সাংবাদিক রোজিনার মুক্তির দাবিতে উত্তাল সোশ্যাল মিডিয়া

১৮ মে, ২০২১ ১১:৪৪  
প্রথম আলোর জ্যেষ্ঠ প্রতিবেদক রোজিনা ইসলামের নিঃশ্বর্ত মুক্তির দাবিতে রাত-ভর শাহবাগ থানার সামনে গণমাধ্যমকর্মীদের বিক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে। একইসঙ্গে তার প্রকাশিত বিভিন্ন‘ভুয়া’ মুক্তিযোদ্ধা সেজে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে কর্মকর্তা হওয়া; নিয়োগকে কেন্দ্র করে সচিবকে চিঠি দিয়ে জনপ্রতি ১৫-২০ লাখ টাকা ঘুষ নেওয়ার অভিযোগসহ বেশ কিছু অনুসন্ধানী প্রতিবেদনের ‘স্ক্রিন শট’ এর মধ্যে নতুন করে কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে। এই ঘটনায় ক্ষোভ-বিক্ষোভের লাইভ ভিডিওতে উত্তাল হয়ে ওঠে ফেসবুকের টাইম লাইন। প্রতিবাদী হ্যাশট্যাগ, ফুটেজ, ভিডিও সংখ্যা ক্রমেই বাড়ছে। সরাসরি সম্প্রচারিত হচ্ছে তাকে সচিবালয় থেকে থানা হয়ে আদালত পর্যন্ত সব ঘটনার ভিডিও। সাংবাদিক, মানবাধিকারকর্মী, নারী আন্দোলনের নেতা, রাজনীতিক ও ব্যবসায়ী নেতা থেকে শুরু করে সর্বস্তরেই চলছে প্রতিবাদি পোস্ট। পোস্ট গুলো দেশের সোশ্যাল মিডিয়ার টাইম লাইনে ‘ইসরাইল-ফিলিস্তিন’ পোস্টের সঙ্গে সমানতালে উত্তাপ ছড়াচ্ছে দেশের ভার্চুয়াল আকাশে। পাশাপাশি মামলায় ব্যবহৃত অফিস সিক্রেসি অ্যাক্ট এবং মোবাইলের নথির ছবি তোলাকে ‘তথ্য চুরি’ আখ্যা দেয়ার বিষয়টি নেটিজেনদের মন্তব্যে বিস্ময় প্রকাশ করেছে। এমনকি এই ঘটনাকে ‘দুঃখজনক’ উল্লেখ করে ফেসবুক পোস্ট দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর সাবেক উপ-প্রেস সচিব আশরাফুল আলম খোকন। ওই পোস্টে তিনি লিখেছেন - “আজকের ঘটনাটা খুবই দুঃখজনক। দোষ কার, কে দায়ী তা জানিনা। তবে মনে হয়েছে, একজন পেশাদার সাংবাদিকের সাথে অন্যভাবে আচরণ করেও বিষয়টি সমাধান করা যেত। গুটি কয়েক কর্মকর্তার জন্য সবসময় সাংবাদিক বান্ধব শেখ হাসিনার সরকার আজ সমালোচনার মুখে। সাড়ে সাত বছর মাননীয় প্রধানমন্ত্রীর প্রেস উইংয়ে কাজ করেছি। নিজে চোখে দেখেছি তিনি নিজে কতটা সাংবাদিক বান্ধব।