অ্যাপলের ডব্লিউডব্লিউডিসি ২০২৬: টিম কুকের শেষ চমক
বিশ্বজুড়ে অ্যাপলপ্রেমী এবং ডেভেলপারদের দীর্ঘ প্রতীক্ষার অবসান ঘটিয়ে ক্যালিফোর্নিয়ার অ্যাপল পার্কে জমকালো আয়োজনের মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে অ্যাপলের বাৎসরিক ‘ওয়ার্ল্ডওয়াইড ডেভেলপারস কনফারেন্স’ বা ডব্লিউডব্লিউডিসি ২০২৬। এবারের আয়োজনটি অ্যাপলের ইতিহাসে একটি বড় মাইলফলক। কারণ এটিই সিইও হিসেবে টিম কুকের শেষ ডব্লিউডব্লিউডিসি।
আগামী ১ সেপ্টেম্বর তিনি পদত্যাগ করবেন এবং তাঁর স্থলাভিষিক্ত হবেন হার্ডওয়্যার ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগের সিনিয়র ভাইস প্রেসিডেন্ট জন টার্নাস। জন টার্নাসের হাত ধরে ভবিষ্যতে অ্যাপল হার্ডওয়্যারে বৈপ্লবিক পরিবর্তনের আশা করা হলেও, এবারের মূল কি-নোট বা উদ্বোধনী অনুষ্ঠানটি ছিল সম্পূর্ণ সফটওয়্যার ও কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই)-কেন্দ্রিক।
অ্যাপলের এবারের ইভেন্টে ঘোষিত সব কটি বড় ও গুরুত্বপূর্ণ আপডেটের বিস্তারিত বিবরণ নিচে তুলে ধরা হলো:
১. ‘সিরি এআই’
ডব্লিউডব্লিউডিসি ২০২৬-এর সবচেয়ে বড় আকর্ষণ ছিল অ্যাপলের ভয়েস অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি’র আমূল পরিবর্তন। গত ২০২৪ সালে প্রথম ঘোষণা এবং চলতি বছরের জানুয়ারিতে নিশ্চিত করার পর অ্যাপল অবশেষে তাদের কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা-চালিত সর্বাধুনিক অ্যাসিস্ট্যান্ট ‘সিরি এআই’ উন্মোচন করেছে। সবচেয়ে চমকপ্রদ তথ্য হলো—এই নতুন সিরি এআই ব্যাক-এন্ডে গুগলের ‘জেমিনি’ এআই মডেল দ্বারা পরিচালিত হবে।
নতুন ইন্টারফেস: ডাইনামিক আইল্যান্ড যুক্ত আইফোনগুলোতে সিরি চালু করলে এখন আর স্ক্রিনের নিচে নয়, বরং ডাইনামিক আইল্যান্ডের চারপাশে একটি চমৎকার অ্যানিমেশন ভেসে উঠবে। নতুন আইওএস ২৭-এ স্ক্রিনের মাঝখান থেকে নিচের দিকে সোয়াইপ করলেই সিরি এআই-এর চ্যাটবট ইন্টারফেস চলে আসবে, যেখানে কার্ড আকারে চ্যাটবটের সাথে সাধারণ কথ্য ভাষায় চ্যাট বা প্রশ্নোত্তরের ধারাবাহিকতা বজায় রাখা যাবে।
ভিজ্যুয়াল ইন্টেলিজেন্স: সিরি এআই এখন স্ক্রিনে কী রয়েছে তা দেখে সিদ্ধান্ত নিতে পারবে। যেমন—ম্যাকবুকের স্ক্রিনশট টুলের সাহায্যে কোনো মিউজিক ফেস্টিভ্যালের শিডিউল দেখে সিরি-কে বললে সে স্বয়ংক্রিয়ভাবে আপনার ক্যালেন্ডারে ইভেন্ট যুক্ত করে দেবে। আইফোনের ক্যামেরার সামনে যা থাকবে, তা দেখেও সিরি রিয়েল-টাইমে বিস্তারিত তথ্য দিতে পারবে। একই ভিজ্যুয়াল ফিচার অ্যাপল ভিশন প্রো-তেও কাজ করবে।
