রাজশাহী বিআরটিএ অফিসে ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা
রাজশাহী: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর রাজশাহী কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, রিনিউ ও ক্লাস উন্নয়ন, স্মার্টকার্ড, বায়োমেট্রিক, গাড়ি ফিটনেস প্রসেসিং কিংবা নম্বর প্লেট অনুমোদন ঘিরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিরাপত্তা কর্মী (আনসার) এবং বহিরাগত দালালদের ত্রিমুখী যোগসাজশে কার্যালয়টি সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও পরীক্ষার্থীদের কাছে তীব্র হয়রানি ও আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। সরকারি আইন […] The post রাজশাহী বিআরটিএ অফিসে ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

রাজশাহী: বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন কর্তৃপক্ষ (বিআরটিএ)-এর রাজশাহী কার্যালয়ে ড্রাইভিং লাইসেন্স প্রদান, রিনিউ ও ক্লাস উন্নয়ন, স্মার্টকার্ড, বায়োমেট্রিক, গাড়ি ফিটনেস প্রসেসিং কিংবা নম্বর প্লেট অনুমোদন ঘিরে গড়ে উঠেছে দুর্নীতির এক শক্তিশালী সাম্রাজ্য। প্রতিষ্ঠানটির কর্মকর্তা-কর্মচারী, নিরাপত্তা কর্মী (আনসার) এবং বহিরাগত দালালদের ত্রিমুখী যোগসাজশে কার্যালয়টি সাধারণ সেবাগ্রহীতা ও পরীক্ষার্থীদের কাছে তীব্র হয়রানি ও আতঙ্কের নাম হয়ে উঠেছে। সরকারি আইন মেনে পরীক্ষা দেওয়া, নির্ভুল গাড়ি চালানো কিংবা লিখিত পরীক্ষায় সব সঠিক উত্তর দিলেও দালালের মাধ্যমে অগ্রিম ঘুষের টাকা না দিলে প্রার্থীদের ফেল করানোর ঘোরতর অভিযোগ রয়েছে।
সরেজমিনে অনুসন্ধানে দেখা যায়, বায়োমেট্রিক টেস্ট দেওয়ার জন্য অপেক্ষা করছেন রাজশাহী ও বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের দুই শিক্ষার্থী। যোগাযোগ না করলে পাশ করা সম্ভব নয় এমন সংশয় থেকে এক সুজুকি শোরুমের মাধ্যমে রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের আরবি বিভাগের ওই শিক্ষার্থী ১২ হাজার টাকা দিয়েছেন। তার ঠিক সামনেই চিন্তিত মুখে দাঁড়িয়ে ছিলেন বরেন্দ্র বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী সাদমান। কারণ জানতে চাইলে তিনি জানান, গতবার কোনো যোগাযোগ না করেই পরীক্ষায় অংশ নিয়েছিলেন, ফলে তাকে ইচ্ছাকৃতভাবে ফেল করানো হয়েছিল। অথচ প্রশ্নের উত্তর সব ঠিকঠাক দিয়েছিলেন তিনি।
হতাশা প্রকাশ করে সাদমান বলেন, ‘বিআরটিএ এবং পাসপোর্ট অফিস-এই দুই জায়গায় দুর্নীতির কোনো শেষ নেই। মানুষ পড়াশোনা শেষ করে এসে সামান্য ড্রাইভিং পরীক্ষার প্রিলিমিনারি পর্যায়ে এভাবে ইচ্ছাকৃত ফেলের শিকার হলে সাধারণ মানুষ কোথায় যাবে? এদের বিবেক বলতে কিছু নেই।’
