অনেক আইসিটি পার্ক এখন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দিয়ে দারোয়ানদের বেতন চালাতে হচ্ছে
একদিকে অনেক আইসিটি পার্ক এখন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দিয়ে দারোয়ানদের বেতন চালাতে হচ্ছে অন্যদিকে মিন্টো রোডে সরকারি সচিবদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটগুলোর সুযোগ-সুবিধা এতটাই বিলাসবহুল যে তা অভিজাত হোটেলকেও হার মানায়।
২২ জানুয়ারি, বৃহস্পতিবার রাজধানী ঢাকার সিরডাপ মিলনায়তনে ‘অর্থনৈতিক শাসন ও দুর্নীতি প্রতিরোধ’ শীর্ষক এ নীতি সংলাপে অংশ নিয়ে এমন চিত্র তুলে ধরেন গবেষণা প্রতিষ্ঠান পাওয়ার অ্যান্ড পার্টিসিপেশন রিসার্চ সেন্টারের (পিপিআরসি) নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান।
সংলাপটির আয়োজন করে গবেষণা প্রতিষ্ঠান সেন্টার ফর গভর্ন্যান্স স্টাডিজ (সিজিএস)। সিজিএসের প্রেসিডেন্ট জিল্লুর রহমানের সভাপতিত্বে অনুষ্ঠানে আলোচনা করেন রিসার্চ অ্যান্ড পলিসি ইন্টিগ্রেশন ফর ডেভেলপমেন্টের (র্যাপিড) নির্বাহী পরিচালক এম আবু ইউসুফ, ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক, বিএনপির ভাইস চেয়ারম্যান আসাদুজ্জামান রিপন, চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশনের সাবেক মেয়র মাহমুদুল ইসলাম চৌধুরী, বাংলাদেশ চেম্বার অব ইন্ডাস্ট্রিজের (বিসিআই) সাবেক সভাপতি শাহেদুল ইসলাম হেলাল।
আরও বক্তব্য দেন ইউনিভার্সিটি অব এশিয়া প্যাসিফিকের স্কুল অব বিজনেসের ডিন এম এ বাকী খলিলী, রিকন্ডিশন্ড গাড়ি ব্যবসায়ীদের সংগঠন বারভিডার সভাপতি আবদুল হক, জাপান বাংলাদেশ ফ্রেন্ডশিপ হাসপাতালের চেয়ারম্যান সরদার এ নাঈম ও ব্যবসায়ী নেতা শাহদাত হোসেন। অনুষ্ঠান সঞ্চালনা করেন সিজিএসের নির্বাহী পরিচালক পারভেজ করিম আব্বাসী।
অনুষ্ঠানে আসন্ন জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে আর্থিক খাতে সুশাসন নিশ্চিত করা, ব্যাংকিং খাত সংস্কার, দুর্নীতির মূল উৎপাটন এবং স্বচ্ছ ও জবাবদিহিমূলক অর্থনৈতিক কাঠামো গঠনের বিভিন্ন দিক নিয়ে আলোচনা হয়। ব্যাংকিং ও ইন্স্যুরেন্স খাত প্রসঙ্গে বক্তারা বলেন, এসব খাতে ডিপলিটিসাইজেশন, স্বাধীন রেগুলেটরি প্রতিষ্ঠান এবং আইনি সংস্কার ছাড়া সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়।
সংলাপে স্বার্থের দ্বন্দ্বে রাষ্ট্রীয় দুর্নীতি ও হয়রানি সিস্টেম্যাটিক (নিয়মতান্ত্রিক) হয়ে গেছে মন্তব্য করে ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প প্রসঙ্গ টেনে পিপিআরসির নির্বাহী চেয়ারম্যান ড. হোসেন জিল্লুর রহমান বলেন, বলেছেন, অনেক আইসিটি পার্ক এখন কমিউনিটি সেন্টার হিসেবে ভাড়া দিয়ে দারোয়ানদের বেতন চালাতে হচ্ছে। এসব প্রকল্পের মানসিকতা রাষ্ট্রীয় চিন্তার মধ্যে ক্যানসারের মতো ছড়িয়ে পড়েছে।
