বিটিসিএলের প্রকল্প না এগুলে গচ্চা যাবে ৬শকোটি টাকা

বিটিসিএলের প্রকল্প না এগুলে গচ্চা যাবে ৬শকোটি টাকা
৭ জুলাই, ২০২৫ ১৮:৪৬  
৭ জুলাই, ২০২৫ ২০:২৩  

বিটিসিএলের ৫জি রেডিনেস প্রকল্প এগুলে ৬শকোটি টাকা গচ্চা যাবে বলে জানিয়ে প্রধান উপদেষ্টার বিশেষ সহকারী ফয়েজ আহমদ তৈয়্যব বলেছেন,  ব্যক্তিস্বার্থে নয় দেশের স্বার্থেই দুদকের সহায়তা চাওয়া হয়েছে। কিন্তু  দুদককে চিঠি দেয়ার বিষয়টিকে ভুলভাবে ব্যাখ্যা করা হচ্ছে। 

৭ জুলাই, সোমবার ফরেন সার্ভিস একাডেমিতে আয়োজিত এক সংবাদ সম্মেলনে তিনি আরো বলেছেন, বিটিসিএল ফাইবার নেটওয়ার্ক বাড়ানোর  প্রকল্পটি গত সরকারের আমলের। সে সময়ই দরপ্রক্রিয়া প্রভাবিত করা হয়েছে এবং একটা এলসিও করা হয়েছিল। আমি এবং নাহিদ ইসলাম দায়িত্ব নেওয়ার আগে সেই এলসির ২৯০ কোটি পরিশোধ করা হয়ে গেছে। এই সব কিছু আমলে নিয়ে আমরা দুর্নীতি দমন কমিশনের চেয়াম্যানের সঙ্গে কথা বলেছি। আমি নিজে ওনার অফিসে গিয়েছি। আমি বলেছি, যেহেতু ২৯০ কোটি টাকা চলে গেছে তাই প্রকল্পটি চালিয়ে নেওয়া যেতে পারে। এ ছাড়া বিটিসিএলের সক্ষমতা বৃদ্ধির আরও একটি ৩শ কোটি টাকার প্রকল্প শেষ হয়েছে। ৫জি রেডিনেস প্রকল্পটি শেষ না হলে ওই প্রকল্পটি কাজে লাগানো যাচ্ছে না। এই প্রকল্প বাস্তবায়িত না হলে বিটিসিএল দুর্বল হয়ে মার্কেট আউট হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে। প্রতিদ্বন্দী বেসরকারী কোম্পানিগুলো এটাই চাইছে। তাই দেশের স্বার্থে বিটিসিএলের প্রকল্প এগিয়ে নিতে বলিষ্ট উদ্যেগ নিয়েছি। 

আওয়ামীলীগ সরকারের বিশেষ সুবিধায় টেলিকম ব্যবসায়ীরা ১২ বছরে ৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করেছে। 

টেলিযোগাযোগ খাতে বিগত সরকারের অনিয়ম দুর্নীতির উল্লেখ করে ফয়েজ তৈয়্যব বলেন, আওয়ামীলীগ সরকারের বিশেষ সুবিধায় টেলিকম ব্যবসায়ীরা ১২ বছরে ৮ হাজার কোটি টাকার রাজস্ব ক্ষতি করেছে।  এ বিপুল পরিমাণ রাজস্ব ক্ষতির পুরোটাই সালমান এফ রহমান গংদের পকেটে ঢুকেছে।