সিরি চ্যাটবট অ্যাপ: সিরি-কে এখন সম্পূর্ণ স্বতন্ত্র চ্যাটবট অ্যাপ হিসেবেও ব্যবহার করা যাবে, যা টেক্সট ও ছবি তৈরি, ফাইল অ্যানালাইসিস এবং যেকোনো তথ্যের একক সমাধান হিসেবে কাজ করবে। ব্যবহারকারীরা সিরির গলার স্বরের প্রকাশভঙ্গি এবং কথা বলার গতিও নিজেদের পছন্দমতো কাস্টমাইজ করতে পারবেন।
আইফোন ১৬ সিরিজ বা তার পরবর্তী মডেল, আইফোন ১৫ প্রো ও প্রো ম্যাক্স এবং এম১ বা তার পরবর্তী চিপযুক্ত আইপ্যাড ও ম্যাক কম্পিউটারে এই সিরি এআই ও অ্যাপল ইন্টেলিজেন্সের সুবিধা মিলবে। তবে ইউরোপীয় ইউনিয়নের ‘ডিজিটাল মার্কেটস অ্যাক্ট’ আইনের জটিলতার কারণে প্রাথমিকভাবে ইইউভুক্ত দেশগুলোতে আইফোন ও আইপ্যাডে সিরি এআই পাওয়া যাবে না, তবে ম্যাকওএস, ওয়াচওএস ও ভিশনওএস-এ এটি সচল থাকবে।
২. ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’-এর ম্যাজিক
সিরি-র পাশাপাশি অ্যাপলের মূল অপারেটিং সিস্টেমের বিভিন্ন অ্যাপে যুক্ত হয়েছে শক্তিশালী ‘অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স’।
সাফারি ব্রাউজার: সাফারি এখন এআই-এর সাহায্যে আপনার ওপেন থাকা ট্যাবগুলোকে নির্দিষ্ট টপিক বা বিষয় অনুযায়ী স্মার্টলি সাজিয়ে রাখবে। কোনো ওয়েবসাইটের ভেতরের তথ্য বা পণ্যের দাম পরিবর্তন হলে এটি ব্যবহারকারীকে নোটিফিকেশন পাঠাবে। এমনকি আপনি মুখে বর্ণনা করে সাফারির জন্য কাস্টম এক্সটেনশন তৈরি করে নিতে পারবেন।
পাসওয়ার্ড অ্যাপ ও মেসেজ: কোনো দুর্বল বা হ্যাক হওয়া পাসওয়ার্ডকে অ্যাপল ইন্টেলিজেন্স মাত্র এক ট্যাপে শক্তিশালী করে দেবে এবং স্বয়ংক্রিয়ভাবে সেই ওয়েবসাইটের ক্রেডেনশিয়াল আপডেট করে নেবে। মেসেজ এবং মেইল অ্যাপে আপনার লেখার নিজস্ব শৈলী নকল করে এটি স্বয়ংক্রিয় ‘স্মার্ট রিপ্লাই’ তৈরি করতে পারবে।
ইমেজ প্লেগ্রাউন্ড ও ফটোস: ইমেজ প্লেগ্রাউন্ড টুলের সাহায্যে ব্যবহারকারীরা লক স্ক্রিন ওয়ালপেপার ও ফটোরিয়েলিস্টিক ছবি জেনারেট করতে পারবেন। ফটোস অ্যাপে যোগ হয়েছে ‘এক্সটেন্ড’ টুল, যা দিয়ে যেকোনো ছবির চারপাশ এআই-এর মাধ্যমে কৃত্রিমভাবে বাড়িয়ে ফ্রেম বড় করা যাবে। তবে এআই দিয়ে এডিট করা বা তৈরি সব ছবিতে গুগলের ‘SynthID’ জলছাপ বা ওয়াটারমার্ক থাকবে।
৩. ‘লিকুইড গ্লাস’ ডিজাইন ও পারফরম্যান্স বুস্ট
