একযুগের বেশি সময় পর টেলিকম থেকে জনপ্রশাসনে জহিরুল ইসলাম
- ডাক-টেলিযোগাযোগ বিভাগে এক যুগের বেশি দায়িত্ব পালনের পর সংযুক্ত
- ছয় রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের বোর্ড চেয়ারম্যানের দায়িত্বও পালন করেছেন
- পদায়ন নিয়ে প্রশাসনে আগে থেকেই ছিল নানা প্রশ্ন
প্রযুক্তি ও টেলিযোগাযোগ খাতে এক যুগের বেশি সময় গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্ব পালনের পর ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের অতিরিক্ত সচিব মো. জহিরুল ইসলামকে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হয়েছে। ৯ সেপ্টেম্বর ২০২৬ জারি করা জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের এক প্রজ্ঞাপনে তাকে অতিরিক্ত সচিব (সংযুক্ত) হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে বদলিপূর্বক পদায়ন করা হয়। এর মধ্য দিয়ে ২০১২ সালের আগ থেকে একই মন্ত্রণালয় ও সংশ্লিষ্ট দপ্তরে দায়িত্ব পালন করা বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৮তম ব্যাচের এই কর্মকর্তার ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের দায়িত্বের অবসান হলো।
৯ সেপ্টেম্বর, বুধবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ের প্রজ্ঞাপনটি জারি করা হয় এবং এতে বলা হয়েছে, আদেশটি অবিলম্বে কার্যকর হবে।
সংশ্লিষ্ট সূত্রের ভাষ্য, বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান জনাব সুনীল কান্তি বোস ২০১২ সালের ২৩ অক্টোবর বিটিআরসিতে যোগদানের পর মন্ত্রণালয়ে তার একান্ত সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালনকারী মো. জহিরুল ইসলামকে সহকারী পরিচালক পদে বিটিআরসিতে নিয়োগ দিয়ে তাঁর একান্ত সচিব হিসেবেই দায়িত্ব প্রদান করেন।
পরবর্তীতে মো. জহিরুল ইসলাম সিনিয়র সহকারী সচিব হিসেবে পদোন্নতি লাভের পর তৎকালীন বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ নিয়ন্ত্রণ কমিশনের বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১ প্রকল্পে উপপরিচালক হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। এরপর উপসচিব হিসেবে পদোন্নতি পাওয়ার পর তিনি ২০ মে ২০১৮ থেকে ২৭ জানুয়ারি ২০২২ পর্যন্ত বিটিআরসির কমিশন সচিব হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।
পরবর্তীতে যুগ্মসচিব হিসেবে পদোন্নতি পেয়ে তিনি ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে যোগদান করেন।
প্রাপ্ত তথ্য-উপাত্ত বলছে, ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগে দায়িত্ব পালনের সময় জহিরুল ইসলামকে ঘিরে বিভিন্ন বিতর্কও রয়েছে। বাংলাদেশ স্যাটেলাইট-১ (তৎকালীন বঙ্গবন্ধু স্যাটেলাইট-১) প্রকল্পটি বিটিআরসির অধীনে থাকাকালে তৎকালীন উপসচিব জহিরুল ইসলাম প্রকল্পটির উপপরিচালক (ডিপিডি) ছিলেন। বিটিআরসির সাবেক চেয়ারম্যান ড. শাহজাহান মাহমুদের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতার সূত্রে তিনি বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডে পরিচালকের পদও পেয়েছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে।
