আকস্মিক বন্যা থেকে রক্ষায় আশা জাগাচ্ছে বোরো ধান

৫ মে, ২০২৬ ০০:০০  

হাওরাঞ্চলে আকস্মিক বন্যার ঝুঁকি কমাতে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি অর্জন করেছেন বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের (বাকৃবি) গবেষকরা। ৩৬ বছরের তথ্য বিশ্লেষণে দেখা গেছে, হাওরে আগাম বন্যার সবচেয়ে বেশি প্রকোপ মে মাসে প্রায় ৫০ শতাংশ, আর এপ্রিলের শেষার্ধে প্রায় ৪২ শতাংশ। এর তুলনায় মার্চের শেষভাগ ও এপ্রিলের প্রথমার্ধে ঝুঁকি তুলনামূলক কম। এই পরিস্থিতিতে এপ্রিলের মাঝামাঝির আগেই ধান কেটে ফেলতে পারলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব বলে জানিয়েছেন গবেষকরা।

হাওরাঞ্চলে স্বল্পমেয়াদি বোরোধান চাষের সুবিধা নিয়ে ৪ মে, সোমবার  বাংলাদেশ কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ের ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের সম্মেলনকক্ষে অনুষ্ঠিত সংবাদ সম্মেলনে এমনটাই জানিয়েছেন গবেষণা দলের প্রধান ও ফসল উদ্ভিদ বিজ্ঞান বিভাগের অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমান। এ সময় উপস্থিত ছিলেন সহযোগী গবেষক অধ্যাপক ড. ইসরাত জাহান শেলীসহ সংশ্লিষ্ট স্নাতকোত্তর শিক্ষার্থীরা।

গবেষকদের তথ্য অনুযায়ী, দেশে মোট ধান উৎপাদনের প্রায় ৬০ শতাংশ আসে বোরো মৌসুম থেকে। এর মধ্যে আবার মোট বোরো উৎপাদনের প্রায় ১৮ শতাংশ আসে হাওরাঞ্চল থেকে। তবে প্রায় প্রতি বছরই আগাম বন্যায় ১০ থেকে ১০০ শতাংশ পর্যন্ত ফসল ক্ষতিগ্রস্ত হয়। যেহেতু হাওরের প্রধান ফসল বোরো ধান, তাই বন্যার আগেই ফসল কেটে ফেলাই সবচেয়ে কার্যকর সমাধান বলে মনে করছেন গবেষকরা।

তাদের মতে, দীর্ঘমেয়াদি জাতের পরিবর্তে স্বল্পমেয়াদি ধান চাষ করলে ১৫ থেকে ২০ দিন আগে ফসল পরিপক্ক হয়, ফলে বন্যার আগেই ধান কাটা সম্ভব হয়।

অধ্যাপক ড. মো. হাবিবুর রহমান প্রামানিক বলেন, ‘হাওর অঞ্চলে নিরাপদ বোরোধান উৎপাদনে স্বল্পমেয়াদি ধান জাতের জনপ্রিয়করণ’ প্রকল্পটি ২০২০ সাল থেকে পরিচালিত হচ্ছে। তিনি জানান, সাধারণত ডিসেম্বরের শেষ বা জানুয়ারির শুরুতে বোরো ধান রোপণ করা হয়, কিন্তু প্রচলিত জাত এপ্রিলের শেষ বা মে মাসে পাকে, যখন বন্যার ঝুঁকি সর্বোচ্চ থাকে। ফলে অনেক সময় কৃষকেরা ফসল ঘরে তুলতে পারেন না।

তিনি আরও বলেন, বৈশাখ–জ্যৈষ্ঠে আগাম বন্যা শুরু হওয়ার আগেই যদি ধান কাটা যায়, তাহলে বড় ধরনের ক্ষতি এড়ানো সম্ভব। এজন্য স্বল্পমেয়াদি জাত চাষে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে, যা প্রচলিত জাতের তুলনায় ১৫–২০ দিন আগে পাকে।

তিনি জানান, বহুল ব্যবহৃত ব্রি ধান ৯২-এর জীবনকাল ১৬০ দিন এবং এটি সাধারণত ডিসেম্বরের শেষে রোপণ করা হয়। তবে এর ফলে এপ্রিলের শেষ বা মে মাসে পাকা সময়ে বন্যার ঝুঁকি তৈরি হয়। অন্যদিকে ব্রি ধান ৮৮, ১০১, ১১৩, ১০৫ এবং ২৫-এর মতো স্বল্পমেয়াদি জাত একই সময়ে রোপণ করেও আগেই সংগ্রহ করা যায়।

এসব স্বল্পমেয়াদি জাতের জীবনকাল প্রায় ১৪৫ দিন, ফলে এপ্রিলের প্রথমার্ধেই ফসল কাটা সম্ভব হয় বলে জানান তিনি।

গবেষণার সাফল্যের উদাহরণ হিসেবে তিনি বলেন, ব্রি ধান ৮৮ জাত ২৬ ডিসেম্বর রোপণ করে ৮ এপ্রিল কাটা হয়েছে, যা বন্যার ক্ষতি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিল। একইভাবে সুনামগঞ্জ ও অষ্টগ্রামে নির্ধারিত সময়ের আগেই ফসল কেটে কৃষকেরা উপকৃত হয়েছেন। আইটনা এলাকায় ব্রি ধান ১১৩ জানুয়ারির ১০ তারিখে রোপণ করে ১৭ এপ্রিল কাটা সম্ভব হয়েছে, যেখানে দীর্ঘমেয়াদি ব্রি ধান ৯২ তখনো কাটার উপযোগী হয়নি।

হাওরে বোরো চাষে ঝুঁকির দিকগুলো তুলে ধরে তিনি বলেন, তাপমাত্রা ১০ ডিগ্রির নিচে নামলে বা ৩৫ ডিগ্রির বেশি হলে ধান চিটা হয়ে যেতে পারে। এছাড়া শিলাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টিও ফসলের ক্ষতি করে। তাই এমন সময় রোপণ করা জরুরি যাতে এসব ঝুঁকি এড়ানো যায়, এবং এর জন্য ১০ জানুয়ারির মধ্যে চারা রোপণের পরামর্শ দেন তিনি।

তবে স্বল্পমেয়াদি ধানের একটি সীমাবদ্ধতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, এতে উৎপাদন এক থেকে দেড় টন কম হয়, যার কারণে কৃষকদের আগ্রহ কম থাকে। কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি জাত বন্যায় পড়লে পুরো ফসলই নষ্ট হয়ে যেতে পারে—এটি কৃষকেরা অনেক সময় বিবেচনায় নেন না।

তিনি আরও বলেন, এসব প্রযুক্তি ও জাত বিস্তারে সরকারি উদ্যোগ নেওয়া জরুরি, কারণ ঝুঁকি কমিয়ে ঘরে ফসল তোলা কৃষকের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

ডিবিটেক/জিমি/এমইউআইএম