সাংবাদিকদের কল্যাণের জন্য নিজে উদ্যোগী হয়ে কত কত কাজ করেছেন। এই রকম পরিস্থিতি আগেও হয়েছে। দুই পক্ষের সাথে কথা বলেই সমাধান হয়েছে। এমন অনেক সমাধান নিজেও করেছি। হয়তো কর্তৃপক্ষের সাথে কথা বলেছি অথবা সাংবাদিকের সাথে কথা বলেছি। “পেশাদার” আবারো বলছি পেশাদার সাংবাদিকদের চেষ্টা করেছি ঝামেলামুক্ত রাখতে। সদিচ্ছা থাকলে অ-সমাধানযোগ্য কোন কিছুই পৃথিবীতে নাই। পেশাদার আর অ-পেশাদারদের সাথে আচরণ একরকম হওয়া উচিত না। রোজিনা আপার মুক্তি চাই।” এই ঘটনার পর অধ্যাপক আনু মুহাম্মাদ তার ফেসবুক পোস্টে বেশ কিছু প্রশ্ন ছুড়ে দিয়েছেন। লিখেছেন “রোজিনা ইসলাম কোন নথির খবর বের করতে চেয়েছিলেন বলে কর্তারা এতো ক্ষিপ্ত? সাংবাদিকতার ওপর এতো নির্যাতন, এতো অপমান? সেই নথি তো এখন জনসমক্ষে আনাই প্রথম কাজ হওয়া দরকার। মন্ত্রণালয়ের কর্ম-অপকর্ম-কুকর্ম যদি জনস্বার্থে প্রকাশ দরকার হয়, আর তা যদি রাষ্ট্রীয় নিরাপত্তার নামে সরকার গোপন রাখেও তবুও তা জনগণের নজরে আনার কাজই সাংবাদিকতা। অনুমতিপ্রাপ্ত তথ্যই যদি সব খবর হয় তাহলে সরকারি প্রেসনোটই তো যথেষ্ট, আর মিডিয়ার কী দরকার? দেখা যাচ্ছে যতো দুর্নীতি, অনিয়মের খবর প্রকাশিত হচ্ছে তত সরকারের বাহিনী উপবাহিনী আইন ও বেআইন দিয়ে টুটি চিপে ধরতে চেষ্টা করছে। কিন্তু লাভ নাই। সব গোপন প্রকাশ হবে। রোজিনা এ সংক্রান্ত যত প্রতিবেদন তৈরি করেছেন সেগুলো এখন আরও প্রচার করতে হবে।” অপর একটি পোস্টে বেসিস পরিচালক দিদারুল ভূইয়া লিখেছেন- “রোজিনা ইসলাম যে ডকুমেন্টের ছবি অনুমতি ছাড়া তুলেছেন বলে অভিযোগ করা হচ্ছে, সে ডকুমেন্টটা আসলে কী? সেখানে কার, কী গোমড় ফাঁস হয়ে যাচ্ছিল? স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় নিয়ে আমরা যা জেনেছি, তার বাইরে আরো অনেক কিছু আছে তবে? রোজিনা ইসলামের হয়রানির প্রতিবাদের সাথে সাথে সে ডকুমেন্ট প্রচারের দাবী জানাচ্ছি।” টেলিকম রিপোর্টার্স নেটওয়ার্ক বাংলাদেশের (টিআরএনবি) সভাপতি দৈনিক সমকালের বিশেষ প্রতিনিধি রাশেদ মেহেদী সিরিজ পোস্ট দিয়েছেন ঘটনার পর থেকেই। সাংবাদিক রোজিনাকে সচিবালয়ে হেনস্থার ছবি প্রকাশ করে দেয়া পোস্টে তিনি লিখেছেন- দূর্নীতিবাজ আমলাতন্ত্রের কালো হাত গলা টিপে ধরেছে স্বাধীন সাংবাদিকতার.....’ সংগঠনের পক্ষ থেকে তীব্র প্রতিবাদ জানিয়ে ফেসবুকে পোস্ট দিয়েছে বাংলাদেশ আইসিটি জার্নালিস্ট ফোরাম। সংগঠনের সভাপতি মোজাহেদুল ইসলাম ও সাধারণ সম্পাদক হাসান জাকির ওই যৌথ বিবৃতে ‘সচিবালয়ে স্বাস্থ্য বিভাগের ভেতরে সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে হেনস্তা করার ঘটনায় নিরপেক্ষ তদন্ত করার দাবী জানিয়েছে। সংগঠনের সাধারণ সম্পাদক এক পোস্টে লিখেছেন- আজকাল আর মা লা‌গে না, চোর নি‌জেকে সাধু দা‌বি