তালাবদ্ধ শিল্পকলা একাডেমি, থমকে মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক চর্চা
নেত্রকোনা: জারি, সারি, ধামাইল, ভাটিয়ালি, পালাগান, পদ্মপুরাণ পাঠ, পুঁথিপাঠ আর গেটুগানে একসময় মুখর থাকত নেত্রকোনার হাওর জনপদ মোহনগঞ্জ। সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন থেকে শুরু করে ঈদ-পূজা কিংবা বিভিন্ন উৎসব-প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিল স্থানীয় সংস্কৃতির নানা আয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে চলত নাটক, আবৃত্তি ও নৃত্যের আসর। সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের উৎসব ও বিনোদনের […] The post তালাবদ্ধ শিল্পকলা একাডেমি, থমকে মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক চর্চা first appeared on Sarabangla | Breaking New

নেত্রকোনা: জারি, সারি, ধামাইল, ভাটিয়ালি, পালাগান, পদ্মপুরাণ পাঠ, পুঁথিপাঠ আর গেটুগানে একসময় মুখর থাকত নেত্রকোনার হাওর জনপদ মোহনগঞ্জ। সামাজিক ও ধর্মীয় আয়োজন থেকে শুরু করে ঈদ-পূজা কিংবা বিভিন্ন উৎসব-প্রায় সব ক্ষেত্রেই ছিল স্থানীয় সংস্কৃতির নানা আয়োজন। পাশাপাশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও সাংস্কৃতিক সংগঠনগুলোর উদ্যোগে চলত নাটক, আবৃত্তি ও নৃত্যের আসর।
সময় বদলেছে। বদলেছে মানুষের উৎসব ও বিনোদনের ধরন। সেই সঙ্গে অনেকটাই স্তিমিত হয়ে এসেছে মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক চর্চা। দীর্ঘদিন ধরে তালাবদ্ধ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি। বন্ধ এর প্রশিক্ষণ ও সাংস্কৃতিক কার্যক্রম। একসময় যে ভবনে হারমোনিয়াম, কিবোর্ড, তবলা ও নানা বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শোনা যেত, এখন সেখানে নেই সেসবের কোনো চিহ্নও।
স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, আশির দশকে ‘শিল্পকলা পরিষদ’ নামে মোহনগঞ্জে প্রাতিষ্ঠানিকভাবে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের যাত্রা শুরু হয়। উপজেলা পরিষদের একটি হলরুমে এসব কার্যক্রম পরিচালিত হতো। উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা ছিলেন সভাপতি এবং স্থানীয় একজন সাংস্কৃতিক ব্যক্তিকে করা হতো সাধারণ সম্পাদক। পরে প্রতিষ্ঠানটি উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিতে রূপ নেয়।
নব্বইয়ের দশকে মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক অঙ্গন ছিল বেশ প্রাণবন্ত। বিভিন্ন সংগঠনের পাশাপাশি শিল্পকলা একাডেমির উদ্যোগে গান, তবলা, হারমোনিয়াম, নাটকসহ নানা কার্যক্রম চলত। স্থানীয় শিল্পীদের পাশাপাশি শিশু-কিশোরেরাও এসব আয়োজনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হতো।