গত বছরের ওএস আপডেটে অ্যাপল যে ‘লিকুইড গ্লাস’ ডিজাইন ল্যাঙ্গুয়েজ চালু করেছিল, তা নিয়ে ব্যবহারকারীদের মাঝে মিশ্র প্রতিক্রিয়া ছিল। এবার ব্যবহারকারীদের দাবি মেনে অ্যাপল এতে একটি ‘ওপাসিটি স্লাইডার’ যুক্ত করেছে, যার মাধ্যমে ব্যবহারকারী নিজেই ঠিক করতে পারবেন স্ক্রিনের গ্লাস ডিজাইনটি কতটা স্বচ্ছ বা ঘোলাটে দেখাবে। ম্যাকওএস গোল্ডেন গেট-এ অ্যাপের সাইডবারগুলো এখন স্ক্রিনের একদম প্রান্ত পর্যন্ত বিস্তৃত হবে এবং উইন্ডোগুলোর কোণা আরও বেশি রাউন্ড বা বাঁকানো হবে।
পারফরম্যান্সের দিক থেকে অ্যাপল এক বিশাল লাফের দাবি করেছে। এয়ারড্রপ ফাইল ট্রান্সফার, মেইল লোডিং এবং অ্যাপল মিউজিক প্লেব্যাক এখন আগের চেয়ে সর্বোচ্চ ৮০ শতাংশ দ্রুত কাজ করবে। অ্যাপ লঞ্চিং স্পিড ৩০ শতাংশ এবং ক্যামেরা রোলে ছবি আসার গতি ৭০ শতাংশ বৃদ্ধি পাবে।
সবচেয়ে খুশির খবর হলো—যাঁরা পুরোনো আইফোন ব্যবহার করছেন, তাঁদের জন্য অ্যাপল তাদের সিপিইউ শিডিউলার নতুন করে অপ্টিমাইজ করেছে। ফলে আইফোন ১১ বা তার পরবর্তী সব মডেল আইওএস ২৭ আপডেটের পর আগের চেয়ে অনেক বেশি ফাস্ট এবং স্মুথ অনুভব হবে।
৪. প্যারেন্টাল কন্ট্রোল এবং শিশু নিরাপত্তা
চলতি ২০২৬ সালে বিশ্বজুড়ে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর শিশু নিরাপত্তা নিয়ে সরকারি চাপ বাড়ার কারণে অ্যাপল এবার তাদের ‘প্যারেন্টাল কন্ট্রোল’ ব্যবস্থাকে অত্যন্ত শক্তিশালী করেছে।
বাধ্যতামূলক চাইল্ড অ্যাকাউন্ট: ১৩ বছরের কম বয়সী শিশুদের জন্য এখন থেকে ‘চাইল্ড অ্যাকাউন্ট’ তৈরি করা বাধ্যতামূলক এবং এটি ১৮ বছর পর্যন্ত কার্যকর রাখা যাবে।
কড়া নজরদারি: অভিভাবকেরা নির্ধারণ করে দিতে পারবেন তাঁদের সন্তান ফোন, ফেসটাইম বা মেসেজে কার কার সাথে যোগাযোগ করতে পারবে এবং কোন কোন অ্যাপ বা ওয়েবসাইট দেখতে পাবে। কোনো শিশু সাফারিতে নিষিদ্ধ কোনো সাইটে ঢুকতে চাইলে সে সরাসরি ব্রাউজার থেকেই অভিভাবকের আইফোনে ‘অনুমতি’ বা পারমিশনের রিকোয়েস্ট পাঠাতে পারবে। এ ছাড়া নতুন স্ক্রিন টাইম ফিচারের মাধ্যমে সন্তান সারাদিন ফোনে কী করছে, তার নিখুঁত গ্রাফিক্যাল রিপোর্ট পাবেন অভিভাবকেরা।
অ্যাপলের সব কটি নতুন অপারেটিং সিস্টেমের ডেভেলপার বেটা সংস্করণ আজ থেকেই উন্মুক্ত করা হয়েছে এবং এই বছরের শরৎকালে সাধারণ ব্যবহারকারীদের ডিভাইসে এর ফাইনাল আপডেট পৌঁছাতে শুরু করবে। এআই এবং ব্যবহারকারী বান্ধব ফিচারের এই যুগলবন্দী আগামী দিনে অ্যাপল ইকোসিস্টেমকে আরও শক্তিশালী করবে বলে মনে করছেন প্রযুক্তি বিশ্লেষকেরা।
ডিবিটেক/বিএমটি । সূত্র: এনগ্যাজেট





