মারধর নিয়ে পাল্টাপাল্টি দাবি

বিটিসিএলে আটক যুবকের মৃত্যু

  • চুরির অভিযোগে যুবক আটক
  • মারধরের অভিযোগ অস্বীকার আনসারের
  • মরদেহ মর্গে, তদন্ত করছে পুলিশ

বিটিসিএলে আটক যুবকের মৃত্যু
৮ সেপ্টেম্বর, ২০২৬ ২২:১৩  

রাজধানীর তেজগাঁও শিল্পাঞ্চলের সাতরাস্তা এলাকায় বাংলাদেশ টেলিযোগাযোগ কোম্পানি লিমিটেডের (বিটিসিএল) কার্যালয়ে চুরির অভিযোগে আটক এক অজ্ঞাত যুবকের মৃত্যু হয়েছে। আনসার সদস্য ও বিটিসিএল কর্মীদের মারধরে তিনি গুরুতর আহত হয়ে মারা গেছেন বলে অভিযোগ উঠেছে। তবে ওই যুবককে আনসার সদস্যরা মারধর বা নির্যাতন করেছেন—এমন অভিযোগ অস্বীকার করেছে বাংলাদেশ আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী। তাদের দাবি, একপর্যায়ে পুরোনো টিনের চাল ভেঙে পড়ে ওই যুবক আহত হন এবং পরে তাকে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

৮ সেপ্টেম্বর, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড ও সাতরাস্তা সংলগ্ন বিটিসিএল কার্যালয়ের দেয়াল টপকে তিন যুবক ভেতরে প্রবেশ করেন বলে সংশ্লিষ্টরা জানান। তাদের চুরির উদ্দেশ্যে প্রবেশের সন্দেহে ধাওয়া করা হলে একজনকে আটক করা সম্ভব হয়। বাকি দুজন পালিয়ে যান।

বিটিসিএল কার্যালয়ের অফিস সহকারী মো. সাইফুল ও কেয়ারটেকার শওকত আলীর ভাষ্য, আটক যুবক পালানোর চেষ্টা করেন এবং এ সময় এক আনসার সদস্যের হাতে আঘাত করেন। পরে অফিসের কর্মী ও আনসার সদস্যরা তার হাত বেঁধে মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হয়ে অচেতন হয়ে পড়েন।

শওকত আলী বলেন, সকালে তিন যুবক দেয়াল টপকে চুরির উদ্দেশ্যে কার্যালয়ে ঢোকেন। পরে দায়িত্বে থাকা আনসার সদস্য ও অফিসকর্মীদের হাতে একজন ধরা পড়েন এবং অন্য দুজন পালিয়ে যান। ধরা পড়ার পর ওই যুবক একজন আনসার সদস্যের হাতে আঘাত করে পালানোর চেষ্টা করেন। এরপর অফিসকর্মী ও আনসার সদস্যরা তার হাত বেঁধে মারধর করেন। এতে তিনি গুরুতর আহত হন।

বিটিসিএলের অফিস সহকারী সাইফুল ইসলাম সাংবাদিকদের বলেন, সকালে অফিসে এসে তিনি জানতে পারেন, চুরি করতে আসা এক যুবককে আটক করা হয়েছে। তাকে আনসার ক্যাম্পে রাখা হয়। সেখানে আনসার সদস্যদের মারধরে ওই অজ্ঞাতপরিচয় যুবক অচেতন হয়ে পড়েন। পরে তাকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়।

অন্যদিকে আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী এক সংবাদ বিজ্ঞপ্তিতে জানিয়েছে, তেজগাঁওয়ের বিটিসিএল কার্যালয়ে চোর সন্দেহে এক যুবককে আটক করে আনসার সদস্যদের পিটিয়ে হত্যার অভিযোগে বিভিন্ন গণমাধ্যমে প্রকাশিত সংবাদ তাদের দৃষ্টিগোচর হয়েছে। বাহিনীর প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী, প্রকাশিত সংবাদে আনসার সদস্যদের বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ ভিত্তিহীন এবং প্রকৃত ঘটনার সঙ্গে অসঙ্গতিপূর্ণ।

আনসারের দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, মঙ্গলবার সকাল সাড়ে ৭টার দিকে তেজগাঁও টিঅ্যান্ডটি তার ভান্ডার এলাকায় কয়েকজন যুবক প্রবেশ করেন। দায়িত্বপ্রাপ্ত অঙ্গীভূত আনসার সদস্য শাহজামাল এক যুবককে চুরি করতে দেখে ধাওয়া করেন। পুরোনো টিনের চালের ওপর দিয়ে দৌড়ানোর একপর্যায়ে ওই যুবক চাল ভেঙে নিচে পড়ে যান।

পরে বিটিসিএলের স্টাফ মো. শওকত হোসেন তাকে আটক করেন। সংস্থার টেলিফোনিক নির্দেশে নিরাপত্তার দায়িত্বে থাকা অঙ্গীভূত আনসার সদস্যরা তাকে আটক করতে সহযোগিতা করেন।

//ডিবিটেক/টিবিএসপিএ/এসএমই/এমআইএস//

আনসার জানায়, ঘটনাস্থলে দায়িত্ব পালনকারী সদস্যদের মধ্যে পিসি নুরুল ইসলাম আটক যুবককে বিটিসিএল কর্তৃপক্ষের পিও সুলতান মাহমুদ এবং ইলেকট্রিশিয়ান সাইফুল ইসলামের কাছে হস্তান্তর করেন। এরপর আনসার সদস্যরা ঘটনাস্থল থেকে চলে যান।

