হামের প্রকোপ ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: সতর্কতা এবং করণীয়
দেশে অতি সম্প্রতি ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে মোট ২২০টি শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ এই পরিসংখ্যান আমাদের সচেতনতার তাগিদ দিচ্ছে। এই উদ্বেগজনক সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে, সঠিক তথ্য জানা, সময়োপযোগী চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা […] The post হামের প্রকোপ ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: সতর্কতা এবং করণীয় first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.
দেশে অতি সম্প্রতি ২৪ ঘণ্টায় হাম ও এর উপসর্গে আরও তিন শিশুর মৃত্যু হয়েছে। গত ১৫ মার্চ থেকে ২০ এপ্রিল সকাল পর্যন্ত হাম এবং এর উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে মোট ২২০টি শিশু। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের সর্বশেষ এই পরিসংখ্যান আমাদের সচেতনতার তাগিদ দিচ্ছে। এই উদ্বেগজনক সময়ে আতঙ্কিত না হয়ে, সঠিক তথ্য জানা, সময়োপযোগী চিকিৎসা এবং প্রতিরোধমূলক ব্যবস্থা গ্রহণ করাই সবচেয়ে জরুরি।
শিশুরা যেকোনো পরিবারের সবচেয়ে বড় আনন্দ এবং একটি দেশের ভবিষ্যৎ। তাই শিশুদের স্বাস্থ্য নিয়ে যেকোনো নেতিবাচক খবর আমাদের গভীরভাবে উদ্বিগ্ন করে তোলে। সম্প্রতি দেশে হামের প্রকোপ বৃদ্ধি পাওয়ার খবরটি প্রতিটি অভিভাবকের মনে গভীর দুশ্চিন্তার জন্ম দিয়েছে। গণমাধ্যমে প্রকাশিত সর্বশেষ সংবাদ অনুযায়ী, দেশে হাম এবং হামের উপসর্গ নিয়ে আক্রান্ত ও মৃত্যুর সংখ্যা ক্রমাগত বাড়ছে। তবে এই পরিস্থিতিতে ভয় পেয়ে বা আতঙ্কিত হয়ে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া ঠিক নয়। বরং বিজ্ঞানভিত্তিক তথ্য, সঠিক পরিসংখ্যান এবং চিকিৎসকদের পরামর্শ অনুযায়ী পদক্ষেপ নিলে এই সংকট থেকে আমাদের শিশুদের নিরাপদে রাখা সম্ভব।
স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের দেওয়া সর্বশেষ পরিসংখ্যানগুলো বিশ্লেষণ করার পাশাপাশি হাম সম্পর্কে কিছু অবগত থাকা জরুরি। যেগুলো জানার মাধ্যমে আমরা সহায়ক প্রস্তুতি বা পদক্ষেপ গ্রহণ করা সহজ হতে পারে।
