ইরানের শীর্ষ কর্তাদের নেটয়ার্কযুক্ত ডিভাইস ব্যবহারে কড়াকড়ি

ইরানের শীর্ষ কর্তাদের নেটয়ার্কযুক্ত ডিভাইস ব্যবহারে কড়াকড়ি
২২ জুন, ২০২৫ ০৭:৫৯  
২২ জুন, ২০২৫ ১০:৫৯  

 ইরানের নিরাপত্তা দলকে মোবাইল ফোন, স্মার্ট ওয়াচ বা ল্যাপটপের মতো নেটওয়ার্ক-এর সঙ্গে যুক্ত ডিভাইস ব্যবহার না করার বিষয়ে সতর্ক করেছে ইসলামিক রেভল্যুশনারি গার্ড। ইসরাইলি হামলার পঞ্চম দিনে এক বার্তায় এ বিষয়ে কড়া বার্তা দেয়া হয়েছে।  

শুধু সামরিক ব্যক্তিই নয়; সাধারণ মানুষকেও এসব ডিভাইসগুলোর ব্যবহার কমিয়ে ফেলার কথা বলা হয়েছে। জনসাধারণকে এই বার্তা পাঠানো কিন্তু শুধু সতর্কতামূলক পদক্ষেপ নেওয়াকেই নয়, এই বিষয়েও ইঙ্গিত করে যে ইরানের অভ্যন্তরে সাইবার নিরাপত্তা লঙ্ঘনের আশঙ্কা দ্রুত এবং গভীরভাবে বৃদ্ধি পাচ্ছে। 

দেশের অভ্যন্তরে ইসরাইলি অনুচরদের আটক করার পর সম্ভাব্য সাইবার যুদ্ধ মোকাবেলায় সতর্কতার অংশ হিসেবে এই পদক্ষেপ জোরদার করা হচ্ছে বলে ফার্স নিউজের বরাত দিয়ে খবর দিয়েছে আন্তর্জাতিক সংবাদ মাধ্যমগুলো। বিষয়টি প্রতিধ্বনীত হয়েছে ইরানের পার্লামেন্ট সদস্য হামিদ রাইসি’র সোশ্যাল হ্যান্ডেল এক্স-এর পোস্টেও। 

ইরানের ইংরেজি নিউজ চ্যানেল ‘প্রেস টিভি’ গত সোমবার তাদের টেলিগ্রাম চ্যানেলে লিখেছে, ইরানের গোয়েন্দা সংস্থাগুলো এমন ধরনের স্পাইক মিসাইল লঞ্চার উদ্ধার করেছে, যেগুলো ইরানের বিমান প্রতিরক্ষা ব্যবস্থাকে লক্ষ্যবস্তু হিসাবে নিশানা করার জন্য বিশেষভাবে তৈরি করা হয়েছিল। এই সিস্টেমগুলো ইন্টারনেট-অটোমেশন এবং রিমোট কন্ট্রোল দ্বারা সজ্জিত ছিল।

ওই নিউজ চ্যানেলের মতে, এই সিস্টেমগুলো পরিচালনা করছিলেন মোসাদের এজেন্টরা। স্পাইক মিসাইল লঞ্চারের ছবিতে দেখা গেছে সেগুলো কোনো যান বা ড্রোনে মোতায়েন করা হয়নি। কভার ব্যবহার করে মাটিতে দাঁড় করানো একটা ট্রাইপডে মোতায়েন করা হয়েছিল।

এই লঞ্চারগুলো ইলেক্ট্রো-অপটিক্যাল গাইডেন্স সিস্টেম, অত্যাধুনিক ক্যামেরা এবং স্যাটেলাইট যোগাযোগ অ্যান্টেনা দিয়ে সজ্জিত। তাই দূর থেকেই কমান্ড (নির্দেশ) নিতে পারে এই ডিভাইস। 

সামরিক বিষয়ক পর্যবেক্ষক সংস্থা ‘দ্য ওয়ার জোন’ এবং অন্যান্য সূত্রের প্রতিবেদনে দাবি করা হয়েছে, ইরাকের মধ্য দিয়ে যাওয়া ট্রাক, বাণিজ্যিক কন্টেইনার এবং যাত্রী স্যুটকেসের মধ্যে বিভিন্ন অংশে লুকিয়ে রেখে ইরানে অল্প অল্প করে সংবেদনশীল ড্রোন এবং ক্ষেপণাস্ত্র সরঞ্জামের চোরাচালান করেছে ইসরায়েল।

