পূজার ছুটিতে সিলেটে পর্যটকের ঢল, হোটেলে জায়গা না পেয়ে মাজারে আশ্রয়
সিলেট: দুর্গাপূজা ও টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের ঢল নেমেছে সিলেটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সিলেট ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখাল ও চা-বাগানগুলোতে উপচে পড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেখছেন শত কোটি টাকার […] The post পূজার ছুটিতে সিলেটে পর্যটকের ঢল, হোটেলে জায়গা না পেয়ে মাজারে

সিলেট: দুর্গাপূজা ও টানা ছুটিকে কেন্দ্র করে পর্যটকের ঢল নেমেছে সিলেটে। দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে আসা ভ্রমণপিপাসু মানুষের পদচারণায় মুখর হয়ে উঠেছে সিলেট ও আশপাশের পর্যটনকেন্দ্রগুলো। ভোলাগঞ্জের সাদাপাথর, জাফলং, রাতারগুল, বিছানাকান্দি, লালাখাল ও চা-বাগানগুলোতে উপচে পড়ছে দর্শনার্থীর ভিড়। পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতিতে হোটেল-মোটেল, রিসোর্ট, রেস্তোরাঁ ও পরিবহন খাতে বেড়েছে কর্মচাঞ্চল্য। পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীরা দেখছেন শত কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা।
তবে পর্যটকের এই ঢলে দেখা দিয়েছে আবাসনসংকট। আগে থেকে বুকিং থাকায় অনেক হোটেল-মোটেলে কক্ষ পাওয়া যাচ্ছে না। ফলে শত শত পর্যটককে পড়তে হচ্ছে বিপাকে। কেউ কেউ হোটেলে জায়গা না পেয়ে আশ্রয় নিয়েছেন হযরত শাহজালাল (রহ.)-এর মাজার প্রাঙ্গণে। অন্যদিকে হোটেলের কক্ষভাড়া বৃদ্ধি এবং পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতে অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগও তুলেছেন ভ্রমণকারীরা।
এবার দুর্গাপূজার ছুটির তালিকায় ছিল পাঁচ দিন। ছুটির আগে ও পরে দুই শুক্রবার ও শনিবারের সাপ্তাহিক ছুটি যুক্ত হওয়ায় শিক্ষার্থীরা আরও চার দিন ছুটি কাটানোর সুযোগ পান। এর সঙ্গে ২৫ অক্টোবর রোববার লক্ষ্মীপূজা যুক্ত হওয়ায় ছুটির আমেজ ছড়িয়ে পড়ে আরও বিস্তৃত পরিসরে। সব মিলিয়ে ক্যালেন্ডারের হিসাবে টানা ১০ দিনের ছুটিকে ঘিরে সিলেটের পর্যটন খাতে তৈরি হয়েছে বাড়তি চাহিদা।
প্রকৃতির সৌন্দর্যে মুগ্ধ পর্যটকেরা
স্বচ্ছ জলরাশির সাদাপাথর, নীল জলধারার লালাখাল, পাহাড়-নদীঘেরা জাফলং, জলাবনের রাতারগুল, পাথর ও পানির মিতালিতে বিছানাকান্দি কিংবা পাহাড়ের গায়ে হেলান দিয়ে থাকা পান্থুমাই ঝরনা—প্রকৃতির এমন বৈচিত্র্যময় সৌন্দর্য উপভোগ করতে ছুটে এসেছেন সব বয়সী মানুষ। উৎমাছড়া ও চা-বাগানের সবুজ অরণ্যও টানছে পর্যটকদের।
ছুটির দিনে ভোলাগঞ্জের সাদাপাথরে গিয়ে দেখা যায়, ধলাই নদীর তীরবর্তী এলাকায় দর্শনার্থীদের উপচেপড়া ভিড়। কেউ বড় বড় পাথরের ওপর দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন, কেউ আবার স্বচ্ছ জলের স্রোতে সময় কাটাচ্ছেন। পরিবার-পরিজন ও বন্ধুদের সঙ্গে ঘুরতে আসা মানুষের পদচারণায় মুখর পুরো এলাকা।
শুধু সিলেট নয়, পর্যটকদের উপস্থিতি বেড়েছে মৌলভীবাজারের বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রেও। চা-বাগানের আঁকাবাঁকা পথ, লাউয়াছড়ার গভীর অরণ্য, মাধবপুর লেক ও মাধবকুণ্ড ঝরনায় ভিড় করছেন দর্শনার্থীরা। চায়ের রাজধানীখ্যাত শ্রীমঙ্গলের রিসোর্টগুলোতেও দেখা গেছে পর্যটকদের বাড়তি চাপ। এতে পরিবহন, খাবারের দোকান ও স্থানীয় সেবামূলক ব্যবসায় ফিরেছে গতি।
