মারুবেনি ও তারো আসোর সঙ্গে বৈঠক
জাপানি বিনিয়োগ ও প্রযুক্তি সহযোগিতা বাড়াতে তাগিদ তারেক রহমানের
- আইসিটি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা ও নবায়নযোগ্য জ্বালানিতে বিনিয়োগ চেয়েছে বাংলাদেশ
- সার কারখানা আধুনিকায়ন ও নতুন কারখানা স্থাপনে জাপানের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী
- রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বাংলাদেশে বিনিয়োগে জাপানি কোম্পানিগুলোর আগ্রহের কথা জানিয়েছেন তারো আসো
বাংলাদেশে তথ্য ও যোগাযোগপ্রযুক্তি (আইসিটি), কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই), সাইবার নিরাপত্তা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদনশিল্পে জাপানি বিনিয়োগ বাড়াতে দেশটির ব্যবসায়ী ও রাজনৈতিক নেতাদের সহযোগিতা চেয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। একই সঙ্গে কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের (কাফকো) আধুনিকায়ন, দেশে দ্বিতীয় সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাই এবং প্রযুক্তি হস্তান্তরের ওপর গুরুত্ব দিয়েছেন তিনি।
২৬ অক্টোবর, সোমবার দেশটির সাবেক প্রধানমন্ত্রী ও জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের সভাপতি তারো আসো এবং বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা কমিটির (জেবিসিসিইসি) সভাপতি ও মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে পৃথক সৌজন্য সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী। বৈঠকগুলোতে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য, অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব, বিনিয়োগ, প্রযুক্তি সহযোগিতা এবং দুই দেশের জনগণের মধ্যে যোগাযোগ জোরদারের বিষয় উঠে আসে।
আইসিটি ও জ্বালানিতে বিনিয়োগ চাইলেন প্রধানমন্ত্রী
সোমবার জাপানের স্থানীয় সময় বিকেল ৩টা ৪৫ মিনিটে মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে প্রধানমন্ত্রীর সৌজন্য সাক্ষাৎ অনুষ্ঠিত হয়। বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে বাণিজ্য ও অর্থনৈতিক সহযোগিতা জোরদারে তাঁর নেতৃত্বের প্রশংসা করেন তারেক রহমান। মারুবেনি করপোরেশনের চেয়ারম্যান হিসেবে বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ ও দুই দেশের ব্যবসায়িক সম্পর্ক উন্নয়নে ভূমিকার জন্য তাঁকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী।
সাক্ষাৎকালে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব আরও সুদৃঢ় করার ওপর গুরুত্বারোপ করেন তারেক রহমান। মাসুমি কাকিনোকি বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি (ইপিএ) কার্যকরভাবে বাস্তবায়নের মাধ্যমে দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ, জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি এবং নতুন ব্যবসায়িক সুযোগ তৈরির প্রত্যাশা ব্যক্ত করেন।
