প্রবীণের ভাবনা: একটুখানি উষ্ণতা

নতুন করে যখন আর কেউ কাছে আসে না, এবং কাছের মানুষরা যখন ক্রমেই আরও দূরে চলে যায়, তখনই বুঝে নিতে হয় যে, বুড়ো-বয়সের দিনগুলি এবারে শুরু হয়েছে। সবাই কিছু-না-কিছু উত্তাপ চায়। অথচ বার্ধক্যের কোনো উত্তাপ নেই। বুড়োরাও তাই বুড়োদের বিশেষ পছন্দ করে না আগুনের খোঁজে পরস্পরকে ছেড়ে তারাও ক্রমেই আরও দূরে চলে যেতে থাকে। পার্কেও […] The post প্রবীণের ভাবনা: একটুখানি উষ্ণতা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

প্রবীণের ভাবনা: একটুখানি উষ্ণতা
২৬ অক্টোবর, ২০২৬ ১৭:০০  

নতুন করে যখন আর কেউ
কাছে আসে না,
এবং কাছের মানুষরা যখন ক্রমেই আরও
দূরে চলে যায়,
তখনই বুঝে নিতে হয় যে,
বুড়ো-বয়সের দিনগুলি এবারে
শুরু হয়েছে।

সবাই কিছু-না-কিছু উত্তাপ চায়। অথচ
বার্ধক্যের কোনো উত্তাপ নেই।
বুড়োরাও তাই বুড়োদের বিশেষ পছন্দ করে না
আগুনের খোঁজে
পরস্পরকে ছেড়ে তারাও
ক্রমেই আরও
দূরে চলে যেতে থাকে।

পার্কেও বেঞ্চির দুই মাথায় বসে আছে
দুটি বৃদ্ধ।
মাঝখানে অনেকখানি ব্যবধান।
দেখলেই বোঝা যায় যে,
দুজনেই দুজনের বয়সের শীতকে ভীষণ ভয় পায়।
কিছুতেই ওরা
পরস্পরের কাছে গিয়ে বসবে না।

বসে বসে ভাবছিলাম বয়স তো হলো ঢের। সময় ক্ষেপণের উছিলা ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে। কত আর বই পড়ে কাটানো যায়। নেট ঘাটি। ফেসবুকে ভর করি। কবিতা পড়ি। সময় যেন যেতেই চায় না। হঠাৎই নীরেন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয়ের দূরত্ব কবিতাটা চোখের সামনে আটকে গেল। অনিচ্ছা সত্ত্বেও পড়া শুরু করলাম আর পড়তেই থাকলাম। শুধু পড়া না, দেখতেও থাকলাম নিজেকে আয়নায়। এতো সেই আমিই।

প্রবীণতা একসময় উপভোগ্য ছিলো। পরিবারের বিগ বস হয়ে, নীতি-নির্দেশনা দিয়ে, অভিজ্ঞতা শেয়ার করে, নাতিনাতকরদের সাথে হামাগুড়ি দিয়ে, নিজেকে ছোট বানিয়ে তাদেরকে বড় ভাবিয়ে বেশুমার মজা নেওয়ার সেকি আনন্দই না ছিলো। বিকেলে তাদেরকে আংগুলে ধরে নিয়ে প্রান্তরে, বাগানে, উঠোনে, বড় রাস্তার কাছাকাছি কত কি-না দেখার ছিলো, দেখাবার, শেখাবার ছিল! পাখীদের সাথে কথা বলা, কথা শোনা, তাদের ওড়াওড়ি দেখার আনন্দ যেন নিসর্গকে আরো উপভোগ্য করে তুলতো।

এখন সে দৃশ্য বিরল হয়ে গেছে। ইট-সুড়কি আর গ্রীল মারিয়ে এসব আর এখন দেখা হয় না। ছেলেমেয়েরা ব্যস্ত বা বিদেশে। নাতিনাতকররা স্কুলে বা পড়ার টেবিলে গাদা গাদা বই মুখস্ত করছে। তারাও সময়ের সাথে কুলোতে পারে না । অথবা তারাও বিদেশে উচ্চশিক্ষার্থে। সাকূল্যে পড়ে থাকি বুড়ো- বুড়ি ঘরময় সুরক্ষিত হয়ে। গিন্নীদের ঘরকন্যা করে তবু সময় কেটে যায়। কিন্তু যত সমস্যা ওই বুড়োদের নিয়ে। সময় কাটে না। কোন কাজ নেই। কাহাতক বই আর ফেসবুক ঘাটাঘাটি করা যায়! চোখ ব্যাথা করে, চশমার পাওয়ার ঘনঘন বদলাতে হয়। সময় এসব কিচ্ছু বুঝে না। মাঝে মাঝে মশকরা করে, থমকে দাঁড়ায়।

