ওপেনএআইয়ের অংশীদার হতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন

ওপেনএআইয়ের অংশীদার হতে যাচ্ছে ট্রাম্প প্রশাসন
৭ জুন, ২০২৬ ০৯:১৫  
৭ জুন, ২০২৬ ১১:১৮  

কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা এআই প্রযুক্তির অভূতপূর্ব বাণিজ্যিক সাফল্যকে সরাসরি মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের সাধারণ জনগণের কল্যাণে কাজে লাগাতে এক অভিনব ও ঐতিহাসিক পদক্ষেপ নিতে যাচ্ছে ডোনাল্ড ট্রাম্পের প্রশাসন। মার্কিন সরকার বিশ্বখ্যাত এআই গবেষণা প্রতিষ্ঠান এবং চ্যাটজিপিটির নির্মাতা ‘ওপেনএআই’-এর বড় অঙ্কের শেয়ার বা মালিকানা ক্রয়ের বিষয়ে আলোচনা শুরু করেছে। 

গত শুক্রবার মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প নিজেই বিভিন্ন শীর্ষস্থানীয় এআই প্রতিষ্ঠানের সাথে এমন একটি চুক্তি করার বিষয়ে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যার মাধ্যমে “আমেরিকার সাধারণ জনগণ সরাসরি এআই-এর এই জয়যাত্রার সুফল ভোগ করতে পারবে।”

প্রেসিডেন্ট ট্রাম্প তাঁর বক্তব্যে নির্দিষ্ট কোনো কোম্পানির নাম উল্লেখ না করলেও, প্রভাবশালী বৈশ্বিক সংবাদমাধ্যম সিএনবিসির এক বিশেষ প্রতিবেদনে নিশ্চিত করা হয়েছে যে—ট্রাম্প প্রশাসন ইতিমধ্যেই ওপেনএআই কর্তৃপক্ষের সাথে সরকারের অংশীদারিত্ব বা ইকুইটি নেওয়ার বিষয়ে আলোচনা অনেক দূর এগিয়ে নিয়েছে।

‘পাবলিক ওয়েলথ ফান্ড’ ও ট্রাম্পের রূপরেখা
সিএনবিসি জানিয়েছে, ওপেনএআই-এর এই সরকারি শেয়ারের লভ্যাংশ মূলত একটি বিশেষ ‘পাবলিক ওয়েলথ ফান্ড’ বা জনকল্যাণ তহবিল গঠনে ব্যবহার করা হবে, যার প্রস্তাব স্বয়ং ওপেনএআই-ই দিয়েছিল। কোম্পানির রূপরেখা অনুযায়ী, এই বিশেষ তহবিল থেকে অর্জিত মুনাফা সরাসরি দেশের সাধারণ নাগরিকদের মধ্যে বন্টন বা বিতরণ করা হতে পারে। এর ফলে সমাজে কারো প্রাথমিক সম্পদ বা পুঁজি থাকুক আর না থাকুক, প্রতিটি নাগরিকই এআই-চালিত অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির অংশীদার হতে পারবেন।

আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যম ব্লুমবার্গ-এর তথ্য অনুযায়ী, মার্কিন রাষ্ট্রপতির সরকারি বিমান ‘এয়ার ফোর্স ওয়ান’-এ সাংবাদিকেরা যখন ট্রাম্পকে এই পরিকল্পনার বিষয়ে প্রশ্ন করেন, তখন তিনি ইতিবাচক সাড়া দিয়ে বলেন, “আমি বেশ কয়েকজন এআই নির্বাহীর সাথে এমন কিছু ধারণা বা কনসেপ্ট নিয়ে কথা বলছি, যেখানে এই কোম্পানিগুলোর কিছু অংশ আমেরিকার সাধারণ জনগণকে দিয়ে দেওয়া যায়। এর ফলে মার্কিন জনগণ মূলত এই দূরদর্শী কোম্পানিগুলোর অংশীদার বা পার্টনারে পরিণত হবে।” উল্লেখ্য, ওপেনএআই-এর প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা স্যাম অল্টম্যানও গত ২০২৫ সালের শুরু থেকেই বড় বড় এআই কোম্পানিগুলোতে সরকারের অংশীদারিত্ব বা স্টেক থাকার এই ধারণার পক্ষে বিভিন্ন মহলে আলোচনা চালিয়ে আসছিলেন।