একই ধরনের অভিজ্ঞতা ব্যক্ত করেন কাটাখালি মাদ্রাসার এক শিক্ষকের। লাইসেন্স রিনিউ ও ক্লাস উন্নয়নের জন্য আসা এই শিক্ষক পাশ নিশ্চিত করতে এবং ঝামেলা এড়াতে কর্তৃপক্ষকে প্রায় ৪ হাজার টাকা দিতে বাধ্য হয়েছেন বলে জানান। তিনি বলেন, ‘লাইসেন্স নবায়ন করার সময় ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা অতিরিক্ত টেবিলে দিতে হয়। বিআরটিএ-তে ১০ জন অফিসার থাকলে প্রত্যেকের আলাদা দালাল রয়েছে। টেবিল ধরে ধরে ১,০০০ ও ৫০০ টাকা করে ভাগ হয়।’
অনুসন্ধানে এবং ভুক্তভোগীদের ভাষ্যমতে, পদমর্যাদায় সামান্য অফিস সহকারী হলেও প্রশাসনিক ক্ষমতার মূল নিয়ন্ত্রক হিসেবে কাজ করছেন অফিস সহায়ক আলী এবং আনসার সদস্যসহ নিম্ন পদের কর্মচারীরা। পদে ছোট হলেও তাদের দাপট ও প্রভাব অসীম; তাদের সম্মতি বা টেবিল ছাড়া কোনো ফাইল প্রসেস হয় না।
আইনি ঝুঁকি এড়াতে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা বা প্রকৌশলীরা নিজেরা সরাসরি নগদ টাকা স্পর্শ করেন না। নিচের কর্মচারীদের মাধ্যমে সংগৃহীত ঘুষের তহবিল প্রতিটি প্রশাসনিক টেবিলে সুনির্দিষ্ট বণ্টন নিয়মে ভাগ হয় বলে জানান নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক কর্মকর্তা।
পরীক্ষার নামে প্রহসন ও জালিয়াতির মধ্যে রয়েছে টাকা দিলে লিখিত পরীক্ষার সময় প্রশ্নের উত্তর বলে দেওয়া এবং লার্নারে বিশেষ চিহ্ন রাখা। এছাড়া, প্র্যাকটিক্যাল ড্রাইভিং পরীক্ষায় গাড়ি চালাতে না পেরে হেঁটে ঠেলে আনলেও প্রার্থীদের উত্তীর্ণ করা হয় এবং কোনো পরীক্ষায় উপস্থিত না হয়েও মোটা অঙ্কের টাকার বিনিময়ে সরাসরি লাইসেন্স দেওয়া হয়। অন্যদিকে বাধ্যতামূলক ড্রাগ টেস্টের নিয়ম টাকার বিনিময়ে পুরোপুরি বাদ দেওয়া হয়েছে।
যানবাহনকে ঘুষের বিনিময়ে ফিটনেস সার্টিফিকেট দেওয়া, মালিকানা পরিবর্তন এবং রুট পারমিট দেওয়ার ক্ষেত্রে ফাইল আটকে রেখে গ্রাহকদের দালাল ধরতে বাধ্য করা হয়।
ঘুষের ‘রেটকার্ড’ অনুযায়ী, কার ও মোটরসাইকেলের যৌথ লাইসেন্সের জন্য ১০ থেকে ১৫ হাজার টাকা, প্রিলিমিনারি ও ভাইবায় ফিক্সড পাসের জন্য ৩ হাজার টাকা এবং পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি লাইসেন্স বাবদ ৭ হাজার টাকা নেওয়া হচ্ছে। এছাড়া ভারী লাইসেন্স ও রিনিউ প্রসেসে অতিরিক্ত ৩,৫০০ থেকে ৪,০০০ টাকা এবং ফিটনেস ও বায়োমেট্রিক অনুমোদনে গাড়ি ও ব্যক্তিভেদে ৫ থেকে ২০ হাজার টাকা পর্যন্ত আদায় করা হচ্ছে। এর বাইরে সংক্ষিপ্ত ২-৫ মিনিটের প্র্যাকটিক্যাল টেস্টের জন্য মোটরসাইকেলে জনপ্রতি ১০০ এবং কারে ২০০ টাকা অতিরিক্ত নেওয়ারও অভিযোগ রয়েছে।
‘সেবা খাতে দুর্নীতি: জাতীয় খানা জরিপ ২০২৫’ অনুযায়ী, বিআরটিএ কার্যালয়ে সেবা নেওয়ার সময় দুর্নীতির শিকার হন ৭৯.৩ শতাংশ মানুষ, আর এই খাতে ঘুষের শিকার হন ৬৩.৫ শতাংশ মানুষ।
রাজশাহীর স্থানীয় সেবাগ্রহীতা আব্দুল্লাহ জানান, ‘পরীক্ষা ছাড়া সরাসরি লাইসেন্স দেওয়ার কথা বলে আমার কাছে ৭,০০০ টাকা দাবি করা হয়েছিল। ড্রাগ টেস্ট ছাড়াই টাকা দিলে সব কাজ হয়ে যায়। টাকা না দিলে ফাইল এক ইঞ্চিও নড়ে না।’
নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক এক চুক্তিভিত্তিক লাইসেন্স গ্রহীতা বলেন, ‘এখানে দালাল ছাড়া কোনো গতি নাই। ৫ হাজার টাকা দিয়েছি। আলী কাকা নামের এক অফিস সহকারীর পাওয়ার এখানে সবচেয়ে বেশি।’
