যে যুদ্ধ আমরা দেখছি না

মানবজ্ঞান, এআই এবং ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?

বাংলাদেশ প্রেক্ষাপট

মানবজ্ঞান, এআই এবং ভবিষ্যতের নিয়ন্ত্রণ কার হাতে?
১৮ মার্চ, ২০২৬ ০৪:২০  
১৮ মার্চ, ২০২৬ ০৫:২৯  

প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে আমরা কি নিজের ভাষায়, নিজের বাস্তবতায়, নিজের সামাজিক বোধে চিন্তা করার অধিকার ধরে রাখতে পারব? বাংলাদেশের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: আমরা কি বৈশ্বিক এআইয়ের কেবল বাজার হব, নাকি নিজেদের জ্ঞান-ভিত্তি, ভাষা ও জনস্বার্থ রক্ষা করে অংশীদার হব? সময় এখনও আছে। কিন্তু সময় খুব বেশি নেই।*

মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ, ক্ষেপণাস্ত্র, ভূরাজনীতি, জোটের হিসাব এবং জ্বালানি-রাজনীতি এখন বিশ্বআলোচনার কেন্দ্রে। কিন্তু এই উচ্চকণ্ঠ সময়ের আড়ালে আরেকটি নীরব সংঘাত দ্রুত ঘনীভূত হচ্ছে, যার প্রভাব বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আরও গভীর হতে পারে। সেটি হলো মানববুদ্ধিমত্তা, মানবজ্ঞান এবং মানব-এজেন্সির ভবিষ্যৎ নিয়ে লড়াই। সম্প্রতি ব্ল্যাকরকের ইউএস ইনফ্রাস্ট্রাকচার সামিটে ওপেনএআইয়ের প্রধান নির্বাহী স্যাম অল্টম্যান এআইকে এমন এক সেবায় রূপ নেওয়ার কথা বলেন, যা বিদ্যুৎ বা পানির মতো মিটার ধরে কেনা যাবে। এই বক্তব্য কেবল ব্যবসায়িক মডেলের ইঙ্গিত নয়; এটি এমন এক পৃথিবীর আভাস, যেখানে চিন্তার সক্ষমতাও ধীরে ধীরে করপোরেট অবকাঠামোয় আবদ্ধ হতে পারে। 

প্রশ্ন হলো, বাংলাদেশ কি এই পরিবর্তনকে শুধু প্রযুক্তিগত অগ্রগতি হিসেবে দেখবে, নাকি এটিকে জ্ঞান, ভাষা, নীতি এবং সার্বভৌমত্বের প্রশ্ন হিসেবে নেবে? কারণ এআই যদি কেবল কয়েকটি বৈশ্বিক প্ল্যাটফর্মের সেবা হয়ে ওঠে, তাহলে উন্নয়নশীল দেশগুলো খুব সহজেই ব্যবহারকারী থাকবে, কিন্তু নির্মাতা হবে না; গ্রাহক থাকবে, কিন্তু নিয়ন্ত্রক হবে না। তখন জ্ঞান আর কেবল মুক্ত মানবিক সম্পদ থাকবে না, বরং তা হবে ভাড়া নেওয়া সক্ষমতা। বাংলাদেশের জন্য এই আশঙ্কা বিমূর্ত নয়। দেশের নিজস্ব খসড়া National Artificial Intelligence Policy 2026-2030-এই “digital sovereignty” বা ডিজিটাল সার্বভৌমত্বকে একটি মূল নীতি হিসেবে ধরা হয়েছে, এবং সরকারি নথিতেই স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে যে বাংলাদেশকে তার গুরুত্বপূর্ণ ডেটা, ডিজিটাল অবকাঠামো এবং এআই সিস্টেমের ওপর কার্যকর নিয়ন্ত্রণ রাখতে হবে।
 