তথ্য ও পরিসংখ্যান আমাদের পরিস্থিতি বুঝতে এবং সঠিক সিদ্ধান্ত নিতে সাহায্য করে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের হামবিষয়ক হালনাগাদ প্রতিবেদন অনুযায়ী, গত ২০ এপ্রিল সোমবার সকাল ৮টা পর্যন্ত গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে দুই শিশু এবং হামে আক্রান্ত হয়ে এক শিশুর মৃত্যু হয়েছে। পরিসংখ্যানটি আরও একটু বিস্তারিতভাবে দেখলে পরিস্থিতির ব্যাপকতা সম্পর্কে ধারণা পাওয়া যায়। গত ১৫ মার্চ থেকে দেশে হামের প্রকোপ একটি উল্লেখযোগ্য আকার ধারণ করেছে। এখন পর্যন্ত হামে আক্রান্ত হয়ে নিশ্চিতভাবে ৩৭টি শিশুর মৃত্যু হয়েছে। অন্যদিকে, হামের উপসর্গ নিয়ে প্রাণ হারিয়েছে আরও ১৮৩টি শিশু। অর্থাৎ, মার্চ মাসের মাঝামাঝি থেকে এখন পর্যন্ত মোট ২২০টি অমূল্য প্রাণ ঝরে গেছে এই ভাইরাসের কারণে। অতি সাম্প্রতিক ২৪ ঘণ্টার চিত্রটিও আমাদের সতর্ক হওয়ার বার্তা দেয়। এই সময়ে সারা দেশে ১ হাজার ১৭০টি শিশুর শরীরে হামের উপসর্গ দেখা গেছে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি করতে হয়েছে ৮৪৬টি শিশুকে। এ ছাড়া, গত ২৪ ঘণ্টায় নতুন করে ১৭৪টি শিশুর শরীরে হাম শনাক্ত হয়েছে।
পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যায়, দেশের কিছু নির্দিষ্ট অঞ্চলে এর প্রভাব তুলনামূলকভাবে বেশি। বিশেষ করে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে আক্রান্ত এবং মৃত্যুর হার উদ্বেগজনক। গত ২৪ ঘণ্টায় যে শিশুটি হামে আক্রান্ত হয়ে মারা গেছে, সেই শিশুটিও ঢাকা বিভাগের। আর হামের উপসর্গ নিয়ে মৃত্যুর ঘটনাগুলো ঘটেছে ঢাকা ও চট্টগ্রাম বিভাগে।
গত ২৪ ঘণ্টায় হাসপাতালে যে ৮৪৬টি শিশু ভর্তি হয়েছে, তার মধ্যে ৩৮২টি শিশুই ঢাকা বিভাগের। এই তথ্যগুলো থেকে বোঝা যায়, জনবহুল এলাকাগুলোতে সংক্রমণ দ্রুত ছড়িয়ে পড়ছে। তাই এসব অঞ্চলের অভিভাবকদের বাড়তি সতর্কতা অবলম্বন করা প্রয়োজন।
যেকোনো সংকটের ভেতরেই আশার আলো লুকায়িত থাকে। এই প্রকাশিত প্রতিবেদনের তথ্যগুলোতে একটি অত্যন্ত ইতিবাচক এবং স্বস্তিদায়ক তথ্য রয়েছে, যা অভিভাবকদের মনে কিছুটা সাহস জোগাবে। স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, গত ২৪ ঘণ্টায় হামের উপসর্গ নিয়ে হাসপাতালে ভর্তি হওয়া ৮৬২টি শিশু সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে গেছে। এর মধ্যে ঢাকা বিভাগেরই রয়েছে ৩৭০টি শিশু। যদি আমরা গত ১৫ মার্চ থেকে হিসাব করি, তবে এখন পর্যন্ত হামের উপসর্গ দেখা গেছে মোট ২৪ হাজার ৭৭৬টি শিশুর মধ্যে। এর মধ্যে হাসপাতালে ভর্তি হয়েছিল ১৬ হাজার ১৭২টি শিশু (যাদের মধ্যে ৩ হাজার ৬১৭ জনের হাম শনাক্ত হয়)। সবচেয়ে বড় স্বস্তির বিষয় হলো, সঠিক চিকিৎসায় ইতোমধ্যে ১৩ হাজার ২৫৮ জন রোগী হাসপাতাল থেকে সম্পূর্ণ সুস্থ হয়ে ছাড়পত্র পেয়েছে। এই বিপুলসংখ্যক শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠা প্রমাণ করে যে, সময়মতো সঠিক চিকিৎসা পেলে হাম থেকে সম্পূর্ণ মুক্তি পাওয়া সম্ভব।
