আজ লক্ষ্মীকে বরণের দিন
শরতের শিউলিঝরা দিনে দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর বিষণ্ণতা কাটতে না কাটতেই আকাশে ভাসে শারদীয় পূর্ণিমার রূপালি আলো। আর এই পূর্ণিমার রাতটিই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও আনন্দময় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার রাত। পৌরাণিক মিথ, ধর্মীয় দর্শন এবং বাঙালি লোকসংস্কৃতির এক অপূর্ব ও নান্দনিক মেলবন্ধন ঘটে এই কোজাগরী পূর্ণিমায়। শারদীয় দুর্গোৎসবের ঠিক পরবর্তী প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে আজ রোববার […] The post আজ লক্ষ্মীকে বরণের দিন first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.

শরতের শিউলিঝরা দিনে দুর্গাপূজার বিজয়া দশমীর বিষণ্ণতা কাটতে না কাটতেই আকাশে ভাসে শারদীয় পূর্ণিমার রূপালি আলো। আর এই পূর্ণিমার রাতটিই সনাতন ধর্মাবলম্বীদের কাছে অত্যন্ত পবিত্র ও আনন্দময় কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার রাত। পৌরাণিক মিথ, ধর্মীয় দর্শন এবং বাঙালি লোকসংস্কৃতির এক অপূর্ব ও নান্দনিক মেলবন্ধন ঘটে এই কোজাগরী পূর্ণিমায়। শারদীয় দুর্গোৎসবের ঠিক পরবর্তী প্রথম পূর্ণিমা তিথিতে আজ রোববার উদযাপিত হচ্ছে হিন্দু সম্প্রদায়ের অন্যতম প্রধান ও বর্ণিল ধর্মীয় উৎসব লক্ষ্মীপূজা। আশ্বিন মাসের এই বিশেষ পূর্ণিমা তিথিটি ‘কোজাগরী পূর্ণিমা’ নামে সমধিক পরিচিত। শাস্ত্রীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, ধনসম্পদ, আলো, জ্ঞান, সৌভাগ্য, উর্বরতা ও ঐশ্বর্যের দেবী লক্ষ্মীকে বরণ করে নিতে আজ ভক্তরা নানা আচার-অনুষ্ঠান ও উপবাসব্রতের মধ্য দিয়ে দিনটি পালন করছেন।
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার পৌরাণিক ইতিহাস ও পটভূমি
হিন্দু পৌরাণিক শাস্ত্রে দেবী লক্ষ্মীকে বলা হয় শ্রী, বিষ্ণুপ্রিয়া বা ঐশ্বর্যের দেবী। তিনি শুধু ধনসম্পদ ও বৈষয়িক সমৃদ্ধির নন, বরং শান্তি, প্রজ্ঞা, সৌন্দর্য, উর্বরতা ও আধ্যাত্মিক আলোরও প্রতীক। পুরাণ মতে, সমুদ্রমন্থনের সময় ক্ষীরসাগর থেকে আবির্ভূত হয়েছিলেন দেবী লক্ষ্মী। তিনি তার পরম কান্তি ও ঐশ্বর্য নিয়ে ত্রিভুবনকে সমৃদ্ধ করেন। বৈষ্ণব দর্শন অনুযায়ী, ভগবান বিষ্ণু যখন রাম বা কৃষ্ণরূপে পৃথিবীতে অবতার গ্রহণ করেছিলেন, তখন দেবী লক্ষ্মী যথাক্রমে সীতা ও রাধারূপে তার অর্ধাঙ্গিনী বা সঙ্গিনী হিসেবে অবতীর্ণ হয়েছেন।
কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার নামকরণের পেছনেও রয়েছে এক গভীর পৌরাণিক ও লৌকিক বিশ্বাস। ‘কোজাগরী’ শব্দটি এসেছে সংস্কৃত ‘কো জাগর্তি’ থেকে, যার অর্থ ‘কে জেগে আছো?’। প্রচলিত পৌরাণিক বিশ্বাস অনুসারে, আশ্বিন মাসের এই পূর্ণিমা রাতে ধনদেবী লক্ষ্মী ও তার বাহন পেঁচায় চড়ে মর্ত্যলোক পরিভ্রমণে বের হন। তিনি পৃথিবীজুড়ে দেখতে থাকেন কে গভীর রাতে জেগে থেকে তার আরাধনা করছে বা সৎকর্মে নিয়োজিত রয়েছে। এই বিশ্বাসের ওপর ভিত্তি করেই প্রাচীন কাল থেকেই রাজরাজড়া, বণিক সমাজ থেকে শুরু করে সাধারণ গৃহস্থ পরিবারে লক্ষ্মী আরাধনার রেওয়াজ চলে আসছে।
লক্ষীর বাহন প্যাঁচা