বিশ্বের সকল প্রবীণের সমস্যা ও সম্ভাবনা এক না। আমাদের দেশে প্রবীণের এককালে প্রাপ্ত সম্মানে ভাটা পড়ছে। অর্থনৈতিক টানাপোড়েন ও সামাজিক জীবনযাত্রায় পরিবর্তন এর অন্যতম কারণ। সবাই দৌড়াচ্ছে। প্রবীনের শ্লথ গতি এতে বাধা। একান্নবর্তী পরিবার ভেঙ্গে গেছে অনেক আগেই। এর যৌক্তিক কারণও রয়েছে। ছোট পরিবার সুখী পরিবারের শ্লোগানে ঘাড় পেতে দিয়ে সবাই যেন হাল্কা বোধ করছে। স্বামী-স্ত্রী যে যার কর্মক্ষেত্রে, শিশুরা স্কুলে-কোচিংয়ে। প্রবীনরা নিরাপদ ফ্ল্যাটে, কারারুদ্ধ।

প্রবীণদের মধ্যে যখন প্রবীণতা ভর করে তখন অনেক শারিরীক, মানসিক পরিবর্তন অনুভূত হয়। অনেকটা বয়স্ক মহিলাদের মেনোপজ কালীন দশার মত। শারিরীক সক্ষমতা কমবে এটা স্বাভাবিক। তবে সুস্বাস্থ্য বজায় রাখার প্রাকৃতিক বিষয়গুলোও আজ আর হাতের কাছে পাওয়া যায় না এটাই পরিতাপের বিষয়। পার্ক নেই, মাঠ নেই, ক্লাব ঘর নেই। থাকলেও অস্বাস্থ্যকর ও বিপদসংকুল। এসময় মানসিক বিপর্যয় বেশি করে লক্ষণীয় হয়ে ওঠে। পরিবারে তার ওজন কমতে শুরু করে, গলার স্বর ক্রমশ নিম্নমুখী হতে শুরু করে। মান্যতা ব্যাপারটা কখনো কখনো বেদনাহত করে। তার উপর অর্থের যোগান স্বাচ্ছন্দ্যময় না হলে উপেক্ষার মাত্রা যন্ত্রণাবিদ্ধ করে। একসময় অসহিষ্ণুতা ভর করে। সঙ্গপ্রিয়তা বাড়তে থাকে, না পেলে বিমর্ষতা দানা বাধে। বেশি কথা বলার প্রবণতা বাড়ে, সব কিছুতেই তত্ত্বতালাশ করতে ইচ্ছে করে। উত্তর না পেলে রাগ হয়, উপেক্ষা পেলে মস্তিষ্কে ধাক্কা মারে। নিজের হাত-পা যখন চাহিদামত সাড়া না দেয় তখন খেদ বাড়ে। মনে হয় পরপারের সময় বুঝি নিকটবর্তী। তখন মনের টাইম মেশিনে শৈশব, কৈশোর, যৌবনকে স্পষ্ট দেখা যায়। কি করা উচিত ছিল আর কি কি করা অনুচিত হয়েছে তা সেলুলয়েডের ফিতার মত চোখের মনিটরে স্বচ্ছভাবে ভেসে উঠে। ভেতরটা মুচড়ে উঠে। ক্ষতি পুষিয়ে নেওয়ার উপায় নেই। ফিরিবার পথ নেই। তবে তওবার দরোজা বরাবর খোলা। তাই, ধর্মকর্মই হয়ে ওঠে পারাপারের একমাত্র ফরেন রিজার্ভ। আর নিকটজনের,প্রিয়জনের, স্বজনের ও চেনা সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি একটু বাঁকা হলে মনে হয় এ জীবনে আর কত কি দেখার বাকি আছে? এর চেয়ে সাঙ্গ হোক এ জীবনের সব লেনাদেনা। রাষ্ট্রের কাছে প্রত্যাশা অনেক, তবে অপ্রাপ্তিতেও খেদ নেই।