হোটেলে রুম সংকট, ভাড়ায় বাড়তি চাপ
পর্যটকদের ব্যাপক উপস্থিতিতে সবচেয়ে বেশি ভোগান্তিতে পড়েছেন আবাসন খুঁজতে থাকা ভ্রমণকারীরা। আগে থেকে বুকিং না থাকায় অনেকেই হোটেল-মোটেলে কক্ষ পাচ্ছেন না। কোথাও কক্ষ মিললেও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়ার অভিযোগ রয়েছে। একই সঙ্গে সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসে পর্যটনকেন্দ্রে যাতায়াতের ভাড়া নিয়েও অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন অনেকে।
নারায়ণগঞ্জ থেকে পরিবার নিয়ে সিলেটে বেড়াতে আসা আশরাফুল আলম বলেন, দীর্ঘ ছুটি উপভোগ করতে সিলেটের চা-বাগান, জাফলং, রাতারগুল ও সাদাপাথর ঘুরে দেখেছেন। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যে মুগ্ধ হলেও আবাসন ও যাতায়াতে বাড়তি খরচ নিয়ে অসন্তুষ্ট তিনি।
আশরাফুল আলম বলেন, ‘এবার হোটেলের ভাড়া প্রায় দ্বিগুণ গুনতে হয়েছে। আগে থেকে বুকিং করে এলে হয়তো এমনটা হতো না। তা ছাড়া মাজারকেন্দ্রিক সিএনজি ভাড়া বেশি, চালকদের আচরণও ভালো না। বাকি সব ঠিক আছে।’
পুরান ঢাকা থেকে আসা আলাউদ্দিন ব্যাপারি জানান, বিভিন্ন হোটেলে খোঁজ করেও কক্ষ পাননি। কোথাও কক্ষ পাওয়া গেলেও অতিরিক্ত ভাড়া চাওয়া হয়েছে। তাঁর অভিযোগ, সিএনজিচালিত অটোরিকশার ভাড়ার ক্ষেত্রেও একধরনের সিন্ডিকেটের প্রভাব রয়েছে। পর্যটকদের অসহায়ত্বের সুযোগ নিয়ে দ্বিগুণ ভাড়া দাবি করা হচ্ছে।
একটি বেসরকারি বিশ্ববিদ্যালয়ের কয়েকজন শিক্ষার্থী দলবদ্ধ হয়ে সিলেটে বেড়াতে এসেছেন। তাঁদের ভাষ্য, স্থানীয় মানুষের সহযোগিতাপূর্ণ আচরণ ভালো লাগলেও মাজারকেন্দ্রিক অনেক হোটেলে ভাড়া বেড়েছে। এর আগে সিলেটে এসে তাঁরা স্বাভাবিক ভাড়ায় হোটেল পেয়েছিলেন। এবার আম্বরখানা, জিন্দাবাজার ও বন্দরবাজার থেকে বিভিন্ন পর্যটনকেন্দ্রে যাওয়ার জন্য সিএনজিচালিত অটোরিকশা ও মাইক্রোবাসের চালকেরা স্বাভাবিকের তুলনায় কয়েক গুণ বেশি ভাড়া চাইছেন বলে অভিযোগ তাঁদের।
হোটেলে কক্ষ না পেয়ে মাজার প্রাঙ্গণে রাত কাটানোর পরিস্থিতিতে পড়েন গাজীপুর থেকে আসা পর্যটক শেখ ফারুক হাসান। তিনি বলেন, এমন আবাসনসংকটে পড়তে হবে, তা কখনো ভাবেননি। কোথাও হোটেল না পেয়ে মাজারেই রাত কাটাতে হচ্ছে। পরদিনও কক্ষ না পেলে গাজীপুরে ফিরে যাওয়ার কথা ভাবছেন তিনি।
পথে পথে ভোগান্তি
পর্যটকদের ভোগান্তি শুধু আবাসন ও ভাড়ার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। ঢাকা-সিলেট মহাসড়কে ছয় লেনের উন্নয়নকাজ চলমান থাকায় বিভিন্ন স্থানে দীর্ঘ যানজটের সৃষ্টি হচ্ছে। সড়কের বেহাল অবস্থার কারণে ছয় ঘণ্টার পথ পাড়ি দিতে অনেক সময় ১০ থেকে ১২ ঘণ্টা লাগছে বলে জানিয়েছেন যাত্রীরা।
সাদাপাথরে যাওয়ার সড়কের অবস্থা তুলনামূলক ভালো হলেও জাফলং, বিছানাকান্দি, রাতারগুল ও লালাখালের পথে দুর্ভোগ পোহাতে হচ্ছে পর্যটকদের। জাফলং যাওয়ার প্রায় ৫৫ কিলোমিটার সড়কের বেশির ভাগ জায়গায় রয়েছে বড় বড় খানাখন্দ। লালাখালের মূল পর্যটনকেন্দ্রে পৌঁছাতে সারিঘাটের পর কাদামাটির সড়ক পাড়ি দিতে হয়।