ট্রাম্পের ব্যবসায়িক দর্শন ও বার্নি স্যান্ডার্সের নীতি
লাভজনক বা ফর-প্রফিট বেসরকারি কোম্পানিতে সরকারের এই মালিকানা নেওয়ার বিষয়টি ট্রাম্পের বর্তমান অর্থনৈতিক দর্শনের সাথে বেশ মিলে যায়। এর বড় প্রমাণ মিলেছিল গত বছর, যখন ব্যবসায়িক সংকটে পড়া মার্কিন চিপ নির্মাতা প্রতিষ্ঠান ‘ইন্টেল’-কে বাঁচাতে মার্কিন সরকার প্রতিষ্ঠানটির ১০ শতাংশ শেয়ার বা মালিকানা নিজেদের নিয়ন্ত্রণে নিয়েছিল।

চমকপ্রদ বিষয় হলো, ট্রাম্পের এই চিন্তাভাবনা যুক্তরাষ্ট্রের সমাজতান্ত্রিক ধারার বামপন্থী রাজনৈতিক নেতা এবং সিনেটর বার্নি স্যান্ডার্সেরও সমর্থন পাচ্ছে। চলতি সপ্তাহেই সিনেটর স্যান্ডার্স একটি নতুন নীতি প্রস্তাব করেছেন, যেখানে ওপেনএআই, অ্যানথ্রোপিক এবং এক্সএআই (যা বর্তমানে স্পেসএক্সের অংশ)-এর মতো শীর্ষস্থানীয় এআই কোম্পানিগুলোর ওপর এককালীন ৫০ শতাংশ বিশেষ ট্যাক্স বা কর আরোপের কথা বলা হয়েছে। তবে এই ট্যাক্স নগদে নয়, বরং কোম্পানির ‘স্টক’ বা শেয়ার আকারে সরকারকে দিতে হবে। 

চলতি ২০২৬ সালের মধ্যেই এই মেগা এআই কোম্পানিগুলোর শেয়ার বাজারে আসার জোর গুঞ্জন রয়েছে। এই পরিস্থিতিতে স্যান্ডার্স যুক্তি দেন, এই ট্যাক্সের মাধ্যমে এই প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে জনগণের একটি সরাসরি ভূমিকা তৈরি হবে এবং এআই থেকে উৎপাদিত সম্ভাব্য ট্রিলিয়ন ট্রিলিয়ন ডলারের মুনাফা অল্প কয়েকজন পুঁজিপতির পকেটে না গিয়ে সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার মান উন্নয়নে নিশ্চিতভাবে ব্যবহার করা যাবে।

সমালোচনা ও ‘গভর্নমেন্ট বেলআউট’-এর গুঞ্জন
তবে এই মহাপরিকল্পনা নিয়ে মার্কিন সিলিকন ভ্যালির অন্দরে তীব্র বিতর্ক ও সমালোচনাও শুরু হয়েছে। ট্রাম্পের সাবেক এআই ও ক্রিপ্টো উপদেষ্টা (যিনি সম্প্রতি পদত্যাগ করে প্রেসিডেন্টের বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি উপদেষ্টা কাউন্সিলের কো-চেয়ারম্যানের দায়িত্ব নিয়েছেন) ডেভিড স্যাক্স সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে লিখেছেন, তিনি বুঝতে পারছেন কেন বার্নি স্যান্ডার্সের এই আইডিয়া ডান-বাম সব রাজনৈতিক মহলেই সাড়া ফেলছে। তবে তিনি হুঁশিয়ারি দিয়ে বলেন, “এটি মূলত করপোরেট ও সরকারের মধ্যকার এমন এক বিপজ্জনক সংমিশ্রণকে ত্বরান্বিত করবে, যার দিকে আমরা ইতিমধ্যেই ধাবিত হচ্ছি।”

অন্যদিকে, টেক পাড়ায় ভিন্ন এক গুঞ্জন ছড়িয়েছেন মাইক্রোসফটের সাবেক কর্মকর্তা ডেয়ার ওবাসানজো। সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এক পোস্টে তিনি মন্তব্য করেছেন, “আসলে পর্দার আড়ালে আর্থিক সংকটে পড়তে যাওয়া ওপেনএআই-কে সরকারি তহবিল দিয়ে বাঁচানোর একটি সুক্ষ্ম পটভূমি তৈরি করা হচ্ছে।” ট্রাম্পের এই সম্ভাব্য এআই চুক্তি মার্কিন অর্থনীতিকে এক নতুন সমাজতান্ত্রিক পুঁজিবাদের দিকে নিয়ে যাবে, নাকি এটি ওপেনএআই-এর জন্য বড় কোনো চাল, তা নিয়ে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মাঝে চুলচেরা বিশ্লেষণ চলছে।

ডিবিটেক/বিএমটি    ।    সূত্র: টেকক্রাঞ্চ