এখানেই বিষয়টি গুরুতর। কারণ বাংলাদেশের রাষ্ট্রীয় নীতিনির্ধারকেরাও বুঝতে শুরু করেছেন যে এআই কেবল কোড, চ্যাটবট বা অটোমেশন নয়; এটি ক্ষমতার নতুন বিন্যাস। খসড়া নীতিতে ভাষাগত ও সাংস্কৃতিক বৈচিত্র্যকে দেশের ডিজিটাল ভবিষ্যতের কেন্দ্রীয় উপাদান হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। সেখানে স্পষ্টভাবে বলা হয়েছে, এআই মডেল, ডেটাসেট ও ডিজিটাল সেবায় বাংলা এবং অন্যান্য জাতীয়ভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভাষাকে যথাযথ গুরুত্ব দিতে হবে, যাতে প্রযুক্তি অন্তর্ভুক্তিমূলক ও প্রাসঙ্গিক হয়। শুধু তা-ই নয়, নীতিপত্রে একটি রাষ্ট্র-নেতৃত্বাধীন জাতীয় বাংলা ভাষা মডেল উন্নয়নের কথাও বলা হয়েছে। অর্থাৎ বাংলাদেশ ইতোমধ্যে বুঝেছে, ভাষার প্রশ্ন এআই যুগে কেবল সংস্কৃতির প্রশ্ন নয়, ক্ষমতারও প্রশ্ন। 

কিন্তু নীতি-স্বীকৃতি আর বাস্তব প্রস্তুতি এক বিষয় নয়। UNESCO-সমর্থিত বাংলাদেশের AI Readiness Assessment দেখাচ্ছে, দেশে মোবাইল বিস্তার অনেক হলেও জনসংখ্যার মাত্র ৪৪.৫ শতাংশ ইন্টারনেট ব্যবহার করে। শহরে ইন্টারনেট ব্যবহার প্রায় ৬৬.৮ শতাংশ, গ্রামে মাত্র ২৯.৭ শতাংশ। শহরাঞ্চলে পুরুষ ব্যবহারকারী ৭১.৩ শতাংশ, নারী ৬২.৪ শতাংশ; গ্রামে পুরুষ ৩৬.৬ শতাংশ, নারী মাত্র ২৩ শতাংশ। একই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গ্রামীণ এলাকায় অবকাঠামোগত দুর্বলতা ও ঘন ঘন বিদ্যুৎ-সমস্যা এখনও বড় বাধা। আবার কম্পিউটিং সক্ষমতার দিক থেকে বাংলাদেশ ৭৬ দেশের মধ্যে colocation data centre সক্ষমতায় ৭৩তম স্থানে। অর্থাৎ আমরা এমন এক সময়ে এআই নিয়ে কথা বলছি, যখন দেশের বড় অংশ এখনও মৌলিক ডিজিটাল সমতার বাইরে। 

এই বাস্তবতায় সবচেয়ে বড় বিপদ হচ্ছে, বাংলাদেশ যেন “ডিজিটাল অংশগ্রহণ” আর “জ্ঞানগত স্বায়ত্তশাসন”কে এক জিনিস মনে না করে। হাতে স্মার্টফোন থাকা মানেই জ্ঞানের ওপর নিয়ন্ত্রণ থাকা নয়। ChatGPT, Gemini, Copilot বা ভবিষ্যতের অন্য কোনো শক্তিশালী এআই ব্যবহার করা মানেই এই নয় যে আমরা জ্ঞান-উৎপাদনের অংশীদার। বরং উল্টোটা ঘটতেও পারে: আমরা এমন সব মডেলের ভোক্তা হয়ে উঠতে পারি, যেগুলো আমাদের ভাষা, সমাজ, আইনি বাস্তবতা, স্থানীয় অর্থনীতি, আঞ্চলিক ইতিহাস, ধর্মীয় সংবেদনশীলতা বা গ্রামীণ অভিজ্ঞতা যথাযথভাবে বোঝেই না। তখন এআই আমাদের সহায়ক হবে না; আমাদের হয়ে ব্যাখ্যা করতে শুরু করবে। আর যে সমাজ নিজের বাস্তবতাকে নিজের ভাষায় ব্যাখ্যা করতে পারে না, সে সমাজ ধীরে ধীরে অন্যের অ্যালগরিদমিক দৃষ্টিভঙ্গির অধীন হয়ে পড়ে।