ক‌রে বড় গলায় ব‌লে, সাংবা‌দিক বেটা চোর! মুঠোফোন গ্রাহক এসোসিয়েশনের সভাপতি মহিউদ্দিন আহমেদ তার ফেসবুক পোস্টে প্রতিবাদ জানিয়ে লিখেছেন- “বিশ্ব তথ্য অধিকার দিবসে সাংবাদিক রোজিনা ইসলাম কে বর্বরোচিত কায়দায় নির্যাতন করা হয়েছে। এ ধরনের আচরণ গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রের জন্য হুমকি। আমরা এ ঘটনার তীব্র নিন্দা জানাই। তাকে সসম্মানে বাড়ি ফেরার সুযোগ দেবার জন্য সরকারের দৃষ্টি আকর্ষণ করছি।” গণমাধ্যমকর্মী আজাদ বেগ দুর্নীতি দমন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করা পোস্টে লিখেছেন- “প্রথম আলোর সাংবাদিক রোজিনা ইসলামকে গলা চেপে ধরা অতিরিক্ত সচিব কাজি জেবুন্নেসা বেগম নাকি দেশ-বিদেশে অঢেল সম্পদের মালিক!” অনলাইন পোস্টে ডয়চে ভেলে বাংলা বিভাগের প্রধান খালেদ মুহিউদ্দীন ‘আমার বিরুদ্ধেও চুরির মামলা দেন’ শিরোনামে লিখেছেন- “ঢাকার নয়টি হাসপাতালের কেনাকাটার অনিয়ম, দুর্নীতি নিয়ে গত ফেব্রুয়ারিতে ডয়চে ভেলেতে চার পর্বের ধারাবাহিক প্রতিবেদন প্রকাশ হয়। সেই প্রতিবেদনগুলো একটি সরকারি নথির ভিত্তিতেই করা হয়েছে। সেটিও আমরা চুরি করেছি। রোজিনার বিরুদ্ধে চুরির দোষে মামলা হলে আমার বিরুদ্ধেও সেই নথি চুরির মামলা দেন।” তত্ত্বাবধায়ক সরকারের সাবেক উপদেষ্টা ও অর্থনীতিবিদ হোসেন জিল্লুর রহমান লেখেন, ‘কোনো হিসেবেই, কোনো যুক্তিতেই, কোনো অজুহাতেই নির্ভীক ও বস্তুনিষ্ঠ সাংবাদিক রোজিনার প্রকাশ্য হেনস্তা ও মেয়াদোত্তীর্ণ ঔপনিবেশিক গোপনীয়তা আইনের মাধ্যমে আইনি হয়রানি গ্রহণযোগ্য নয়, হতে পারে না। এটি নারীর অপমান, এটি সাংবাদিকতা পেশার অপমান, এটি মর্যাদাপূর্ণ মধ্যম আয়ের বাংলাদেশ স্বপ্নের অপমান, এটি সরকারি শুদ্ধাচার নীতিমালার অপমান। অবিলম্বে এই হেনস্তার অবসান চাই। “ওয়ার্কিং মাদার” রোজিনাকে অনতিবিলম্বে ওর সন্তানের সঙ্গে মিলিত হওয়া নিশ্চিত করা হোক। গণতান্ত্রিক রাষ্ট্রে জবাবদিহির ঊর্ধ্বে কেউই নয়, বিশেষ করে দুর্নীতিগ্রস্ত দায়িত্বপ্রাপ্তরা।’ বাংলাদেশ ফেডারেল সাংবাদিক ইউনিয়নের (বিএফইউজে) সভাপতি মোল্লা জালাল বলেন, ‘রোজিনা ইসলামের সঙ্গে স্বাস্থ্যসচিবের স্টাফদের আচরণ এই মন্ত্রণালয়ের সকল লুটপাট ও কলঙ্কের মধ্যে নিকৃষ্টতম একটি ঘটনা। সাংবাদিকদের ফাইল ধরে টানাটানি করতে হয় না। সকল তথ্য সরকারের লোকেরাই সরবরাহ করে থাকে। এর নিন্দা জানাই, পদস্থদের শাস্তি চাই।’