সরকার প্রবীনদের নিয়ে ভাবে। ভাবে বলেই বয়স্কভাতা চালু আছে। সময় সময় এর পরিধিও বাড়ছে। সরকারি বৃদ্ধনিবাস আছে। সেখানে নিশ্চয়ই কেউ না কেউ থাকে। তবে তা চাহিদার তুলনায় খুবই কম আর সেবামানে নাকি অস্বস্তিকর। বেসরকারি খাতে বৃদ্ধাশ্রম অনেকটাই বিকশিত হয়েছে। তবে সামর্থ সেখানে প্রধান ‘নিয়ামক’। ট্রেনে- বাসে, মেট্রোতে প্রবীণের সিট নির্ধারিত আছে। মান্যগণ্যতা থাকলে সুবিধে পাওয়া যায়। তেমনি কোনো কোনো হাসপাতালে, এয়ারপোর্টে বা সেবাদাত্রী প্রতিষ্ঠানে ‘সিনিয়র সিটিজেন’ কাউন্টার থাকে। ভালো লাগে যখন সেখানে সেবা দিতে কেউ অপেক্ষায় থাকে।

প্রবীণের সবচেয়ে বড় বিপদ তার উত্তরাধিকার সূত্রে প্রাপ্ত ও নিজের অর্জিত সম্পদের বন্টন। উত্তরাধিকারের সিলসিলা ধরে সমাজে এটাই প্রতিষ্ঠিত হয়ে এসেছে যে, উত্তরাধিকারে কন্যাদের, বোনদের প্রাপ্যতা নেই, থাকলেও যাকে যতটা কম দিয়ে মুখ রক্ষা করা যায়। সবাই জানে এ ভারি অন্যায়, গর্হিত কাজ, ধর্মীয় বিধানের স্পষ্ট লংঘন। তবু এ প্রবণতা টিকে আছে আজো। ছেলেরা বাবাকে, মাকে ভরণপোষণের নামে কব্জা করে নেয় সম্পদ। না দিতে চাইলে জোরাজুরি বা ততোধিক কিছু করে। খুব সম্প্রতি একটি ভিডিও ভাইরাল হয়েছে। হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এক অবসরপ্রাপ্ত সরকারি কর্মকর্তার কাছ থেকে তার মেয়ে যেভাবেই হোক দলিলে স্বাক্ষর করিয়ে নিচ্ছে। তা আবার দেখে ফেলে ছেলের বউ। এ নিয়েই ক্যাচাল। এটা কোন একক বা বিশেষ ঘটনা না। এরকম হচ্ছে হরহামেশাই। জীবদ্দশায় ভুলিয়ে ভালিয়ে সম্পত্তি লিখে নিয়ে বাড়ি থেকে বের করে দেওয়ার ঘটনা নেট দুনিয়ায় ভুরি ভুরি। তবে সরকার অতি সম্প্রতি আইন করেছে যে, উত্তরাধিকার বন্টন হলেও জীবদ্দশায় সম্পত্তির ভোগ দখলের অধিকার প্রবীণের। এদেশে আইন আছে অনেক। কার্যকর করা নিয়ে কথা।

এখন আর প্রবীণ প্রবীণকে খুঁজে না। সে খুঁজে নবীন কাউকে, অবলম্বনের কোন এক খুঁটিকে। এক প্রবীণ আরেক প্রবীণকে সঙ্গ দেওয়া ছাড়া বিশেষ নির্ভরতা দিতে পারবেনা জেনে সে কেবলই স্নেহাস্পদ কাউকে পেতে চায়। বোধকরি তাই, নীরেন্দ্র চক্রবর্তী মহাশয় উপরের কবিতায় বলেছেন একই বেঞ্চে মাঝখান খালি রেখে নিরবে দু প্রান্তে বসে থাকে দু প্রবীণ। তারা শীতকে ভয় পায়। তাই নবীনের উষ্ণতাকে তালাশ করে বেড়ায়।

প্রবীণের প্রত্যাশা পরিবারের কাছে, সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে একটু সহানুভূতি, উষ্ণতা, মান্যতা, মূল্যায়ন, নির্ভরতা আর সেবা-শুশ্রূষা। সবার সুবোধ জাগ্রত হোক।

লেখক: কলামিস্ট ও সাবেক সচিব

The post প্রবীণের ভাবনা: একটুখানি উষ্ণতা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.