বিছানাকান্দির পথে প্রায় ২৫ কিলোমিটার সড়কের অবস্থাও বেহাল। একই চিত্র উৎমাছড়ার সড়কে। সাদাপাথর থেকে দয়ারবাজার পর্যন্ত সড়ক ভালো থাকলেও এরপর প্রায় ১৫ কিলোমিটার পথে দুর্ভোগে পড়তে হয় পর্যটকদের।
প্রকৃতির সৌন্দর্য উপভোগ করতে এসে সড়কের দুরবস্থা ও দীর্ঘ যাত্রার ক্লান্তি তাঁদের ভ্রমণের আনন্দ অনেকটাই ম্লান করছে বলে জানিয়েছেন অনেকে।
শত কোটি টাকা ব্যবসার আশা
পর্যটনসংশ্লিষ্ট ব্যবসায়ীদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, টানা ১০ দিনের ছুটিতে অন্তত ১০ লাখ পর্যটকের আগমনের প্রত্যাশা করছেন তাঁরা। এই বিপুলসংখ্যক পর্যটককে ঘিরে হোটেল, রেস্তোরাঁ, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসাসহ সংশ্লিষ্ট খাতে শত কোটি টাকার বাণিজ্যের সম্ভাবনা দেখছেন ব্যবসায়ীরা। তাঁদের আশা, পর্যটকদের বাড়তি উপস্থিতি আগের লোকসান কিছুটা পুষিয়ে নিতে সহায়তা করবে।
ভোলাগঞ্জ সাদাপাথর হোটেল অ্যান্ড রিসোর্টের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা (সিইও) শেখ রামিম আহমদ জানান, ২৫ অক্টোবর পর্যন্ত তাঁদের সব কটি কক্ষ বুকিং রয়েছে। গত দুই ঈদে ব্যবসায় মন্দা থাকলেও পূজার ছুটিতে পর্যটকের সংখ্যা বেড়েছে। অনেক পর্যটক যোগাযোগ করেও কক্ষ বুকিং পাচ্ছেন না। রেস্তোরাঁয়ও বেড়েছে বেচাকেনা।
শেখ রামিম আহমদ বলেন, গত কয়েক বছরের ঈদ ও পূজার ছুটির তুলনায় এবার ব্যবসা ভালো হচ্ছে।
ব্যবসায়ী নেতা ও এফবিসিসিআইয়ের সাবেক পরিচালক ফালাহ উদ্দিন আলী আহমদ বলেন, ‘পর্যটকদের আগমনে বাড়তি লাভের পাশাপাশি সিলেটের অর্থনীতি আরও চাঙা হয়েছে। পূজাসহ সরকারি টানা ১০ দিনের ছুটিতে সিলেটের পর্যটন খাতে অন্তত শত কোটি টাকার ব্যবসার সম্ভাবনা রয়েছে। এটি আমরা যারা ব্যবসায়ী রয়েছি, তাদের প্রত্যাশিত হিসাব।’
সিলেট চেম্বার অব কমার্স অ্যান্ড ইন্ডাস্ট্রির প্রশাসক এজাজ আহমেদ চৌধুরী বলেন, ‘এবার পূজায় ব্যবসা ভালো হয়েছে এবং নিরাপত্তাব্যবস্থাও ভালো ছিল। পর্যটকেরা সিলেটে এসে নির্বিঘ্নে ঘোরাফেরা করতে পেরেছেন। এ নিয়ে কোনো অভিযোগও পাওয়া যায়নি।’
নিরাপত্তায় সতর্ক প্রশাসন
পর্যটকদের নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে সতর্ক অবস্থানে রয়েছে ট্যুরিস্ট পুলিশ। ট্যুরিস্ট পুলিশের সিলেট অঞ্চলের অতিরিক্ত পুলিশ সুপার মো. শাহিনুর ইসলাম জানান, পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নির্বিঘ্নে ভ্রমণের পরিবেশ বজায় রাখতে প্রতিটি স্পটে পুলিশ সদস্যরা দায়িত্ব পালন করছেন।
সিলেটের জেলা প্রশাসক আবদুল্লাহ আল মামুন জানান, উপজেলা প্রশাসনের সঙ্গে সমন্বয় করে পর্যটনকেন্দ্রগুলোতে নিরাপত্তাব্যবস্থা নিশ্চিত করা হয়েছে। যানজট কমাতেও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। অতিরিক্ত ভাড়া আদায়ের অভিযোগ পেলে তা যাচাই-বাছাই করে সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে কঠোর ব্যবস্থা নেওয়া হবে।
The post পূজার ছুটিতে সিলেটে পর্যটকের ঢল, হোটেলে জায়গা না পেয়ে মাজারে আশ্রয় first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