বাংলাদেশের ক্ষেত্রে এই ঝুঁকি আরও স্পষ্ট, কারণ UNESCO-র মূল্যায়ন বলছে বাংলা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় এআই উন্নয়নে আরও বড় মনোযোগ দরকার। একই প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে, উন্মুক্ত ও বৈচিত্র্যময় ডেটাসেটের অভাবে বাংলায় এআইয়ের আউটপুট এখনও দুর্বল; ইংরেজি থেকে বাংলায় ডেটা বা কনটেন্ট রূপান্তরও প্রায়ই নিম্নমানের ফল দেয়। এর মানে খুব সরল: যদি আমাদের ভাষাগত অবকাঠামো দুর্বল থাকে, তাহলে ভবিষ্যতের জ্ঞান-অর্থনীতিতে বাংলা ভাষাভাষী জনগোষ্ঠী ব্যবহারকারী হিসেবে থাকবে, কিন্তু মানদণ্ড নির্ধারণকারী হিসেবে নয়। তখন ভুল অনুবাদ, সাংস্কৃতিক অসামঞ্জস্য, তথ্যবিকৃতি এবং নীতিগত ভুলব্যাখ্যা কেবল প্রযুক্তিগত সমস্যা থাকবে না, তা হয়ে উঠবে গণতান্ত্রিক ও সামাজিক সমস্যা। 

শিক্ষা খাতও এই প্রশ্ন থেকে আলাদা নয়। UNESCO-র তথ্য অনুযায়ী, নিম্ন মাধ্যমিক ও মাধ্যমিক বিদ্যালয়ের সামান্য বেশি অংশে কেবল শিক্ষামূলক কাজে ইন্টারনেট পৌঁছেছে। অর্থাৎ এআই-নির্ভর শিক্ষা বা জ্ঞান-অর্থনীতি নিয়ে বড় স্বপ্ন দেখার আগে আমাদের দেখতে হবে, স্কুলপর্যায়ে অবকাঠামোর বাস্তব ভিত্তি কতটা শক্ত। যদি প্রাথমিক শিক্ষার্থী, গ্রামীণ তরুণ, নারী, প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং বাংলা-মাধ্যমের শিক্ষার্থী এআই সাক্ষরতার বাইরে থাকে, তাহলে এআই কেবল নতুন দক্ষতা দেবে না, নতুন বৈষম্যও তৈরি করবে। ভবিষ্যতের শ্রমবাজারে তখন যারা অ্যালগরিদম বুঝবে তারা এগোবে, আর যারা শুধু তার ফল ভোগ করবে তারা পিছিয়ে পড়বে। 

তাই বাংলাদেশের সামনে প্রকৃত প্রশ্ন এআই গ্রহণ করা হবে কি হবে না, সেটি নয়। প্রকৃত প্রশ্ন হলো: কী ধরনের এআই, কার শাসনে, কার ভাষায়, কার জবাবদিহির মধ্যে। এখানে দুটি ভুল থেকে সমানভাবে দূরে থাকতে হবে। প্রথম ভুল হলো প্রযুক্তিকে অন্ধভাবে মুক্তির মন্ত্র হিসেবে দেখা। দ্বিতীয় ভুল হলো এআইকে ভয় পেয়ে সম্পূর্ণ প্রত্যাখ্যান করা। বাংলাদেশের প্রয়োজন তৃতীয় পথ: মানবকেন্দ্রিক, বাংলা-সমর্থিত, স্বচ্ছ, জবাবদিহিমূলক এবং জনস্বার্থনির্ভর এআই গড়ে তোলা। UNESCO-র readiness assessment-ও এই দিকেই ইঙ্গিত করেছে। তারা বাংলাদেশের জন্য একটি অন্তর্ভুক্তিমূলক জাতীয় এআই নীতি চূড়ান্ত করা, ডেটা সুরক্ষা ও সাইবার কাঠামো শক্তিশালী করা, বাংলা ও ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর ভাষায় ডেটাসেট গড়ে তোলা, জনসচেতনতা বাড়ানো, মেয়েদের ও নারীদের অন্তর্ভুক্ত করে দক্ষতা উন্নয়ন, এবং গবেষণা ও অবকাঠামোয় বিনিয়োগ বৃদ্ধির সুপারিশ করেছে। 

