গুলশানে ‘টেলি সুমন’ খুনের ঘটনায় মামলা
রাজধানীর গুলশানে পুলিশ প্লাজার সামনে গুলি করে আঞ্চলিক ইন্টারনেট সেবাদাতা প্রতিষ্ঠান ‘প্রিয়জন’ এর স্বত্বাধিকারি সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে (৩৫) গুলি করে হত্যার ঘটনায় শুক্রবার (২১ মার্চ) গুলশান থানায় মামলা করেছেন নিহতের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার।
মামলার বিষয়টি নিশ্চিত করে গুলশান থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) মো. মাহমুদুর রহমান জানিয়েছেন, হত্যাকাণ্ডের পর থেকে পুলিশ আশপাশের সিসি ক্যামেরার ফুটেজ সংগ্রহ করেছে। সেগুলো পর্যালোচনা করা হচ্ছে। জড়িতদের শনাক্তের পর গ্রেফতারে কাজ করছে পুলিশ।
এজাহারে নিহত সুমনের স্ত্রী মৌসুমী আক্তার অভিযোগ করেন, তার স্বামী মহাখালী টিবি গেট এলাকায় প্রিয়জন নামক ইন্টারনেট ব্যবসা পরিচালনা করে আসছিলেন। ইন্টারনেট ব্যবসার কারণে একই এলাকায় তার কিছু প্রতিপক্ষ গ্রুপ সৃষ্টি হয়। এ প্রতিপক্ষ গ্রুপের লোকজন বিভিন্ন সময় সুমনকে মেরে ফেলার জন্য বিভিন্ন হুমকি দিত। জীবনের ঝুঁকি আছে বলে সুমন প্রায় সময় তার স্ত্রীকে জানিয়েছিলেন। এছাড়া সুমনের বিরুদ্ধে একাধিক মামলা থাকায় কিছু লোকের সঙ্গে তার বিরোধ ছিল।
এজাহারে আরও বলা হয়, ২০ মার্চ রাত ৯টার দিকে গুলশান পুলিশ প্লাজার উত্তর পশ্চিম পাশে ফজলে রাব্বি পার্কের পূর্ব দিকে বেঞ্চে বসে বিশ্রাম নিচ্ছিলেন সুমন। এ সময় অজ্ঞাতনামা সন্ত্রাসীরা একই উদ্দেশ্যে পূর্ব পরিকল্পনা অনুযায়ী হত্যার উদ্দেশ্যে এলোপাতাড়ি গুলি করতে থাকে। তখন সুমন নিজের জীবন বাঁচাতে দৌড়াতে থাকে। স্থানীয়রা ঘটনাস্থলে এলে সন্ত্রাসীরা দৌড়ে পালিয়ে যায়। এরপর সুমনের নিথর দেহ ঢাকা মেডিকেল হাসপাতালে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন।
ঘটনার সিসি ফুটেজের বরাতে জানাগেছে, গুলশানের বিপণিবিতান পুলিশ প্লাজার সামনের সড়কে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে সুমন মিয়া ওরফে টেলি সুমনকে গুলি করা হয়। বৃহস্পতিবার রাত ৯টা ১০ মিনিটে যখন এ ঘটনা ঘটে, তখন অনেক মানুষ ঈদের কেনাকাটা করতে ওই বিপণিবিতানে ঢুকছিলেন-বের হচ্ছিলেন। বিপণিবিতানটির সামনে তখন গাড়ির ব্যাপক চাপ ছিল। হকারদের আনাগোনাও ছিল চোখে পড়ার মতো। এর মধ্যেই পুলিশ প্লাজার উল্টো পাশে উত্তর-পশ্চিম কোণে ফুটপাতে সুমনের সঙ্গে খুনিদের ধস্তাধস্তি হয়। একপর্যায়ে তাঁকে গুলি করা হয়। সুমন গুলশান ১–এর দিকে দৌড়ে পালানোর চেষ্টা করেন। তখন খুনিরা সড়কের মাঝখানে মাথায় পিস্তল ঠেকিয়ে গুলি করে। পরে পুলিশ প্লাজার উত্তর দিকের সড়ক দিয়ে মেরুল বাড্ডার দিকে খুনিরা নির্বিঘ্নে পালিয়ে যায়।