প্রকাশিত প্রতিবেদনে ‘হামে আক্রান্ত’ এবং ‘হামের উপসর্গ’— এই দুটি বিষয় আলাদাভাবে উল্লেখ করা হয়েছে। চিকিৎসা বিজ্ঞানের দৃষ্টিকোণ থেকে এই পার্থক্যটি খুবই গুরুত্বপূর্ণ। শরীরে র্যাশ বা লালচে দানা বের হওয়া এবং জ্বর থাকার মানেই নিশ্চিতভাবে হাম নয়। অন্যান্য কিছু ভাইরাল সংক্রমণেও একই ধরনের লক্ষণ দেখা দিতে পারে। ল্যাবরেটরি পরীক্ষার মাধ্যমে যখন ভাইরাসের উপস্থিতি নিশ্চিত করা হয়, তখনই তাকে ‘হাম শনাক্ত’ বলা হয়। অন্যদিকে, পরীক্ষা করার সুযোগ না পেলে বা ফলাফল আসার আগে রোগের বাহ্যিক লক্ষণগুলো দেখে তাকে ‘হামের উপসর্গ’ হিসেবে চিহ্নিত করা হয়। চিকিৎসকেরা সব সময়ই লক্ষণ দেখা দেওয়ার সঙ্গে সঙ্গে চিকিৎসা শুরু করার ওপর জোর দেন, যাতে রোগ জটিল আকার ধারণ করতে না পারে।
হাম (Measles) অত্যন্ত ছোঁয়াচে একটি ক্ষতিকর রোগ, যা রুবিওলা (Rubeola) নামক ভাইরাসের কারণে হয়ে থাকে। এটি মূলত রোগীর শ্বাসতন্ত্রে আক্রমণ করে এবং পরে সারা শরীরে ছড়িয়ে পড়ে। সংক্রমিত ব্যক্তির হাঁচি বা কাশির মাধ্যমে এই ভাইরাস বাতাসে ছড়ায় এবং খুব সহজেই অন্যকে আক্রান্ত করতে পারে। শিশুদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা বয়স্কদের তুলনায় কম থাকে বলে তারা সহজেই এই ভাইরাসের শিকার হয়। বিশেষ করে যেসব শিশু অপুষ্টিতে ভুগছে বা যাদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল, তাদের ক্ষেত্রে হাম মারাত্মক রূপ নিতে পারে। হামের কারণে নিউমোনিয়া, মস্তিষ্কে প্রদাহ (এনসেফালাইটিস) এবং ডায়রিয়ার মতো গুরুতর স্বাস্থ্য জটিলতা দেখা দিতে পারে, যা অনেক সময় প্রাণঘাতী হয়ে ওঠে।
প্রাথমিক অবস্থায় রোগ শনাক্ত করা গেলে বিপদ অনেকটাই এড়ানো যায়। হামের লক্ষণগুলো সাধারণত ভাইরাস শরীরে প্রবেশের ১০ থেকে ১৪ দিন পর প্রকাশ পায়। অভিভাবকদের উচিত নিচের উপসর্গগুলোর দিকে সতর্ক দৃষ্টি রাখা: ১. তীব্র জ্বর: হামের শুরুতে শিশুর অনেক বেশি জ্বর আসতে পারে। ২. সর্দি ও কাশি: নাক দিয়ে পানি পড়া, হাঁচি এবং শুকনো কাশি দেখা দেয়। ৩. চোখ লাল হওয়া: চোখ লাল হয়ে যেতে পারে এবং আলোতে তাকাতে শিশুর কষ্ট হতে পারে। ৪. মুখের ভেতরে দাগ: জ্বরের কয়েক দিন পর গালের ভেতরের দিকে ছোট ছোট সাদা দাগ (Koplik’s spots) দেখা যেতে পারে। ৫. ত্বকে র্যাশ বা লালচে দানা: জ্বর শুরু হওয়ার ৩ থেকে ৫ দিন পর শরীরে লালচে দানা বা র্যাশ বের হতে শুরু করে। সাধারণত এটি মুখমণ্ডল ও কানের পেছন থেকে শুরু হয়ে ধীরে ধীরে পুরো শরীরে ছড়িয়ে পড়ে।