এখানে রাষ্ট্রের কাজ শুধু আইন করা নয়। বিশ্ববিদ্যালয়কে গবেষণা করতে হবে। নাগরিকসমাজকে অ্যালগরিদমিক জবাবদিহি নিয়ে কথা বলতে হবে। বাংলা ভাষা প্রযুক্তিকে জাতীয় অগ্রাধিকার করতে হবে। সরকারি ক্রয়ে এআই ব্যবহারের নিয়ম স্বচ্ছ করতে হবে। আদালত, প্রশাসন, স্বাস্থ্যসেবা, শিক্ষা, কৃষি পরামর্শ বা সামাজিক সুরক্ষা ব্যবস্থায় এআই ব্যবহৃত হলে মানুষকে জানতে হবে কোন সিদ্ধান্ত মানুষ নিয়েছে, কোনটি মেশিনের সুপারিশ, আর আপিলের পথ কোথায়। নইলে “smart governance” খুব সহজেই “opaque governance”-এ পরিণত হবে। আর সেটিই হবে মানব-এজেন্সির ক্ষয়।

বাংলাদেশের জন্য এ লড়াই তাই মূলত তিনটি বিষয় নিয়ে: ভাষা, স্বাধীনতা এবং ন্যায্যতা। ভাষা, কারণ বাংলা ও স্থানীয় জ্ঞানকে বাদ দিয়ে কোনো এআই ভবিষ্যৎ ন্যায়সংগত হতে পারে না। স্বাধীনতা, কারণ চিন্তার ক্ষমতা যদি কেবল বাইরের প্ল্যাটফর্মের ওপর নির্ভরশীল হয়, তাহলে ডিজিটাল সার্বভৌমত্ব কাগজে থাকবে, বাস্তবে নয়। ন্যায্যতা, কারণ এআইয়ের সুফল যদি শহুরে, ইংরেজি-দক্ষ, প্রযুক্তি-সুবিধাভোগী শ্রেণির হাতে কেন্দ্রীভূত হয়, তাহলে এটি উন্নয়ন নয়, বৈষম্যের নতুন স্থাপত্য হবে।
মধ্যপ্রাচ্যের যুদ্ধ একদিন না একদিন কোনো রাজনৈতিক সমাপ্তির দিকে যাবে। কিন্তু মানবজ্ঞান, ভাষা ও বিচারক্ষমতার ওপর নিয়ন্ত্রণের এই লড়াই আরও দীর্ঘ, আরও সূক্ষ্ম, এবং বাংলাদেশের মতো দেশের জন্য আরও নির্ধারক। 

কারণ এখানে প্রশ্ন শুধু কে প্রযুক্তি বানাবে, তা নয়; প্রশ্ন হলো, ভবিষ্যতে আমরা কি নিজের ভাষায়, নিজের বাস্তবতায়, নিজের সামাজিক বোধে চিন্তা করার অধিকার ধরে রাখতে পারব? বাংলাদেশের এখনই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: আমরা কি বৈশ্বিক এআইয়ের কেবল বাজার হব, নাকি নিজেদের জ্ঞান-ভিত্তি, ভাষা ও জনস্বার্থ রক্ষা করে অংশীদার হব? সময় এখনও আছে। কিন্তু সময় খুব বেশি নেই।                                        


লেখকঃ ডিজিটাল গণতন্ত্র বিশেষজ্ঞ | প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা | বাংলাদেশ এনজিওস নেটওয়ার্ক ফর রেডিও অ্যান্ড কমিউনিকেশন (বিএনএনআরসি)| বাংলাদেশের জন্য দায়িত্বশীল কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ও অ্যান্টিমাইক্রোবিয়াল রেজিস্ট্যান্স (AMR) বিষয়ক অ্যাম্বাসেডর


দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।