ফয়েজ আহমেদ তৈয়্যব বলেন, আপনারা জানেন যে বাংলাদেশের ইন্টারনেট বর্তমান ফুটপ্রিন্ট এটার রিয়াল ইন্টারনেট ফুটপ্রিন্ট হচ্ছে সাড়ে সাত টেরাবাইট। এখন আমরা যখন ইন্টারনেট বলি, আসলে আমরা যা দেখি, ফেসবুক এ বা মোবাইলে, এটার সামান্য একটা অংশ আসলে রিয়াল ইন্টারনেট। বাকিটা ক্যাশ। বিটিসিএল যখন তার নেটওয়ার্ক সম্প্রসারণের জন্য দায়িত্ব নেয় তখন তারা বলেছিল ২০৩০ সালের আশেপাশে এই ক্যাপাসিটিটা ২৬ টেরাবাইট হবে। কিন্তু সেই স্পেসিফিকেশনে ক্যাশ ইন্টারনেট এবং রিডান্ডেন্সি—এই দুইটা মিস করা হয়েছিল। বুয়েট একটা স্টাডি করেছে।  ২০১৬-২০১৭ সালের দিকে সেই স্টাডিতে দেখানো হয়েছিল হয়েছিল তখন থেকে ১০/১২ বছর পরে এটা লাগবে ১০০ টেরাবাইটের বেশি। আমরা যদি আজকের হিসাব দেখি তাহলে আমরা দেখতে পাচ্ছি এই মুহূর্তে নবাংলাদেশের ইন্টারনেট ফুটপ্রিন্টটা হল ক্যাশ এবং টোটাল ইন্টারনেট মিলে আনুমানিক ৩৫-৩৬ টেরাবাইট। বৈশ্বিক ইন্টারনেটের যে কম্পাউন্ড এনুয়াল গ্রোথ রেইট তা হল ২৮%। আর উন্নয়নশীল দেশগুলোতে সেখানে এই রেইট অনেক বেশি। আফ্রিকান দেশগুলোতে ৩৪% আর বাংলাদেশের মতো দেশগুলোতে ৪৫%। এখন আমরা যদি বাংলাদেশের এই ৩৫ টেরাবাইট ইন্টারনেটের ওপর বছর বছর ৩৪% থেকে ৪৫% একটা হিসাব যোগ করি তাহলে এই প্রবৃদ্ধি আজ থেকে ১২ বছর পরে দাঁড়াবে প্রায় ১৭৫ টেররাবাইট। যদি একটা দেশে ৪০ বা তার আশেপাশের হারে ইন্টারনেট প্রবৃদ্ধি না হয় তাহলে বুঝতে হবে সেই দেশের ডিজিটাল ইনফ্রাস্ট্রাকচারের সমস্যা আছে। আমরা এই জন্য বলছি যে, বিটিসিএল ফাইবার নেটওয়ার্ক বর্ধিতকরণের যে প্রকল্প বিগত সরকারের আমলে নিয়েছে, যার টেন্ডার বিগত সরকারের আমলে হয়েছে, যেখানে টেন্ডার প্রক্রিয়াকে প্রভাবিত করার যে ঘটনাগুলো  বিগত সরকারের আমলে হয়েছে, এবং সেখানে যে একটা এলসি করা হয়েছিল—আমি এবং নাহিদ ইসলাম দায়িত্ব নেয়ার আগে এই এলসিতে ২৯০ কোটি টাকা পরিশোধও করা হয়ে গেছে। এই সব কিছু আমলে নিয়ে আমরা দুর্নীতি দমন কমিশনের মাননীয় চেয়ারম্যান মহোদয়ের সাথে কথা বলেছি। আমি নিজে উনার অফিসে গিয়েছি। আমি বলেছি যে স্যার যেহেতু ২৯০ কোটি টাকা চলে গেছে, এবং যেহেতু এটা (হুয়াওয়ে) সর্বনিম্ন দরদাতা, এবং ক্যাপাসিটি নিয়ে যেই অপতথ্যটা এসেছিল সেটা বুয়েট যেহেতু পরিষ্কার করেছে ; আমরা একটা কমিটি করে দিব যেই কমিটির মাধ্যমে যেই ইকুইপমেন্টগুলো তারা প্রতিশ্রুতি দিয়েছে, আপনারা জানেন যে এটা ওএসআর ৯৮০০, এম ১২ এবং এম ২৪; এই ইকুপমেন্টগুলো বিটিসিএল এর যে ব্যবসায়িক প্রতিদ্বন্দি বাংলাদেশের বেসরকারি খাতে ইতোমধ্যেই এটা ব্যাপক আকারে স্থাপিত হচ্ছে। কিছু বিশেষ কোম্পানি বিটিসিএল-কে এই বাজার থেকে বাহির করে দিতে চায়। তো আমরা এই বক্তব্য যখন তুলে ধরেছি তখন বলা হয়েছে, ঠিক আছে আমাদেরকে বিস্তারিত জানানো হোক। সেই রেফারেন্সে আমি মাননীয় দুদক চেয়ারম্যানকে একটা চিঠি লেখি। এই চিঠিতে আমি মূলত আমার যুক্তিগুলো তুলে ধরি। যে, যেহেতু টাকাটা চলে গেছে, যেহেতু আমাদের বিটিসিএলের ক্যাপাসিটি সম্প্রসারণ দরকার। আপনারা জানেন যে বর্তমানে যে ক্যাপাসিটি আছে এটা জেলা পর্যায়ে মাত্র এক জিবি পিএস। এটা দিয়ে আসলে বেটার কোয়ালিটি ইন্টারনেট সেবা দেয়া অসম্ভব। এখন এই মুহূর্তে বিটিসিএল যদি এই নেটওয়ার্কটা আপগ্রেড না করে তাহলে খুব দ্রুতই সে মার্কেট আউট হয়ে যেতে পারে। এখন যেহেতু তার প্রতিদ্বন্দ্বীগুলো নেটওয়ার্ক আপগ্রেড করছে এবং বিটিসিএল বিভিন্ন ঝামেলার কারণে, যেগুলো সাবেক সরকারের আমলে দুর্নীতির অভিযোগ এবং বিভিন্ন কারণে এই কাজটা বন্ধ হয়ে আছে সেজন্য বিটিসিএলের যে ফাইবার নেটওয়ার্ক আছে এটা এক্সপান্ড করা যাচ্ছে না। উপরন্তু আমরা বলেছি, বিটিসিএলের মূল প্রজেক্টের মধ্যে দুটো বিষয় আছে। একটা হচ্ছে আইপি নেটওয়ার্ক। আরেকটা হচ্ছে ফাইবার ডিডব্লিউডিএম নেটওয়ার্ক। আইপি নেটওয়ার্কের কাজ সত্তর থেকে আশি শতাংশ অলরেডি হয়ে গেছে। কিন্তু সেই তিন'শো কোটি টাকা আজকে কোনই কাজে আসছে না। কারণ, সেই নেটওয়ার্কের যে সার্ভারগুলো বসানো আছে, সেই সার্ভারগুলো সংযোগ করার জন্য আমাদের ডিডব্লিউডিএম নেটওয়ার্কটা দরকার। তো সেজন্যই আমরা যুক্তি উপস্থাপন করেছি, যেহেতু টাকা চলে গেছে আমাদেরকে কাজটা করতে দেওয়া হোক। আর যেহেতু ইকুইপমেন্টটা বর্তমান বিশ্বে ব্যবহৃত বহুল প্রচলিত ইকুইপমেন্ট, আমরা একটা কমিটি করে দেব। যেই কমিটি নিশ্চিত করবে যে রাইট ইকুইপমেন্ট যেটা প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে সেটা আসবে। 