প্রধানমন্ত্রী বাংলাদেশের আইসিটি, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ও উন্নত উৎপাদনশিল্পসহ সম্ভাবনাময় খাতে জাপানি বিনিয়োগ বাড়ানোর আহ্বান জানান। তিনি বলেন, প্রত্যক্ষ বিদেশি বিনিয়োগ (এফডিআই) এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্বের (পিপিপি) মাধ্যমে এসব খাতে বিনিয়োগের উল্লেখযোগ্য সুযোগ রয়েছে।
কর্ণফুলী ফার্টিলাইজার কোম্পানি লিমিটেডের আধুনিকায়ন এবং দেশে দ্বিতীয় একটি সার কারখানা স্থাপনের সম্ভাবনা যাচাইয়ে জাপানের সহযোগিতার ওপরও বিশেষ গুরুত্ব দেন প্রধানমন্ত্রী।
বাংলাদেশ সরকার বিনিয়োগবান্ধব পরিবেশ নিশ্চিত করতে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ জানিয়ে তারেক রহমান বলেন, নিয়ন্ত্রক সংস্থার সংস্কার, বিনিয়োগসংক্রান্ত অনুমোদন প্রক্রিয়া সহজ করা এবং সরকারি-বেসরকারি অংশীদারত্ব জোরদারের মাধ্যমে জাপানি ব্যবসায়ীদের বিনিয়োগ ও ব্যবসা পরিচালনার সুযোগ সম্প্রসারণে সরকার কাজ করছে।
রাজনৈতিক স্থিতিশীলতায় বিনিয়োগে আগ্রহী জাপানি কোম্পানি: তারো আসো
সোমবার স্থানীয় সময় বিকেল ৩টায় তারো আসোর নেতৃত্বাধীন একটি প্রতিনিধিদলের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। প্রধানমন্ত্রীর উপপ্রেস সচিব শাহাদাৎ স্বাধীন এ তথ্য জানান।
সাক্ষাৎকালে জাপান-বাংলাদেশ সংসদীয় মৈত্রী লীগের নেতৃত্ব দিয়ে দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক জোরদারে অব্যাহত অবদানের জন্য তারো আসোকে ধন্যবাদ জানান প্রধানমন্ত্রী। ২০০৬ সালে বিএনপির তৎকালীন সিনিয়র যুগ্ম মহাসচিব হিসেবে জাপান সফরের সময় তারো আসোর সঙ্গে সাক্ষাতের স্মৃতিচারণ করেন তিনি। বাংলাদেশের সাবেক প্রধানমন্ত্রী বেগম খালেদা জিয়ার সঙ্গে নিজের সাক্ষাতের কথাও স্মরণ করেন জাপানের সাবেক এই প্রধানমন্ত্রী।
তারো আসো বলেন, বাংলাদেশের জনগণের বড় একটি অংশ তরুণ। দেশে বর্তমানে রাজনৈতিক স্থিতিশীলতা তৈরি হয়েছে, যা বিনিয়োগের অনুকূল পরিবেশ সৃষ্টি করেছে। এ পরিস্থিতিতে জাপানি কোম্পানিগুলো বাংলাদেশে বিনিয়োগে অত্যন্ত আগ্রহী।
জাপানের সাবেক প্রধানমন্ত্রী, উপপ্রধানমন্ত্রী ও অর্থমন্ত্রীসহ বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বে থাকাকালে বাংলাদেশের সঙ্গে দ্বিপক্ষীয় সম্পর্ক উন্নয়নে তারো আসোর ইতিবাচক ও গঠনমূলক ভূমিকার প্রশংসা করেন তারেক রহমান। বাংলাদেশের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘদিনের ব্যক্তিগত সম্পৃক্ততা দুই দেশের বন্ধুত্বপূর্ণ সম্পর্ক সুদৃঢ় করতে গুরুত্বপূর্ণ অবদান রেখেছে বলেও উল্লেখ করেন প্রধানমন্ত্রী।
বৈঠকে উভয় পক্ষ রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক সম্পর্কের পাশাপাশি জনগণের সঙ্গে জনগণের যোগাযোগ আরও জোরদারের ওপর গুরুত্ব দেয়।