সূত্রের দাবি, ৫ আগস্টের আগে ড. শাহজাহান মাহমুদের আশীর্বাদেই উপসচিব থেকে যুগ্মসচিব পদে পদোন্নতি পেয়েছিলেন জহিরুল ইসলাম। ফ্যাসিস্ট আওয়ামী সরকারের পতনের পর গত বছরের ৮ আগস্ট সচিবালয়ে কর্মকর্তাদের একটি বিক্ষোভ কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দিয়ে তিনি বৈষম্যের শিকার কর্মকর্তা হিসেবে আলোচনায় আসেন। ওই মাসেই তিনি অতিরিক্ত সচিব পদে পদোন্নতি পান। তবে এসব অভিযোগ অস্বীকার করেছেন জহিরুল ইসলাম।
সবশেষ গত বছরের ৩০ এপ্রিল ডাক, টেলিযোগাযোগ ও তথ্য-প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের জারি করা এক অফিস আদেশে অতিরিক্ত সচিব জহিরুল ইসলামের কাছে দায়িত্ব হস্তান্তর করে অবসরে যান মুশফিকুর রহমান। তাঁর স্থলে অতিরিক্ত রুটিন দায়িত্ব পালন করেন জহিরুল ইসলাম।
রুটিন দায়িত্বের কার্যক্ষমতা সীমিত হওয়ায় সে সময় মন্ত্রণালয়ের দৈনন্দিন কার্যক্রমে স্থবিরতা তৈরি হয় বলে সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলো জানায়। আর্থিক ও প্রশাসনিক কার্যক্রমের পাশাপাশি মন্ত্রণালয়ের অধীন সংস্থাগুলোর কার্যক্রমেও এর প্রভাব পড়ে। কারণ, মন্ত্রণালয়ের সচিব পদাধিকারবলে ছয়টি রাষ্ট্রায়ত্ত প্রতিষ্ঠানের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান। পূর্ণকালীন সচিবের অনুপস্থিতিতে এসব প্রতিষ্ঠানের বোর্ডসভা অনুষ্ঠিত না হওয়ায় গুরুত্বপূর্ণ সিদ্ধান্ত গ্রহণেও জটিলতা তৈরি হয়েছিল।
এই অচলাবস্থা কাটাতে ওই বছর ১৫ মে অফিস আদেশ জারি করে রুটিন দায়িত্বপ্রাপ্ত জহিরুল ইসলামকে মন্ত্রণালয়ের অধীন রাষ্ট্রায়ত্ত সংস্থাগুলোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করা হয়। ফলে তিনি একইসঙ্গে বাংলাদেশ টেলিকমিউনিকেশনস কোম্পানি লিমিটেড (বিটিসিএল), টেলিটক বাংলাদেশ লিমিটেড, বাংলাদেশ সাবমেরি কেবলস কোম্পানি লিমিটেড, বাংলাদেশ কেবল শিল্প লিমিটেড, টেলিফোন শিল্প সংস্থা লিমিটেড (টেশিস) এবং বাংলাদেশ স্যাটেলাইট কোম্পানি লিমিটেডের চেয়ারম্যানের দায়িত্ব পান।
এ নিয়েও সংশ্লিষ্ট মহলে আপত্তি ও অসন্তোষ তৈরি হয়েছিল। কারণ, প্রশাসন ক্যাডারের ১১তম থেকে ১৭তম ব্যাচ পর্যন্ত শুধু অতিরিক্ত সচিব পদেই দুই শতাধিক কর্মকর্তা সরকারের বিভিন্ন মন্ত্রণালয় ও সংস্থায় কর্মরত রয়েছেন। তাঁদের মধ্যে অনেকেই পদোন্নতির জন্য যোগ্য হলেও ১৮তম ব্যাচের একজন কর্মকর্তাকে সচিবের অতিরিক্ত দায়িত্বে বহাল রাখা এবং পরে অধীন সংস্থাগুলোর পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান করার বিষয়টি নিয়ে প্রশ্ন ওঠে।
বিশেষ করে ডাক ও টেলিযোগাযোগ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক আশরাফ হোসেন, বিটিসিএলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মামুনুর রশীদ এবং রাষ্ট্রায়ত্ত মোবাইল নেটওয়ার্ক অপারেটর টেলিটকের ব্যবস্থাপনা পরিচালক নুরুল মাবুদ—তিনজনই বিসিএস প্রশাসন ক্যাডারের ১৩তম ব্যাচের কর্মকর্তা। অথচ ডাক ও টেলিযোগাযোগ বিভাগের ১৮তম ব্যাচের কর্মকর্তা জহিরুল ইসলাম সচিব এবং বিটিসিএল ও টেলিটকের পরিচালনা পর্ষদের চেয়ারম্যান হিসেবে তাঁদের ঊর্ধ্বতন পদে ছিলেন—এ নিয়েও দাপ্তরিক মহলে প্রশ্ন তৈরি হয়।
প্রশাসন ক্যাডারের কর্মকর্তাদের মধ্যে জ্যেষ্ঠতা ও পদায়ন নিয়ে তৈরি হওয়া এই বিতর্কের মধ্যেই জহিরুল ইসলামকে এবার জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে সংযুক্ত করা হলো। নতুন প্রজ্ঞাপনে তাঁকে অতিরিক্ত সচিব (সংযুক্ত) হিসেবে জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে পদায়ন করা হয়েছে।
//ডিবিটেক/এমএবিটি/এসএমই/এফওইটি//