বাহিনীর দাবি, আটক যুবককে আনসার ক্যাম্পে নিয়ে গিয়ে মারধর বা নির্যাতনের কোনো ঘটনা ঘটেনি। ফলে আনসার সদস্যদের মারধরের কারণে ওই যুবকের মৃত্যু হয়েছে—এমন প্রচারের সঙ্গে প্রকৃত ঘটনার কোনো সামঞ্জস্য নেই বলেও বিজ্ঞপ্তিতে উল্লেখ করা হয়।

আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনী আরও বলেছে, দায়িত্ব পালনের ক্ষেত্রে আইন, বিধি ও মানবিক মূল্যবোধের প্রতি তারা শ্রদ্ধাশীল। কোনো স্থাপনায় নিরাপত্তা ভঙ্গকারী ব্যক্তিকে যথাযথ আইনগত প্রক্রিয়ার মাধ্যমে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কাছে সোপর্দ করাই দায়িত্বপ্রাপ্ত সদস্যদের মূল কর্তব্য। এ ক্ষেত্রেও আটক ব্যক্তিকে সংশ্লিষ্ট সংস্থার দায়িত্বশীল ব্যক্তিদের কাছে হস্তান্তর করা হয়েছে।

তবে আনসারের এক সদস্যের বক্তব্য অনুযায়ী, ঘটনার সময় প্লাটুন কমান্ডার নুরুল ইসলাম সেখানে উপস্থিত ছিলেন। তিনি বর্তমানে ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের সঙ্গে ‘মিটিংয়ে আছেন’ বলে জানানো হয়। তার মোবাইল ফোনে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তিনি ফোন ধরেননি। পরে তিনি গণমাধ্যমকে জানান, আনসারের পাশাপাশি বিটিসিএল কর্মীরাও ‘চোরকে’ মারধর করেছেন। তারা প্রায়ই চোর ধরে বিটিসিএলকে জানালেও কর্তৃপক্ষ বিষয়টি পুলিশকে জানায়নি।

নুরুল ইসলামের ভাষ্য, তিনি গেটের দিকে ছিলেন। পরে হৈচৈ শুনে সেখানে গিয়ে একজনকে আটক অবস্থায় দেখতে পান। এর আগে-পরে কী হয়েছে, তা তিনি জানেন না বলে জানান।

ঘটনার পর গুরুতর আহত অবস্থায় ওই যুবককে বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে সিএনজিচালিত অটোরিকশায় ঢাকা মেডিকেল কলেজ (ঢামেক) হাসপাতালের জরুরি বিভাগে নেওয়া হয়। হাসপাতালের চিকিৎসক পরীক্ষা-নিরীক্ষা শেষে তাকে মৃত ঘোষণা করেন।

ঢামেক হাসপাতাল পুলিশ ক্যাম্পের ইনচার্জ পরিদর্শক মো. হাবিবুর রহমান জানান, আনুমানিক ২৫ বছর বয়সী ওই যুবককে অচেতন অবস্থায় হাসপাতালে নেওয়া হয়। পরীক্ষা-নিরীক্ষার পর বিকেল সাড়ে ৩টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মরদেহ হাসপাতালের মর্গে রাখা হয়েছে এবং বিষয়টি সংশ্লিষ্ট থানাকে জানানো হয়েছে।

পুলিশ সূত্র জানায়, নিহতের আঙুলের ছাপের মাধ্যমে জাতীয় পরিচয়পত্রের তথ্যভাণ্ডার থেকে তার নাম-ঠিকানা জানার চেষ্টা করা হচ্ছে। ঘটনার সময় কর্তব্যরত আনসার সদস্যদের এ বিষয়ে জিজ্ঞাসাবাদ করা হবে।

তেজগাঁও শিল্পাঞ্চল থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মোহাম্মদ মাহবুবুর রহমান বলেন, এমন একটি ঘটনার খবর পেয়ে পুলিশ ঘটনাস্থল ও হাসপাতালে যায়। কী ঘটেছে, তা বিস্তারিত জানার চেষ্টা চলছে। পরে প্রয়োজনীয় আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। তিনি জানান, এ বিষয়ে পরবর্তী বিস্তারিত তথ্য দেওয়া হবে।

সরেজমিনে দেখা যায়, তেজগাঁও ট্রাকস্ট্যান্ড সড়কের মাঝামাঝি পাবলিক টয়লেটের পাশে বিটিসিএলের কার্যালয়টি অবস্থিত। সেখানে ‘আনসার ও গ্রাম প্রতিরক্ষা বাহিনীর প্রস্তাবিত সদর দপ্তর’ লেখা একটি সাইনবোর্ডও রয়েছে। প্রধান ফটকে তিনজন আনসার সদস্যকে দায়িত্ব পালন করতে দেখা যায়। তবে তারা জানান, ঘটনার সময় তারা দায়িত্বে ছিলেন না। ওই সময় দায়িত্ব পালন করা সদস্যরা এখন বিশ্রামে রয়েছেন।

ঘটনাটি নিয়ে বিটিসিএল কর্মী ও আনসার সদস্যদের বক্তব্যে ভিন্নতা থাকায় বিষয়টি তদন্ত করে প্রকৃত ঘটনা ও মৃত্যুর কারণ নির্ধারণের অপেক্ষা করছে সংশ্লিষ্টরা।