প্রধানমন্ত্রী বলেন, বিদেশি বিনিয়োগকারীদের জন্য ব্যবসাবান্ধব পরিবেশ তৈরিতে তাঁর সরকার বিভিন্ন উদ্যোগ নিয়েছে। এ লক্ষ্যে কিছু আইনি পরিবর্তনও আনা হচ্ছে। শিক্ষা ও দক্ষতা উন্নয়নসহ বিভিন্ন খাতে সরকারের উদ্যোগের কথাও তিনি তুলে ধরেন।
বাংলাদেশ ও জাপানের মধ্যে অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব চুক্তি স্বাক্ষরের পরিপ্রেক্ষিতে জাপানি বিনিয়োগ বৃদ্ধি, দ্বিপক্ষীয় বাণিজ্য সম্প্রসারণ এবং প্রযুক্তি হস্তান্তর জোরদারে তারো আসোর সহযোগিতা চান প্রধানমন্ত্রী। একই সঙ্গে বাংলাদেশের উন্নয়ন অগ্রাধিকার বাস্তবায়ন ও দক্ষ মানবসম্পদ গড়ে তুলতে জাপানের অব্যাহত সহযোগিতা প্রত্যাশা করেন তিনি।
দুই দেশের প্রতিনিধিদের উপস্থিতি
মাসুমি কাকিনোকির সঙ্গে সাক্ষাৎকালে উপস্থিত ছিলেন অর্থ ও পরিকল্পনামন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী, বেসামরিক বিমান পরিবহন ও পর্যটনমন্ত্রী এম রশিদুজ্জামান মিল্লাত, প্রধানমন্ত্রীর অর্থ ও পরিকল্পনাবিষয়ক উপদেষ্টা রাশেদ আল মাহমুদ তিতুমীর, পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী-১ হুমায়ুন কবির, বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী অনিন্দ্য ইসলাম অমিত এবং প্রধানমন্ত্রীর ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্যপ্রযুক্তি এবং বিজ্ঞান ও প্রযুক্তিবিষয়ক উপদেষ্টা রেহান আসিফ আসাদ।
এ ছাড়া উপস্থিত ছিলেন প্রধানমন্ত্রীর বিশেষ সহকারী ড. মো. শাকিরুল ইসলাম খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং প্রধানমন্ত্রীর অতিরিক্ত প্রেস সচিব আতিকুর রহমান রুমন।
তারো আসোর সঙ্গে বৈঠকে একই মন্ত্রী ও উপদেষ্টাদের পাশাপাশি প্রধানমন্ত্রীর গবেষণা কর্মকর্তা মো. আবদুস সাত্তার পাটোয়ারী এবং প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। জাপানের প্রতিনিধিদলে ছিলেন দেশটির সাবেক মন্ত্রী ও লিবারেল ডেমোক্রেটিক পার্টির (এলডিপি) চেয়ারম্যান ইয়াসুতোশি নিশিমুরা, ভূমি, অবকাঠামো, পরিবহন ও পর্যটনবিষয়ক মন্ত্রী তাতসুনোরি ইবায়াশি এবং দেশটির সংসদের জ্যেষ্ঠ সদস্যরা।
মারুবেনির সঙ্গে আগের বৈঠকেও প্রযুক্তি সহযোগিতা
এর আগে ১১ অক্টোবর ঢাকায় প্রধানমন্ত্রীর কার্যালয়ে তারেক রহমানের সঙ্গে সাক্ষাৎ করেন মারুবেনি করপোরেশনের প্রেসিডেন্ট ও প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) মাসায়ুকি ওমোতোর নেতৃত্বাধীন প্রতিনিধিদল। ওই বৈঠকে বাংলাদেশের তথ্যপ্রযুক্তি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, সাইবার নিরাপত্তা, সার ও জ্বালানি খাতে সহযোগিতা এবং বাংলাদেশে জাপানি বিনিয়োগ সম্প্রসারণ নিয়ে আলোচনা হয়।
সাম্প্রতিক বৈঠকগুলোতে আইসিটি ও জ্বালানি খাতে বিনিয়োগ, প্রযুক্তি হস্তান্তর, দক্ষ মানবসম্পদ উন্নয়ন এবং অর্থনৈতিক অংশীদারত্ব বাস্তবায়নের বিষয় গুরুত্ব পাওয়ায় বাংলাদেশ-জাপান সম্পর্কের বাণিজ্যিক ও প্রযুক্তিগত সহযোগিতা সম্প্রসারণের সম্ভাবনা সামনে এসেছে।
//ডিবিটেক/আইএইচ/এসএমপি/এমআইএসটি//