স্থানীয়ভাবে গান, বাঁশি, তবলা ও হারমোনিয়াম শেখানোর ক্ষেত্রে ওস্তাদ গৌরাঙ্গ আদিত্য, হরিপদ সরকার, অমল সরকার, গোপাল সরকার, অমলেন্দু শর্মা, রুকুনুজ্জামান ও আরিফাসহ অনেকের অবদান রয়েছে বলে জানান সাংস্কৃতিক কর্মীরা। তাদের হাত ধরে গড়ে উঠেছিল স্থানীয় শিল্পীদের একটি প্রজন্ম।
তবে একসময় এসব কর্মকাণ্ডে ভাটা পড়ে। স্থানীয় সাংস্কৃতিক কর্মীরা জানান, ২০১০ সালের দিকে শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম প্রায় বন্ধ হয়ে যায়। এর প্রভাব পড়ে পুরো সাংস্কৃতিক অঙ্গনে। বন্ধ হয়ে যায় নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও আয়োজন।
২০১৮-১৯ সালের দিকে আবারও একাডেমির কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নেওয়া হয়েছিল। সে সময় একটি আহ্বায়ক কমিটি গঠন করে সাংস্কৃতিক ব্যক্তিত্ব অমল সরকারকে আহ্বায়ক করা হয়। শিক্ষার্থী ভর্তির কার্যক্রমও শুরু হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় সেই উদ্যোগ এগোয়নি।
ওস্তাদ অমল সরকার বলেন, ‘আমরা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম চালুর উদ্যোগ নিয়েছিলাম। ছাত্র ভর্তির ফরমও তৈরি করে ছাড়া হয়েছিল। এলাকায় সাড়া পাওয়া গেলেও শেষ পর্যন্ত প্রয়োজনীয় সরকারি সহযোগিতা না পাওয়ায় উদ্যোগটি এগিয়ে নেওয়া সম্ভব হয়নি।’
তার মতে, একাডেমি পরিচালনায় স্থানীয় শিল্পী ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের সম্পৃক্ত করা জরুরি। তিনি বলেন, স্থানীয় কর্মীদের যুক্ত করা গেলে আবারও ইতিবাচক পরিবর্তন আনা সম্ভব। প্রশাসন মূলত উৎসব আয়োজনের প্রশাসনিক ও নিরাপত্তার বিষয়গুলোতে ভূমিকা রাখতে পারে।
একসময় একাডেমিতে বেশ কিছু বাদ্যযন্ত্র ও সাংস্কৃতিক উপকরণ ছিল। স্থানীয়দের অভিযোগ, নজরদারির অভাবে সেসবের অনেক কিছুই হারিয়ে গেছে। কিছু বাদ্যযন্ত্র বিভিন্ন শিল্পীর বাড়িতে রয়েছে বলেও দাবি তাদের।
একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ থাকলেও বিভিন্ন সময়ে এর নামে সরকারি বরাদ্দ এসেছে বলে জানান সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। এসব অর্থ কোন খাতে, কীভাবে এবং কার মাধ্যমে ব্যয় হয়েছে, তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে। প্রতিবছর বরাদ্দের অর্থ উত্তোলনের পর ব্যয়ের লিখিত হিসাব ও প্রমাণাদি পাওয়া যায় না বলেও অভিযোগ রয়েছে।
২০২৪ সালের ৫ আগস্টের আগে পর্যন্ত স্থানীয় সাংস্কৃতিক সংগঠন সূর্যমুখী থিয়েটার শিল্পকলা একাডেমির একটি কক্ষ ব্যবহার করে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড পরিচালনা করত। ৫ আগস্টের পর সংগঠনটি ওই কক্ষ ছেড়ে অন্যত্র চলে যায়। এরপর সেখানে কোনো সংগঠনকে নিয়মিত অনুষ্ঠান বা মহড়া করতে দেখা যায়নি।
