৪ বছরে পুড়েছে ৫২৩টি স্যাটেলাইট

স্যাটেলাইটের সঙ্গে পুড়ছে স্টারলিংক বসের কপাল; নতুন ঝুঁকির শঙ্কা

স্যাটেলাইটের সঙ্গে পুড়ছে স্টারলিংক বসের কপাল; নতুন ঝুঁকির শঙ্কা
১০ জুন, ২০২৫ ০৯:৫০  
১০ জুন, ২০২৫ ১২:৫৪  

সূর্যের অগ্ন্যুৎপাত ও সৌরঝড়ের প্রভাবে পৃথিবীর কক্ষপথে ঘুরে বেড়ানো উপগ্রহগুলোর আয়ু কমে যাচ্ছে। এতে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে  স্পেসএক্সের স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো।  নিম্ন কক্ষপথে উড়ন্ত স্যাটেলাইটের তথ্য-উপাত্ত ঘেঁটে এই প্রমাণ পেয়েছেন মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের মহাকাশ গবেষণা সংস্থা- নাসার গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টারের বিজ্ঞানীরা। 

নাসা গডার্ড স্পেস ফ্লাইট সেন্টার এবং ইউনিভার্সিটি অফ মেরিল্যান্ডের গডার্ড প্ল্যানেটারি হেলিওফিজিক্স ইনস্টিটিউটের তিনজন হেলিওফিজিসিস্ট ও স্যাটেলাইট ট্র্যাকার থেকে এই তথ্য দিয়েছেন গবেষণায় সংশ্লিষ্ট বিজ্ঞানী ডেনি অলিভেইরা, এফটিহিয়া জেস্টা এবং ক্যাথরিন গার্সিয়া স্যাজ। ২০২০ থেকে ২০২৪ সাল পর্যন্ত, সৌর চক্রের ক্রমবর্ধমান পর্যায়ে স্টারলিংক স্যাটেলাইটের ডেটা বিশ্লেষণ করে arXiv প্রিপ্রিন্ট সার্ভারে তাদের গবেষণাপত্রটি প্রকাশ করেছেন।

এই গবেষণাপত্রটি এমন সময়ে প্রকাশিত হলো যখন স্টারলিংক অধিকর্তা ইলন মাস্ক ব্যক্তিগত জীবনে বিতর্ক, আর পেশাগত দুনিয়ায় বেসামাল অবস্থায় রয়েছেন। বন্ধুত্বে বিরাট ফাটল সৃষ্টি হয়ে যখন ট্রাম্প-মাস্ক যুদ্ধ প্রকাশ্যে এসেছে, ঠিক তখনই সবচেয়ে বড় মহাকাশ প্রকল্প স্টারলিংক পড়েছে সূর্যের খপ্পরে। সূর্যের বাড়তি রোদের ঝলকে একের পর এক স্যাটেলাইট কক্ষপথ হারিয়ে ভূপতিত হচ্ছে।

যুক্তরাজ্যের জনপ্রিয় বিজ্ঞানভিত্তিক সাময়িকী নিউ সায়েন্টিস্ট-এ প্রকাশিত এক প্রতিবেদনে বলা হয়, সৌরচক্রের সর্বোচ্চ পর্যায় ‘সোলার ম্যাক্সিমাম’-এর সময় সূর্যের সক্রিয়তা ব্যাপকভাবে বৃদ্ধি পায়। এতে সৃষ্টি হয় ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়, যা পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলকে উত্তপ্ত করে ও তা প্রসারিত হয়ে উপগ্রহগুলোর ওপর বাড়তি চাপ সৃষ্টি করে। ফলে স্যাটেলাইটগুলোর কক্ষপথ ধীরে ধীরে নিচের দিকে নামতে থাকে এবং তারা পূর্বাভাসের চেয়ে দ্রুতপূর্বক বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে পুড়ে যায়। এমন পরিস্থিতিতে গবেষকরা বলছেন, আগামীর পৃথিবীতে মহাকাশকে নিরাপদ রাখতে হলে সূর্যচক্রের এই স্বাভাবিক গতিবিধি মাথায় রেখেই স্যাটেলাইট ডিজাইন করতে হবে। না হলে কক্ষপথে সংঘর্ষ, তথ্য বিপর্যয় এবং প্রযুক্তির ব্যাঘাত সবই হঠাৎ করে সামনে এসে দাঁড়াতে পারে।