রাজশাহী টিটিসির এক ড্রাইভিং প্রশিক্ষক হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘কিছু করার নেই ভাই। টাকা না দিলে ফেল করিয়ে দেবে, কী করবেন? এখানে নেতা-কর্মকর্তা সবাই জড়িত। বাধ্য হয়ে ঝামেলা এড়াতে টাকা দিয়ে কাজ সারতে হয়।’
বিশেষজ্ঞদের মতে, সেবায় প্রযুক্তির কথা বলা হলেও মূল পরীক্ষা ও ফিটনেস যাচাই এখনও ম্যানুয়াল পদ্ধতিতে হওয়ায় দুর্নীতির অবাধ সুযোগ তৈরি হচ্ছে। জনবল সংকট, জরাজীর্ণ পরীক্ষাকেন্দ্র এবং অপরাধীদের বিরুদ্ধে কার্যকর শাস্তির অভাব এই ব্যবস্থাকে স্থায়ী রূপ দিয়েছে। অযোগ্য চালক ও ত্রুটিপূর্ণ গাড়ি এভাবে রাস্তায় নামার সুযোগ পাওয়ায় পুরো পরিবহন খাত একটি ‘ডেথ ট্র্যাপে’ পরিণত হয়েছে।
এই সংকট উত্তরণে প্রযুক্তিভিত্তিক সমাধান তথা সরাসরি মানুষের হস্তক্ষেপমুক্ত শতভাগ কমপিউটারাইজড ‘অটোমেটেড ভেহিকল টেস্টিং সেন্টার (VTC)’ ও ভিআইএস ব্যবস্থা চালুর পাশাপাশি নিবন্ধিত প্রাইভেট অটোমোবাইল ওয়ার্কশপকে থার্ড-পার্টি হিসেবে ফিটনেস পরীক্ষার দায়িত্ব দেওয়ার সুপারিশ করেছেন বিশেষজ্ঞরা। এছাড়া সিসিটিভি ক্যামেরার সার্বক্ষণিক মনিটরিং এবং স্বাধীন ভিজিল্যান্স টিম গঠনের তাগিদ দেওয়া হয়েছে।
অভিযোগের সত্যতা যাচাই করতে ছদ্মবেশে অফিস সহকারী আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি জানান, কাজ করে দেওয়া যাবে এবং সেটির খরচ ওই সময়ে নির্ধারণ করা হবে।
অন্যদিকে আনসার সদস্যদের বিষয়ে এক আনসার সদস্য বলেন, ‘আমাদের সঙ্গে কেউ কথা বলতে দেখলেই মনে করে ঘুষ নিচ্ছি। কারো সঙ্গে কথা বলাও এখন কঠিন হয়ে পড়েছে।’
সার্বিক অভিযোগের বিষয়ে বিআরটিএ রাজশাহী সার্কেলের সহকারী পরিচালক মো. শাহজামান হক এই প্রতিবেদককে বলেন, ‘এ সংক্রান্ত কোনো অভিযোগ আমাদের কাছে এখনো আসেনি। তবে অধিকাংশ সেবা অনলাইন-ভিত্তিক হওয়ায় অফিসে এসে ফাইল ঘোরানোর প্রয়োজন নেই। তাছাড়া লাইসেন্স রিনিউ সংক্রান্ত অতিরিক্ত টাকা দাবির অভিযোগটি সম্পূর্ণ ভুয়া, কেননা রিনিউ বর্তমানে অনলাইনে করা হচ্ছে।’
টাকা না দিলে ফেল করানোর বিষয়ে তিনি বলেন, ‘খাতায় যদি পাশ থাকে কেউ ফেল করাবে না। তবে ফেল করা কাউকে পাশ করানোর সুযোগ থাকে, সেটা যে একদম কেউ করে না তাও বলছি না, ১৯-২০ থাকতে পারে।’
নিজের ও অধীনস্থ কর্মচারীদের বিষয়ে তিনি বলেন, ‘আমি তো আমার নিজের বিষয়ে ক্লিয়ারেন্স দিতে পারব, কিন্তু আমার সব স্টাফের বিষয়ে তো আমি দিতে পারব না। কারণ সবার পেছনে তো আমি থাকি না।’
অফিসের সকল কর্মকর্তা ঘুষের ভাগ পান কিনা এমন প্রশ্ন সরাসরি নাকচ করে তিনি দাবি করেন, এ ধরনের কোনো ভাগ বাটোয়ারা হওয়ার সুযোগ নেই। অনিয়ম রোধে সবাইকে সতর্ক করা হবে এবং মনিটরিং বাড়ানো হবে বলেও জানান এই কর্মকর্তা।
The post রাজশাহী বিআরটিএ অফিসে ঘুষ ছাড়া মেলে না সেবা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