গুলশান থানার এসআই মারুফ আহামেদ জানিয়েছেন, পুলিশ প্লাজার উত্তরে সড়কের পাশ থেকে গুরুতর অবস্থায় সুমনকে ঢাকা মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে নেওয়া হয়। সেখানে রাত ১১টার দিকে চিকিৎসক তাকে মৃত ঘোষণা করেন। তার মাথা ও বুকের বাঁ পাশে গুলির ক্ষত রয়েছে।
এদিকে দুই সপ্তাহ আগে জামিনে মুক্ত হন নিহত সুমন। । তার বিরুদ্ধে অস্ত্র মামলাসহ অন্তত পাঁচটি মামলার তথ্য পাওয়া গেছে। সুমনের বিরুদ্ধে গুলশান থানায় মামলা থাকার তথ্য দিয়ে এসআই বলেন, তার গ্রামের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুরে। থাকতেন ভাষানটেকে; ব্যবসা করতেন মহাখালী টিবিগেইট এলাকায়। সংসারে এক ছেলে এক মেয়ে রয়েছে তার।
নিহতের স্ত্রীর বড় ভাই বাদশা জানান, স্থানীয় ‘সেভেন স্টার’ নামের একটি সন্ত্রাসী গোষ্ঠীর সঙ্গে সুমনের দ্বন্দ্ব রয়েছে। তারা এ হত্যায় জড়িত থাকতে পারে।
তবে গুলশান বিভাগের অতিরিক্ত উপ কমিশনার আল আমিন হোসাইন জানান, অনেকেই তাকে ‘টেলি সুমন’ নামে ডাকেন। অন্তঃদ্বন্দ্বের কারণে প্রতিপক্ষ তাকে হত্যা করেছে বলে ধারণা করা হচ্ছে।
অবশ্য নিহত সুমনের স্ত্রী মৌসুমী আক্তারের ভাষ্য, মহাখালী এলাকায় ব্রডব্যান্ড ইন্টারনেটের সংযোগ দিতেন। আর সেভেন স্টার গ্রুপের রুবেলও মহাখালীতে কেব্ল টিভি সংযোগ ও ইন্টারনেট সংযোগের ব্যবসা করতেন। ২০২০ সালে করোনার সময় রুবেলের সহযোগী জামাল, সেন্টু ও আফজাল মারধর করে সুমনের ইন্টারনেট সংযোগ বিচ্ছিন্ন করে দেন। এ সময় তারা কয়েক লাখ টাকার ইন্টারনেট লাইনের তার নিয়ে যান। ওই ঘটনার পর তৎকালীন গুলশান থানার ওসিকে অনুরোধ করে পুলিশের হস্তক্ষেপে সেই সংযোগ আবার চালু করেছিলেন সুমন। তখন সন্ত্রাসী রুবেলের সহযোগী জামাল ও সেন্টুর নেতৃত্বে মহখালীর টিবি হাসপাতালের গেট এলাকায় সুমনকে কুপিয়ে ও পিটিয়ে তাঁর দুই হাত ভেঙে দেওয়া হয়। ওই ঘটনায় জামালসহ হামলাকারীদের বিরুদ্ধে বনানী থানায় মামলা করলেও পুলিশ তাঁদের গ্রেপ্তার করেনি। পরে তাঁরা জামিনে মুক্ত হন। পরে আফজাল, শফিক, বিন্দু ও সেন্টু কয়েকবার সুমনকে মারধর করেন। এরপর টিবি হাসপাতাল এলাকার বাসা ছেড়ে দিয়ে এক ছেলে ও এক মেয়ে নিয়ে তাঁরা ভাষানটেকের একটি ভাড়া বাসায় ওঠেন। সুমনের বাড়ি রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলায়। তার বাবার নাম মাহফুজুর রহমান।