এই ডিভাইসগুলোর মধ্যে বৈদ্যুতিন ফিউজ, উন্নত ইলেক্ট্রো- অপটিক্যাল ক্যামেরা, লিথিয়াম ব্যাটারি, হালকা ওজনের ইঞ্জিন, জিপিএস-ভিত্তিক গাইডেন্স সিস্টেম এবং সুরক্ষিত যোগাযোগ ডিভাইস অন্তর্ভুক্ত ছিল বলে মনে করা হচ্ছে।

প্রকাশিত প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এসব যন্ত্রাংশ পরে ইরানের বিভিন্ন এলাকায় গড়ে ওঠা মোসাদ গোপন ঘাঁটিতে নিয়ে গিয়ে একত্রিত করে তাকে আক্রমণাত্মক অস্ত্রের আকার দেওয়া হয়েছে।

গত কয়েক বছর ধরে ইরানের বিভিন্ন অঞ্চলে গোপন ডেরা তৈরি করেছিল মোসাদের সদস্যরা। ইরানের বার্তা সংস্থাগুলো আরও জানিয়েছে যে তেহরানের কাছে এমনই একটি বহুতল ভবনের সন্ধান পাওয়া গেছে। কর্মকর্তারা জানিয়েছেন, ওই ভবন ছিল আত্মঘাতী ড্রোন তৈরি ও সংরক্ষণের জন্য তৈরি করা ঘাঁটি।

ইরানের রাষ্ট্রীয় টেলিভিশনের খবরে বলা হয়েছে, ওই ভবনের একটা ঘরের টেবিল এবং তাকের ওপরে অন্তত একটা ড্রোন, ড্রোন প্রপেলার, বিভিন্ন যন্ত্রাংশ এবং সেটাকে কন্ট্রোল করার সরঞ্জাম রাখা ছিল।

সেখানে একটা থ্রিডি প্রিন্টারও পাওয়া গেছে। এ ধরনের থ্রিডি প্রিন্টার ইউক্রেনে ড্রোনের যন্ত্রাংশ তৈরিতে ব্যবহার করা হয়েছে বলে জানিয়েছে ওয়ার জোন ওয়েবসাইট।

ইরানের পুলিশের এক মুখপাত্র গত ১৬ জুন জানান, তেহরানের একটি এলাকায় দুটি পৃথক অভিযানে মোসাদের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট দুজন এজেন্টকে গ্রেফতার করা হয়েছে। তাদের কাছ থেকে ২০০ কেজির বেশি বিস্ফোরক, ২৩টি ড্রোনের যন্ত্রাংশ, লঞ্চার, কন্ট্রোল সিস্টেম এবং একটা নিশান গাড়ি উদ্ধার করা হয়েছে বলে পুলিশের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে।

ইরানের সবচেয়ে স্পর্শকাতর পরমাণু স্থাপনা থাকা ইস্পাহানে এক কর্মশালায় পুলিশের ডেপুটি কমান্ডার অভিযান চালান। সেখানে বিপুল সংখ্যক ড্রোন এবং মাইক্রো-ড্রোন তৈরির সরঞ্জাম এবং যন্ত্রাংশ সংরক্ষণ করা হয়েছিল বলে অভিযোগ। এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে চারজনকে এরই মধ্যে আটক করা হয়েছে।

এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ড্রোনগুলো থ্রিডি প্রিন্টার এবং স্থানীয় হার্ডওয়্যারের মাধ্যমে অ্যাসেম্বল করা হচ্ছিল যাতে বেশি পরিমাণে খুচরা যন্ত্রাংশ চোরা-গোপ্তাভাবে আনতে না হয় এবং সুরক্ষা এজেন্সিগুলোর জন্য সরবরাহের এই শৃঙ্খলকে শনাক্ত করা কঠিন হয়ে পড়ে। তবে এসব বিষয় যাচাই করা সম্ভব হয়নি।