‘বর্তমানে রাষ্ট্রীয় কাঠামোয় কয়েকটি গুরুতর অদক্ষতা দানা বেঁধে আছে। এর একটি হলো অর্থায়ন–সংকট। দ্বিতীয়টি সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এবং আরেকটি হলো ক্ষমতাবানদের অহমিকা দেখানোর প্রকল্প’- যোগ করেন তিনি। বলেন, রাজধানীর মিন্টো রোডে সরকারি সচিবদের জন্য নির্মিত ফ্ল্যাটগুলোর সুযোগ-সুবিধা এতটাই বিলাসবহুল যে তা অভিজাত হোটেলকেও হার মানায়। এ ধরনের রাষ্ট্রীয় ব্যয়ের জন্য কারা জবাবদিহি করবে, সে বিষয়ে কোনও আলোচনা নেই। খরচের কার্যকর ব্যবস্থাপনা ছাড়া বাংলাদেশ সামনে এগোতে পারবে না।’
তিনি আরও বলেন, সব মন্ত্রণালয়ে উপদেষ্টাদের রিপোর্ট দেওয়া হবে— কোন কাজ হয়েছে, কোনটি হয়নি। এটি পরবর্তী সরকারের জন্য সহায়ক হবে। আমলাদের বেশি ক্ষমতায়ন হয়েছে। বর্তমানে বিনিয়োগ স্থবির, কর্মসংস্থান কম, ট্যালেন্টেড তরুণরা দেশেই থাকতে চায় না। ওভার-সেন্ট্রালাইজেশন বেড়ে গেছে, বিকেন্দ্রীকরণ জরুরি। ডিসিশন ট্রান্সপারেন্সি নেই, জবাবদিহি নিশ্চিত করতে হবে।
মেগা প্রকল্পগুলোর ক্ষেত্রে অগ্রাধিকার ও স্বচ্ছতার ঘাটতি আছে বলে অভিযোগ করেন হোসেন জিল্লুর। দুর্নীতি বড় সমস্যা, কিন্তু দুর্নীতি কমেছে, এখন পর্যন্ত কোনো গবেষণা তা প্রমাণ করতে পারেনি। মানুষ আর প্রতিশ্রুতি শুনতে চায় না, তারা বাস্তব কাজ দেখতে চায়। দুর্নীতি দমন কমিশন, মিডিয়া কমিশনসহ বিভিন্ন সংস্কার উদ্যোগ বাস্তবে কার্যকর হয়নি।
তিনি আরও বলেন, সম্প্রতি বিমানের পরিচালনা পর্ষদে হঠাৎ তিনজনকে নিয়োগ দেওয়া হয়েছে; এর ব্যাখ্যা কী? নিয়োগের যৌক্তিক কারণ থাকলে তা প্রকাশ করতে সমস্যা কোথায়? সিদ্ধান্ত গ্রহণে স্বচ্ছতার অভাব এই সরকারের মধ্যেও আছে। আগেও এই সমস্যা ছিল, ভবিষ্যতে যেন তা আর না থাকে, তা আমাদের নিশ্চিত করতে হবে।
ডিজিটালাইজেশন দুর্নীতি পুরোপুরি দূর না করলেও অনেক সমস্যা কমাতে পারে বলে মন্তব্য করেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সহ-উপাচার্য (প্রশাসন) সায়মা হক বিদিশা। তিনি বলেন, ডিজিটালাইজেশনের কারণে ভারসাম্য আসতে পারে। তবে এর জন্য ডিজিটাল সাক্ষরতা অত্যন্ত জরুরি। বর্তমানে কর রিটার্ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া আংশিক ডিজিটাল হলেও বাস্তবে তা এখনো জটিল ও কাগজনির্ভর। তিনি আরও বলেন, দেশে নীতিমালার অভাব নেই, কিন্তু বাস্তবায়নের ঘাটতি প্রকট। শেয়ারবাজার সংস্কার, করছাড়ের যৌক্তিক ব্যবহার এবং নারী উদ্যোক্তাদের জন্য ট্রেড লাইসেন্স সহজীকরণের ওপর তিনি গুরুত্ব দেন।
র্যাপিড-এর নির্বাহী পরিচালক অধ্যাপক ড. এম আবু ইউসুফ বলেন, রাজনীতি থেকে সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে আলাদা করা না গেলে সুশাসন প্রতিষ্ঠা সম্ভব নয়। সরকারি তথ্যের বিশ্বাসযোগ্যতা এবং শিক্ষা ও কর্মসংস্থানের মধ্যে সংযোগহীনতাও তিনি বড় সমস্যা হিসেবে উল্লেখ করেন।
ডিবিটেক/এএসপিএ/এমইউএম







