নিহত পরমাণু বিজ্ঞানীর সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ালো ৬-এ
ইসরায়েলি হামলায় অক্ষত ইরানের পরমাণু স্থাপনা
ইসরায়েলের হামলায় ইরানের ছয় পরমাণু বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। ইরানের বার্তাসংস্থা তাসনিমের বরাতে এক প্রতিবেদনে এ তথ্য জানিয়েছে কাতারভিত্তিক সংবাদমাধ্যম আল জাজিরা।
নিহত ছয় বিজ্ঞানী হলেন- আব্দুল্লাহ মিনৌচেহর, আহমাদ রেজা জলফাঘারি, সায়েদ আমির হোসেন ফাকহি, মোতলাবিজাদেহ, ফেরেদুন আব্বাসি এবং মোহাম্মদ মেহদি তেহরানচি।
নিহত আরেক বিজ্ঞানী মোহাম্মদ মেহেদি তেহরানচি তেহরানের ইসলামিক আজাদ বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রেসিডেন্ট ছিলেন। নিহত বাকি বিজ্ঞানীদের ব্যাপারে এখনো বিস্তারিত জানা যায়নি।
তবে জায়নবি বিমান হামলায় ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র নাতাঞ্জ অক্ষত রয়েছে। বিমান হামলায় আঘাত হানার পরও সেখানে তেজস্ক্রিয়তা বা বিকিরণ মাত্রা বৃদ্ধি পায়নি বলে জানিয়েছে আন্তর্জাতিক পরমাণু শক্তি সংস্থা (আইএইএ)।
আইএইএ এক বিবৃতিতে জানায়, তারা ইরানি কর্তৃপক্ষের কাছ থেকে পাওয়া তথ্য বিশ্লেষণ করে দেখেছে, নাতাঞ্জ পারমাণবিক স্থাপনায় বিকিরণের মাত্রা স্বাভাবিক রয়েছে।
সংস্থাটি আরও জানায়, ইরানের দক্ষিণাঞ্চলে অবস্থিত বুশেহর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র এই হামলার লক্ষ্যবস্তু ছিল না এবং সেখানেও কোনো ধরনের ক্ষয়ক্ষতির খবর পাওয়া যায়নি।
এর আগে, ১৩ জুন ভোররাতে ইসরায়েল ‘অপারেশন রাইজিং লায়ন’-এর আওতায় ইরানের নাতাঞ্জসহ শতাধিক স্থানে বিমান হামলা চালায়। অভিযানে ইরানের শীর্ষ সামরিক কমান্ডার, পারমাণবিক বিজ্ঞানীসহ বেশ কয়েকজন নিহত হন। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ‘অপারেশন রাইসিং লায়ন’ নামে ইরানে হামলা করে ইসরায়েল। অজ্ঞাত এক সামরিক কমকর্তা টাইমস অব ইসরায়েলকে জানিয়েছেন, ইরানে শত শত হামলা চালানো হয়েছে এবং অন্তত আটটি স্থানে (শহরে) লক্ষ্যবস্তুতে আঘাত হানা হয়েছে। ইসরায়েলের দাবি, ইরানের পারমাণবিক কর্মসূচিকে ব্যর্থ করে দিতে এই হামলা করা হয়।
তবে এই হামলা সামরিকের পাশাপাশি বেসামরিক স্থাপনাতেও হয়েছে বলে খবর পাওয়া গেছে। প্রত্যক্ষদর্শীদের বরাতে বিশ্বগণমাধ্যমগুলো জানিয়েছে, কয়েক ঘণ্টায় অন্তত দুটি ধাপে হামলা চালানো হয়। তবে নিশ্চিত না হলেও এখন তৃতীয় দফার হামলা চলমান থাকতে পারে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
