক্রিনশট টানিয়ে মানববন্ধন
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ১৬:৪৯  
১৪ সেপ্টেম্বর, ২০২৫ ২০:১২  

নওগাঁ সরকারি কলেজ গেটে ১৪ সেপ্টেম্বর দুপুরে ফেসবুক মেসেঞ্জারের আপত্তিকর বার্তার স্ক্রিনশট টানিয়ে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। কলেজের অনিয়ম, দুর্নীতি, নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অধ্যক্ষের আপত্তিকর কথোপকথন এবং কলেজ প্রশাসনের হুমকীর প্রতিবাদে এ মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। বেলা সাড়ে ১১টা থেকে কলেজ চত্বরে কলেজের শিক্ষার্থী এবং জুলাই যোদ্ধা সংসদ, আহত ও শহীদ পরিবারের ব্যানারে ঘণ্টাব্যাপী এ কর্মসূচি পালিত হয়। মানব বন্ধন থেকে অভিযোগের যাচাই সাপেক্ষে অভিযুক্তের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নেওয়ার দাবি জানানো হয়।

জানা যায়, কলেজের ছাত্রীদের ফেসবুক মেসেঞ্জারে আপত্তিকর বার্তা পাঠানো এবং অবৈধ সম্পর্কে জড়াতে চাপ প্রয়োগের অভিযোগ উঠেছে অধ্যক্ষ প্রফেসর সামসুল হকের বিরুদ্ধে। সম্প্রতি এ-সংক্রান্ত বিভিন্ন স্ক্রিনশট সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।সেখানে ছাত্রীদের ওড়না ছাড়াসহ বিভিন্ন সাজে দেখার আবদার করতে দেখা যায় তাকে। এতে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে অশোভন আচরণের অভিযোগে ক্ষোভে ফেটে পড়ে সাধারণ শিক্ষার্থীরা।

মানববন্ধনে বক্তব্য দেন, নওগাঁ জেলা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি মিজানুর রহমান, বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলনের প্রতিনিধি আরমান হোসেন, শিক্ষার্থী সাদনান সাকিব, শহীদ ফাহমিনের মা কাজী লুলুন মাখমিম (শিল্পী), কলেজ শাখা ছাত্রদলের আহ্বায়ক জুনায়েদ হোসেন জুন, শিক্ষার্থীর অভিভাবক গোলাম রসুলসহ অন্যরা। মানববন্ধনে কলেজের সাধারণ শিক্ষার্থীরাও উপস্থিত ছিলেন। 

বক্তারা বলেন, নওগাঁ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সামসুল হক ফেসবুক মেসেঞ্জারে নারী শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আপত্তিকর কথোপকথন করেছেন এবং ওড়না ছাড়া ছবি দেওয়ার জন্য বলেছেন। এসব বিষয় প্রকাশ করলে কৌশলে হুমকিও দেওয়া হয়েছে। সম্প্রতি এসব কথোপকথন সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে। কোনো শিক্ষার্থী প্রতিবাদ করলে কলেজ প্রশাসন দিয়ে তাদের মারধর করা হয়। পাশাপাশি কলেজে ভর্তিসহ বিভিন্ন অজুহাতে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি নেওয়া হয়। বক্তারা শিক্ষার পরিবেশ ফিরিয়ে আনা এবং অধ্যক্ষের শাস্তির দাবি জানান।

ছাত্র প্রতিনিধি আরমান হোসেন বলেন, একজন অধ্যক্ষ হয়ে তিনি কীভাবে ছাত্রীদের সঙ্গে কুরুচিপূর্ণ মন্তব্য করতে পারেন? কীভাবে ছাত্রীর কাছ থেকে ওড়না ছাড়া ছবি চাইতে পারেন? এমন অধ্যক্ষের কাছে ছাত্রীরা কীভাবে নিরাপদ থাকবে? কলেজে আবাসিক হল ও ক্যান্টিন নেই। বারবার বলার পরও তিনি কোনো উদ্যোগ নেননি। শিক্ষার্থীরা নিয়মিত ক্লাসে আসে না, সে বিষয়েও তিনি ভেবেছেন বলে মনে হয় না। শুধু অর্থ আত্মসাৎ করার পথ খোঁজেন।