হাম থেকে বাঁচার সবচেয়ে কার্যকর, নিরাপদ এবং বিজ্ঞানসম্মত উপায় হলো টিকাদান। স্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞদের মতে, সঠিক সময়ে শিশুকে হামের টিকা দিলে এই রোগটি প্রায় সম্পূর্ণভাবে প্রতিরোধ করা সম্ভব। তাই আপনার শিশুর টিকার কোর্স সম্পন্ন হয়েছে কি না, তা নিশ্চিত করুন। যদি কোনো কারণে টিকা দেওয়া বাদ পড়ে থাকে, তবে দ্রুত নিকটস্থ স্বাস্থ্যকেন্দ্রে যোগাযোগ করুন।
হামে আক্রান্ত হলে আতঙ্কিত না হয়ে ধৈর্য ও সতর্কতার সঙ্গে পরিস্থিতি মোকাবিলা করা জরুরি। শিশুর শরীরে হামের কোনো লক্ষণ দেখা দিলে একদম দেরি না করে দ্রুত একজন রেজিস্টার্ড চিকিৎসকের পরামর্শ নিতে হবে। মনে রাখবেন, নিজের খেয়ালখুশি মতো কোনো ওষুধ বা অ্যান্টিবায়োটিক খাওয়ানো শিশুর জন্য বিপজ্জনক হতে পারে। আক্রান্ত শিশুর দ্রুত সুস্থতার জন্য পর্যাপ্ত বিশ্রামের পাশাপাশি তার খাবারের দিকেও বিশেষ নজর দিতে হবে। শরীরে যেন পানিশূন্যতা না হয়, সে জন্য তাকে বেশি বেশি তরল খাবার যেমন— খাবার স্যালাইন, ডাবের পানি, ফলের রস এবং প্রচুর পরিমাণে পানি পান করাতে হবে।
গবেষণায় দেখা গেছে যে, শরীরে ভিটামিন ‘এ’-এর অভাব থাকলে হামের জটিলতা অনেক বেড়ে যায়; তাই চিকিৎসকের পরামর্শ অনুযায়ী শিশুকে ভিটামিন ‘এ’ ক্যাপসুল খাওয়ানো যেতে পারে। যেহেতু হাম একটি অত্যন্ত ছোঁয়াচে রোগ, তাই পরিবারের অন্য শিশুদের নিরাপদ রাখতে আক্রান্ত শিশুকে কিছুদিন আলাদা বা আইসোলেশনে রাখা বুদ্ধিমানের কাজ। এতে সংক্রমণ ছড়ানোর ঝুঁকি যেমন কমে, তেমনি শিশুও নিরিবিলি পরিবেশে দ্রুত সেরে ওঠার সুযোগ পায়।
গণমাধ্যমে প্রকাশিত প্রতিবেদনটির তথ্য আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয় যে, স্বাস্থ্য সুরক্ষার ক্ষেত্রে অবহেলার কোনো সুযোগ নেই। ২২০টি শিশুর মৃত্যু আমাদের জন্য এক অপূরণীয় ক্ষতি। তবে আমরা যদি ১৩ হাজার ২৫৮টি শিশুর সুস্থ হয়ে ওঠার পরিসংখ্যানের দিকে তাকাই, তবে আমরা আশা এবং ভরসা খুঁজে পাই। সঠিক সময়ে চিকিৎসকের শরণাপন্ন হওয়া এবং চিকিৎসকদের নির্দেশনা অক্ষরে অক্ষরে পালন করা— এই দুটি বিষয়ের কোনো বিকল্প নেই।
আসুন, আমরা নিজেরা সচেতন হই এবং চারপাশের মানুষকে সচেতন করি। গুজবে কান না দিয়ে বা আতঙ্ক না ছড়িয়ে তথ্য ও প্রমাণের ওপর ভিত্তি করে সিদ্ধান্ত নিই। আমাদের সম্মিলিত সচেতনতা, স্বাস্থ্যকর্মীদের নিরলস প্রচেষ্টা এবং সঠিক চিকিৎসার মাধ্যমেই আমাদের শিশুরা এই সংকট থেকে মুক্তি পাবে। সুস্থতা এবং সুরক্ষার আলোয় বেড়ে উঠুক আমাদের আগামী প্রজন্ম।
লেখক: জনস্বাস্থ্য কর্মী ও প্রশিক্ষক
The post হামের প্রকোপ ও শিশুদের স্বাস্থ্যঝুঁকি: সতর্কতা এবং করণীয় first appeared on Sarabangla | Breaking News | Sports | Entertainment.







