পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক যাত্রা

পারমাণবিক বিদ্যুতের যুগে বাংলাদেশের ঐতিহাসিক যাত্রা
২৮ এপ্রিল, ২০২৬ ০০:০৭  

দীর্ঘ এক দশকের প্রস্তুতির পর অবশেষে পারমাণবিক বিদ্যুৎ উৎপাদনের দ্বারপ্রান্তে পৌঁছেছে বাংলাদেশ। পাবনার ঈশ্বরদীতে পদ্মা নদীর তীরে নির্মিত রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র-এর প্রথম ইউনিটে আজ শুরু হচ্ছে ইউরেনিয়াম জ্বালানি লোডিং কার্যক্রম। এর মধ্য দিয়ে পারমাণবিক শক্তি ব্যবহারকারী বিশ্বের ৩৩তম দেশ হিসেবে নতুন অধ্যায়ে প্রবেশ করছে বাংলাদেশ।

আগস্টে পরীক্ষামূলকভাবে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রী ফকির মাহবুব জানিয়েছেন, আগামী আগস্ট মাসের মাঝামাঝি সময়ের মধ্যে রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র থেকে ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ পরীক্ষামূলকভাবে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

অন্যদিকে নিউক্লিয়ার পাওয়ার কোম্পানি বাংলাদেশ লিমিটেড-এর ব্যবস্থাপনা পরিচালক ড. জাহেদুল হাসান বলেন, আন্তর্জাতিক গাইডলাইন অনুযায়ী নিরাপত্তা ও কারিগরি মানদণ্ড বজায় রাখা ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। তবে সব বাধা কাটিয়ে রূপপুরের প্রথম ইউনিট এখন জ্বালানি লোডিংয়ের জন্য সম্পূর্ণ প্রস্তুত।

কমিশনিং লাইসেন্সের পর চূড়ান্ত প্রস্তুতি

গত ১৬ এপ্রিল পারমাণবিক চুল্লিতে জ্বালানি প্রবেশের কমিশনিং লাইসেন্স পাওয়ার পর প্রয়োজনীয় সব প্রস্তুতি সম্পন্ন করা হয়। আন্তর্জাতিক নিরাপত্তা নির্দেশিকা ও কারিগরি শর্ত পূরণে একাধিকবার সময়সূচি পেছালেও এবার আনুষ্ঠানিকভাবে শুরু হচ্ছে জ্বালানি লোডিং।

বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি মন্ত্রণালয়ের সচিব মো. আনোয়ার হোসেন জানিয়েছেন, প্রথম ইউনিটে জ্বালানি লোডিং শেষ হতে প্রায় ৪৫ দিন সময় লাগবে। এরপর ধাপে ধাপে বিদ্যুৎ উৎপাদন শুরু হয়ে জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে।

কতটুকু বিদ্যুৎ মিলবে?

প্রথম ধাপে প্রায় ৩০০ মেগাওয়াট বিদ্যুৎ জাতীয় গ্রিডে যুক্ত হবে। পরে প্রথম ইউনিট পূর্ণ সক্ষমতায় গেলে উৎপাদন হবে ১,২০০ মেগাওয়াট।

দুটি ইউনিট পুরোপুরি চালু হলে মোট উৎপাদন দাঁড়াবে ২,৪০০ মেগাওয়াটে, যা দেশের মোট বিদ্যুৎ চাহিদার ১০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করতে সক্ষম হবে।

ব্যয় ও প্রযুক্তি

রূপপুর পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্র নির্মাণে ব্যয় হয়েছে প্রায় ১২ দশমিক ৬৫ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। রাশিয়া-র সহায়তায় নির্মিত এ প্রকল্পে ব্যবহার করা হয়েছে অত্যাধুনিক VVER-1200 রিয়্যাক্টর, যা তৃতীয় প্রজন্মের নিরাপদ পারমাণবিক প্রযুক্তির একটি মডেল হিসেবে বিবেচিত।

দেশীয় দক্ষ জনশক্তির অগ্রগতি

এই প্রকল্পে অংশ নিতে ইতোমধ্যে ৫৯ জন বাংলাদেশি বিশেষজ্ঞ অপারেটিং লাইসেন্স অর্জন করেছেন। এটি দেশের পারমাণবিক সক্ষমতা বৃদ্ধির ক্ষেত্রে বড় অর্জন হিসেবে দেখা হচ্ছে।

কী এই ইউরেনিয়াম জ্বালানি?

তেল, গ্যাস বা কয়লার মতো জীবাশ্ম জ্বালানি নয়—রূপপুরের প্রধান চালিকাশক্তি ইউরেনিয়াম। পারমাণবিক বিদ্যুৎকেন্দ্রে ব্যবহৃত জ্বালানির মূল উপাদান হলো ক্ষুদ্র আকৃতির ইউরেনিয়াম পেলেট, যা মূলত ইউরেনিয়াম-২৩৫ সমৃদ্ধ ধাতব পদার্থ।

এই পেলেটগুলো নিশ্ছিদ্র ধাতব নলের মধ্যে রাখা হয়, যাকে বলা হয় ফুয়েল রড। অনেকগুলো ফুয়েল রড একত্রে তৈরি করে ফুয়েল অ্যাসেম্বলি। প্রতিটি অ্যাসেম্বলি সাধারণত সাড়ে তিন থেকে সাড়ে চার মিটার দীর্ঘ হয়।

১,২০০ মেগাওয়াট ক্ষমতার একটি রিয়্যাক্টরে মোট ১৬৩টি ফুয়েল অ্যাসেম্বলি ব্যবহার করা হবে।

কীভাবে বিদ্যুৎ তৈরি হয়?

পারমাণবিক জ্বালানি তেল বা কয়লার মতো পোড়ানো হয় না। বরং চুল্লির ভেতরে নিউক্লিয়ার ফিশন প্রক্রিয়ায় ইউরেনিয়ামের নিউক্লিয়াস ভেঙে বিপুল তাপশক্তি উৎপন্ন করা হয়।

E=mc^2

এই তাপ দিয়ে পানি গরম করে বাষ্প তৈরি করা হয়। বাষ্পের চাপ টারবাইন ঘোরায়, আর টারবাইনের সঙ্গে যুক্ত জেনারেটর বিদ্যুৎ উৎপাদন করে।

কতটা শক্তিশালী ইউরেনিয়াম?

মাত্র সাড়ে চার গ্রাম ওজনের একটি ইউরেনিয়াম পেলেট যে পরিমাণ বিদ্যুৎ উৎপাদন করতে পারে, তার জন্য প্রয়োজন হয় প্রায়:

৪০০ কেজি কয়লা, অথবা ৩৬০ ঘনমিটার গ্যাস

নতুন যুগের সূচনা

রূপপুরে ইউরেনিয়াম লোডিং শুধু একটি প্রযুক্তিগত কার্যক্রম নয়, এটি বাংলাদেশের জ্বালানি নিরাপত্তা, শিল্পায়ন এবং আধুনিক প্রযুক্তি সক্ষমতার প্রতীক। দীর্ঘ প্রতীক্ষার পর দেশের বিদ্যুৎ খাতে নতুন যুগের সূচনা হতে যাচ্ছে পদ্মা তীরের এই প্রকল্প ঘিরে।

ডিবিটেক/আইএইচ/ইকে