অন্যান্য দেব-দেবীর বাহন হিসেবে সাধারণত সিংহ, ময়ূর, ষাঁড় বা হংসের মতো শক্তিশালী বা রাজকীয় প্রাণী দেখা গেলেও, দেবী লক্ষ্মীর বাহন হিসেবে নিশাচর ও নির্জনতাপ্রেমী প্যাঁচার নির্বাচন বেশ ব্যতিক্রমী। এর পেছনে রয়েছে গভীর পৌরাণিক প্রেক্ষাপট এবং রূপক বা প্রতীকী অর্থ। পৌরাণিক আখ্যানে প্যাঁচার বাহন হিসেবে যুক্ত হওয়ার পেছনে বিভিন্ন লৌকিক ও পৌরাণিক ব্যাখ্যা রয়েছে। একটি জনপ্রিয় পৌরাণিক কাহিনীর মতে, একবার দেবতারা এবং দেবীর বাহনেরা স্বর্গসভায় একত্রিত হয়েছিলেন। সেখানে মা লক্ষ্মী উপস্থিত হলে বিভিন্ন প্রাণী তাকে নানাভাবে নিজেদের বাহন হওয়ার আগ্রহ প্রকাশ করে। কিন্তু দেবী লক্ষ্মী শেষ পর্যন্ত প্যাঁচাকেই তার বাহন হিসেবে বেছে নেন। এর পেছনে মূল কারণ হিসেবে মনে করা হয় প্যাঁচার নিরাসক্ত ভাব এবং তার শান্ত প্রকৃতি। এছাড়া লোককথায় প্রচলিত আছে যে, অন্ধকারের এই পাখিটি দেবী লক্ষ্মীর কৃপায় সমস্ত অন্ধকার ভেদ করে আলোর সন্ধান পায়, যা তাকে দেবীর বাহন হওয়ার যোগ্যতা এনে দেয়।
বাঙালি লোকসংস্কৃতিতে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজার নান্দনিক প্রভাব
বাঙালি সনাতন ধর্মাচার ও লোকসংস্কৃতির এক বিরাট অংশজুড়ে রয়েছে কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা। এটি কেবল একটি নিছক পূজা-পার্বণ নয়, বরং আবহমান বাংলার গ্রামীণ সংস্কৃতি, নান্দনিকতা এবং সামূহিক চেতনার এক দারুণ প্রকাশ।
আলপনা ও গৃহের নান্দনিক রূপায়ণ: লক্ষ্মীপূজাকে কেন্দ্র করে বাঙালি নারীসমাজ তাদের শৈল্পিক প্রতিভার নান্দনিক প্রকাশ ঘটায়। চালের গুঁড়ো জলে গুলে হাতের ছোঁয়ায় উঠোনে, ঘরের মেঝেতে ও দরজার সামনে আঁকা হয় নানা আলপনা। বিশেষ করে দেবীর ছোট ছোট পায়ের ছাপের আলপনা এঁকে বিশ্বাস করা হয় যে, মা লক্ষ্মী স্বয়ং পা রেখে ঘরে প্রবেশ করছেন। এই লোকশিল্প গ্রামীণ নারীদের সৃজনশীলতার এক অনন্য নিদর্শন।
পাঁচালির সুর ও কথকতা: লক্ষ্মীপূজায় দেবীর পাঁচালি পাঠ বাঙালির লোকসাহিত্যের একটি অমূল্য সম্পদ। ঘরে ঘরে প্রদীপের আলোয় নারীরা যখন সমবেত কণ্ঠে পাঁচালি পড়েন, তখন এক আধ্যাত্মিক ও শান্ত পরিবেশের সৃষ্টি হয়। এই পাঁচালিগুলোতে মূলত দেবী লক্ষ্মীর মহিমা, দানশীলতার গল্প এবং ধর্মীয় অনুশাসনের কথা সহজ-সরল ছন্দে ও সুরে তুলে ধরা হয়, যা প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে মৌখিক ঐতিহ্যের মাধ্যমে বাহিত হয়ে আসছে।
নিদ্রাহীন রাত ও জাগরণ উৎসব: কোজাগরী পূর্ণিমার রাতটি বিনিদ্র কাটানোর রাত। শাস্ত্রীয় বিধান ও লোকবিশ্বাসের টানে এই রাতে বাড়ির সবাই (বিশেষ করে গৃহিণীরা) জেগে থাকেন। রাতের এই নিস্তব্ধতায় জেগে থেকে লক্ষ্মীর ব্রত পালন এবং ঈশ্বরের নাম স্মরণের মধ্য দিয়ে পারিবারিক কল্যাণ ও সমৃদ্ধি কামনা করা হয়।
ধান্য ও প্রকৃতির রূপায়ণ: লক্ষ্মীপূজায় মঙ্গলঘটের সঙ্গে নতুন ধানের ছড়া ব্যবহার করা হয়, যা মূলত কৃষিনির্ভর বাঙালির আদিম উৎপাদন সংস্কৃতিরই প্রতিফলন। সোনার ফসল উৎপাদনে প্রকৃতির কৃপা এবং শস্যের দেবীর প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশের মাধ্যম হিসেবে কৃষিজীবী সমাজে এই পূজার গুরুত্ব অপরিসীম।
সংক্ষেপে বলতে গেলে, কোজাগরী লক্ষ্মীপূজা আমাদের লোকজীবন ও আধ্যাত্মিক বিশ্বাসের এমন এক সুতোয় গেঁথে রাখে, যা মানুষের মন থেকে লোভ-অহংকার দূর করে অন্তরে আলো, শান্তি ও সহানুভূতির বীজ বপন করে।
The post আজ লক্ষ্মীকে বরণের দিন first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.