ইরানের সংবাদমাধ্যমগুলো বলছে, তেহরানজুড়ে ৬ থেকে ৯টি বিস্ফোরণের শব্দ শোনা গেছে। হামলা হয়েছে আবাসিক ভবনেও যেসব স্থানে হামলার বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া গেছে- রাজধানী তেহরান ও এর আশপাশের সামরিক স্থাপনা; তেহরানের দক্ষিণে নাতানজ শহর, যেখানে ইরানের প্রধান ইউরেনিয়াম সমৃদ্ধকরণ কেন্দ্র অবস্থিত; তেহরানের উত্তর-পশ্চিমে তাবরিজ শহর, যেখানে একটি পারমাণবিক গবেষণা কেন্দ্র ও দুটি সামরিক ঘাঁটির কাছে বিস্ফোরণের খবর পাওয়া গেছে; তেহরানের দক্ষিণে ইস্পাহান শহর; তেহরানের দক্ষিণ-পশ্চিমে আরাক শহর ও পশ্চিমে কেরমানশাহ শহর।
ইরানে ইসরায়েলি হামলার তীব্র নিন্দা জানিয়েছেন তুরস্কের প্রেসিডেন্ট রিসেপ তায়্যেপ এরদোয়ান। সেই সঙ্গে এই হামলাকে তিনি ‘স্পষ্ট উসকানি’ বলে অভিহিত করেছেন। তার দাবি, ইসরায়েলি প্রধানমন্ত্রী বেঞ্জামিন নেতানিয়াহুর সরকার এই অঞ্চলকে বিপর্যয়ের দিকে টেনে নেওয়ার চেষ্টা করছে।
এরদোয়ান আরও বলেন, নেতানিয়াহু ও তার ‘গণহত্যা নেটওয়ার্কের’ আক্রমণ পুরো বিশ্বকে অস্থির করে রাখছে। তাদের এই আচরণ প্রতিরোধ করতে হবে।
হামলার জন্য ইসরায়েলকে নিন্দা জানিয়েছে সৌদি আরব। দেশটির পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয় এক বিবৃতিতে বলেছে, 'সৌদি আরব ভ্রাতৃপ্রতিম ইসলামি প্রজাতন্ত্র ইরানের বিরুদ্ধে ইসরাইলি হামলার তীব্র নিন্দা জানাচ্ছে। এই হামলা ইরানের সার্বভৌমত্ব ও নিরাপত্তাকে ক্ষুণ্ন করছে এবং আন্তর্জাতিক আইন ও রীতিনীতির সুস্পষ্ট লঙ্ঘন।'
হামলার পর ইরানের সর্বোচ্চ ধর্মীয় নেতা আয়াতুল্লাহ আলি খামেনি 'ভয়াবহ পরিণামের' হুশিয়ারি দিয়েছেন। জাতির উদ্দেশ্যে দেওয়া বক্তব্যে খামেনি বলেন, 'এই অপরাধের মাধ্যমে (ইসরায়েলের) জায়নবাদি শাসকরা নিজেদের জন্য একটি তিক্ত ও বেদনাদায়ক নিয়তি নিশ্চিত করেছে এবং নিশ্চিতভাবেই তাদেরকে ওই পরিণাম দেওয়া হবে।'
তেহরান ও অন্যান্য শহরে ইসরায়েলি হামলার কয়েক ঘণ্টা পর খামেনি তার বক্তব্যে বলেন, 'জায়নবাদি শাসকদের জন্য ভয়াবহ শাস্তি অপেক্ষা করছে।'
বক্তব্যের শুরুতে খামেনি বলেন, 'মহান ইরান জাতির উদ্দেশ্যে বলছি! জায়নবাদিরা তাদের অশুভ ও রক্তাক্ত হাত দিয়ে আমাদের প্রিয় দেশের বিরুদ্ধে অপরাধ করেছে এবং আবাসিক এলাকায় আঘাত করে তাদের দুর্বিনীত চরিত্র উন্মোচিত হয়েছে।' খামেনি জানান, 'এই হামলায় বেশ কয়েকজন কমান্ডার ও বিজ্ঞানী নিহত হয়েছেন। তবে তাদের উত্তরসূরিরা অবিলম্বে তাদের রেখে যাওয়া অসমাপ্ত কাজগুলোকে সামনে এগিয়ে নিতে দায়িত্বভার গ্রহণ করবেন।'