জেলা সমাজতান্ত্রিক ছাত্রফ্রন্টের সভাপতি মিজানুর রহমান বলেন, কলেজের উন্নয়নের নামে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অতিরিক্ত ফি আদায় করা হয়। অথচ দৃশ্যমান কোনো উন্নয়ন নেই। অধ্যক্ষ কলেজে ‘মাস্তান বাহিনী’ পুষে রেখেছেন। প্রায়ই শিক্ষার্থীদের ওপর হামলা-মারধরের ঘটনা ঘটে। দিনের পর দিন শিক্ষার্থীরা ভয়ে প্রতিবাদ করতে পারে না।

এ ব্যাপারে মন্তব্য জানতে নওগাঁ সরকারি কলেজের অধ্যক্ষ প্রফেসর সামসুল হকের মোবাইলফোনে কল করা হলেও তিনি রিসিভ করেননি।

ভাইরাল হওয়া এসব স্ক্রিনশটের একটিতে দেখা যায়, গত ১৮ ফেব্রুয়ারি রাত সাড়ে ১০টায় এক ছাত্রীর প্রতি আক্ষেপ প্রকাশ করে অধ্যক্ষ সামসুল হক বলেন, ‘নতুন বউ সাজে দেখা করলে না।’ উত্তরে ছাত্রী বলেন, ‘স্যার ভীষণ ব্যস্ত ছিলাম। স্টল থেকে বের হওয়ার সময় পাইনি। আজকে আমাদের স্টলে সবচাইতে বেশি সেল হইছে।’ এরপর সামসুল হক লেখেন, ‘আমি তোমার বিউটি (সৌন্দর্য) থেকে বঞ্চিত হলাম।’ উত্তরে ওই ছাত্রী বলেন, ‘কেনো স্যার দেখা হইছিল তো আপনার সাথে। তবে আপনাকে অনেক অনেক থ্যাংক ইউ স্যার। এতো সুন্দর একটা আয়োজন করার জন্য। আমরা অনেক এনজয় করেছি।’ উত্তরে অধ্যক্ষ লেখেন, ‘আমাকে দেখা দিলে আমিও করতাম।’ এবার জবাবে শিক্ষার্থী লেখেন, ‘স্যরি স্যার। আজকে খুবই ব্যস্ত সময় কেটেছে।’ এবার সামসুল হক প্রশ্ন করেন, ‘কবে দেখা দিবে ওই একই সাজে?’ উত্তরে ছাত্রী বলেন, ‘নেক্সট প্রোগ্রামে স্যার।’ একপর্যায়ে আবদার জানিয়ে ছাত্রীকে সামসুল হক বলেন, ‘হবে না। যেদিন বলবো, সেদিনই দেখাতে হবে।’

ফেসবুকে ছড়িয়ে পড়া আরেক স্ক্রিনশটে দেখা যায়, অধ্যক্ষ সামসুল হক তার ছাত্রীর সৌন্দর্যের প্রশংসা করছেন। প্রশংসার একপর্যায়ে ছাত্রীকে সামসুল হক লেখেন, ‘আরও সুন্দরী ছবি আছে তোমার?’ উত্তরে ওই শিক্ষার্থী বলেন, ‘আর নেই স্যার। আমি সুন্দর না। আমার যা মনে হয়।’ সামসুল হক লেখেন, ‘আছে আছে। ওড়না ছাড়া।’ উত্তরে শিক্ষার্থী বলেন, ‘নেই স্যার। স্যরি স্যার।’ তাৎক্ষণিক সামসুল হক বলেন, ‘কলেজে দেখেছি তো।’ উত্তরে শিক্ষার্থী বলেন, ‘না স্যার। স্যরি। নেই স্যার। মাফ করবেন।’ এরপর সামসুল হক বলেন, ‘ওকে। সামনেই দেখবো। অনেক অনেক অনেক ভালো থেকো। বাই।’

আরেক স্ক্রিনশটে দেখা যায়, দ্বাদশ শ্রেণীর এক ছাত্রীর ফেসবুকের স্টোরিতে শেয়ার করা ছবিতে অতীব চমৎকার লিখে প্রশংসা করেছেন অধ্যক্ষ সামসুল হক। গত ৩১ মার্চে মেসেঞ্জারের নোটে ওই শিক্ষার্থী একটি হিন্দি গান সেট করে লেখেন ‘কিছু মানুষের সাথে দূরত্ব হওয়া ভীষণ দরকার’। ওই নোটের রিপ্লাই দেন সামসুল হক। তিনি ওই শিক্ষার্থীকে প্রশ্ন করে লেখেন, ‘আমি কি তার মধ্যে?’