এইটাকে অপব্যাখ্যা করে আমাদের, আমাকে ব্যক্তিগতভাবে, আমার মিনিস্ট্রিকে এবং আমাদের সরকারকে চরিত্র হরণের একটা চেষ্টা আপনারা মিডিয়াতে দেখেছেন। আমি এর নিন্দা জানাই এবং আমি সুস্পষ্টভাবে বলতে চাই, আমি এবং আমার মন্ত্রণালয়ের বর্তমান দায়িত্বপ্রাপ্ত আমরা যারা আছি তারা কোনো ধরনের কোনও দুর্নীতিতে জড়িত নই।  এখানে যত ধরনের কাজ হয়েছে প্রত্যেকটা কাজ আগের সরকারের আমলে হয়েছে। আমরা শুধুমাত্র কিছু চিঠি আদান প্রদান করে আমাদের মতামত ব্যক্ত করেছি এবং মতামত ব্যক্ত করে চিঠির শেষ লাইনে মাননীয় দুদক চেয়ারম্যানের আন্তরিক সহযোগিতা প্রত্যাশা করেছি। এর বাইরে আমরা কোনো নির্দেশ দেইনি। আর উল্লেখ্য যে, এখানে এই প্রজেক্টের ব্যাপারে দুদকের পর্যবেক্ষণ ছাড়া কোনো ধরনের কোনও মামলা নেই। সুতরাং যে বিষয়টা করা হচ্ছে, আমরা বলছি, যদি এই কাজটা না করা হয় এবং এই এলসিটা না করা হয়, তাহলে দুটো ঘটনা ঘটবে। ছয়শো কোটি টাকার গচ্ছা যাবে এবং একইসাথে বিটিসিএল তার যে ডিডব্লিউডিএম বাজারে এই বাজারে দুর্বল হয়ে হয়ে এখান থেকে মার্কেট আউট হয়ে যাওয়ার একটা সম্ভাবনা আছে।

সব মিলে আমরা বলতে চাই, আইসিটিতে আমরা যে কাজগুলো করছি আপনারা জানেন সেখানে আমরা প্রায় আড়াই হাজার কোটি টাকার অনায্য প্রকল্প বাদ দিয়েছি। নতুন বাজেটে আইসিটি থেকে কোনও নতুন প্রকল্প তুলি নাই। কারণ একনেক  মিটিং এ  আমি স্যারকে (প্রধান উপদেষ্টা) বলেছি যে স্যার, যেহেতু এখানে অনেক দুর্নীতি হয়েছে, ২০ টার মতো প্রজেক্ট আইসিটিতে  আছে। ৬ টার মতো প্রজেক্ট পোস্ট এবং টেলিকমে আছে। 
আমি চাই এই প্রকল্পগুলোকে অপ্টিমাইজ করতে। অর্থাৎ এখানেকে একটা শৃঙ্খলা দিয়ে আসতে। এটা যখন শেষ হবে তখন আমরা নতুন প্রজেক্ট তুলব। সেটা দক্ষতাকেন্দ্রিক বিষয়ক হতে পারে। আমাদের মন্ত্রণালয়ের সবাই মিলে চাচ্ছি যে বিদ্যমান যে স্পেসিফিকেশনগুলো আছে সেখানে আমরা অনেক ভুল পেয়েছি। যেমন ডেটা সেন্টার আছে কিন্তু সেখানে সাইবার সিকিউরিটির কোনো এলিমেন্ট নাই। মনিটরিং এর কোনো এলিমেন্ট নাই। এনভায়রনমেন্ট কন্ট্রোল করার জন্য কোনো এলিমেন্ট নাই।

০৭-জুলাই/ডিজিবিটেক/এনএইচটি