সূর্যমুখী থিয়েটারের সাধারণ সম্পাদক আরিফুল ইসলাম পিয়াস বলেন, সাম্প্রতিক সময়ে হাওরাঞ্চল মোহনগঞ্জে সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ড ক্রমেই কমে আসছে। কবি রইস মনরমের বাড়িতে সাপ্তাহিক সাংস্কৃতিক আয়োজন হলেও সেটিও আগের তুলনায় কমেছে।
কবি ও সাংস্কৃতিক সংগঠক রইস মনরম বলেন, ‘মাত্র কয়েক বছর আগেও মোহনগঞ্জ শিল্প-সংস্কৃতিতে অত্যন্ত উর্বর ছিল। অসংখ্য সাংস্কৃতিক সংগঠন ও শিল্পীর চর্চায় শহরটি মুখর থাকত। সময়ের ব্যবধানে সেই পরিবেশ হারিয়ে গেছে। তরুণদের মধ্যে শিল্প-সংস্কৃতির চর্চা বাড়ানো প্রয়োজন। এতে তাদের মানসিক বিকাশ ও মানবিক মূল্যবোধ গড়ে উঠবে।’
তবে গ্রামীণ জনপদে এখনো ঐতিহ্যের কিছু চর্চা টিকে আছে। খুরশিমুল গ্রামের পালাগানের ওস্তাদ গোপাল সরকার বলেন, ডিঙাপোতা হাওরের পাড়ের গ্রামগুলোতে এখনো মাসব্যাপী পদ্মপুরাণ পাঠের আসর বসে। বিয়ের উৎসবে নারীরা একত্র হয়ে হাততালি দিয়ে ধামাইল গানের আয়োজন করেন। তবে হাওরে দৌড়ের নৌকা, জারি, সারি ও পালাগানের মতো আয়োজন অনেকটাই হারিয়ে গেছে।
স্থানীয় গণমাধ্যমকর্মী সাইফুল আরিফ জুয়েল বলেন, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমিকে বাদ দিয়ে মোহনগঞ্জের সাহিত্য ও সংস্কৃতিচর্চা এগিয়ে নেওয়া কঠিন। এটি সাংস্কৃতিক কর্মকাণ্ডের প্রাণকেন্দ্র হতে পারে। এজন্য একাডেমি চালুর পাশাপাশি নিয়মিত উৎসব ও প্রশিক্ষণের ব্যবস্থা করে কার্যক্রমকে স্থায়ী রূপ দেওয়া প্রয়োজন।
বাউসী স্কুল অ্যান্ড কলেজের সহকারী অধ্যাপক বিজয় চন্দ্র দাস বলেন, মোহনগঞ্জে এখনো সাংস্কৃতিক সম্ভাবনা রয়েছে। হাওরের গ্রাম থেকে উপজেলা শহর পর্যন্ত জারি, সারি, ভাটিয়ালি, পালাগান, গেটুগান এবং মহুয়া, মলুয়া ও কৃষ্ণলীলার মতো ঐতিহ্যবাহী আয়োজন ফিরিয়ে আনা সম্ভব। এ ক্ষেত্রে উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি চালুর বিকল্প নেই।
মোহনগঞ্জ উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা আমেনা খাতুন বলেন, উপজেলা শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম দীর্ঘদিন ধরে বন্ধ। বিভিন্ন বাদ্যযন্ত্র ও উপকরণ কোথায় রাখা হয়েছে, সে বিষয়েও তিনি অবগত নন। তিনি বলেন, ‘২০২৪ সালের ৫ আগস্টের পর অনেক শিল্পকলা একাডেমির কার্যক্রম বন্ধ রয়েছে। বরাদ্দ ও উৎসব সম্পর্কে খোঁজখবর নেওয়া হবে। একাডেমি চালুর সিদ্ধান্ত ওপর থেকে আসতে পারে। আমরা আশাবাদী।’
সচেতন মহল ও সাংস্কৃতিক কর্মীদের দাবি, মোহনগঞ্জ উপজেলা শিল্পকলা একাডেমি শুধু একটি ভবন নয়, হাওরাঞ্চলের সাংস্কৃতিক চর্চার সম্ভাব্য প্রাণকেন্দ্র। এটি চালু করে তরুণদের সম্পৃক্ত করা, নিয়মিত প্রশিক্ষণ ও উৎসব আয়োজন করা গেলে হারিয়ে যেতে বসা লোকজ সংস্কৃতির অনেকটাই ফিরিয়ে আনা সম্ভব।
The post তালাবদ্ধ শিল্পকলা একাডেমি, থমকে মোহনগঞ্জের সাংস্কৃতিক চর্চা first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