ফিজিক্স অর্গ এর তথ্য বলছে, গবেষণা দল তাদের ডেটা দেখে জানতে পেরেছে যে ভূ-চৌম্বকীয় আকর্ষণ বাড়ার সাথে সাথে স্টারলিঙ্ক স্যাটেলাইটগুলো স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় দ্রুত পৃথিবীর বায়ুমণ্ডলে মিলিয়ে যাচ্ছে। এই স্যাটেলাইটগুলো প্রায় পাঁচ বছর কক্ষপথে থাকার জন্য নকশা করা হলেও গবেষণায় দেখা গেছে যে তীব্র ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সময়, চূড়ান্ত অবতরণ পর্ব—প্রায় ২৮০ কিমি উচ্চতা থেকে বায়ুমণ্ডলে টিকে থাকার সময় স্বাভাবিক সময়ের তুলনায় ১০ থেকে ১২ দিন কমে গেছে।  

১০ দিন পর্যন্ত কমে যেতে পারে স্যাটেলাইটের আয়ু

নাসার হেলিওফিজিসিস্ট গবেষণা দলের প্রধান অলিভেইরা বলেন, ‘আমরা দেখেছি, ভূ-চৌম্বকীয় ঝড়ের সময় উপগ্রহগুলো আশানুরূপ সময় টিকে থাকতে পারছে না। এমনকি তাদের আয়ু ১০ দিন পর্যন্ত কমে যেতে পারে।’  তিনি জানান, ২০২৪ সালের শেষ দিকে এমন একটি তীব্র সৌরঝড়ের ঘটনায় ৩৭টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট মাত্র পাঁচ দিনের মাথায় কক্ষপথ থেকে সরে গিয়ে বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে। স্বাভাবিক অবস্থায় এসব স্যাটেলাইট ১৫ দিন বা তারও বেশি সময় কক্ষপথে থাকার কথা ছিল।

স্টারলিংকের ৫২৩টি স্যাটেলাইট ইতোমধ্যে পুড়ে গেছে

২০২০ সাল থেকে ২০২৪ সালের মধ্যে স্পেসএক্সের মোট ৫২৩টি স্টারলিংক স্যাটেলাইট পুনরায় বায়ুমণ্ডলে ঢুকে পড়ে এবং সম্পূর্ণভাবে পুড়ে যায়। প্রতিটি স্যাটেলাইট এরকমভাবে ধ্বংসের জন্যই ডিজাইন করা, যাতে পৃথিবীর মাটিতে তা পড়ে কোনো ক্ষতি না করে। তবে বিজ্ঞানীরা বলছেন, এখন যেভাবে প্রতি সপ্তাহে নতুন স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করা হচ্ছে, ভবিষ্যতে প্রায় প্রতিদিনই কোনো না কোনো স্যাটেলাইট পুড়ে ধ্বংস হবে।

স্পেসএক্স ইতোমধ্যে ৭ হাজারের বেশি স্টারলিংক স্যাটেলাইট উৎক্ষেপণ করেছে এবং ভবিষ্যতে ৩০ হাজারের বেশি স্যাটেলাইট কক্ষপথে স্থাপনের পরিকল্পনা রয়েছে।

হুমকি না উপকার?

তবে এতে ক্ষতির পাশাপাশি কিছু উপকারও থাকতে পারে বলে মত দিয়েছেন যুক্তরাজ্যের বার্মিংহাম বিশ্ববিদ্যালয়ের বিজ্ঞানী শন এলভিজ। তিনি বলেন, ‘মৃত বা অকেজো স্যাটেলাইটগুলো কক্ষপথ থেকে সরিয়ে নেওয়া গেলে তা সংঘর্ষের ঝুঁকি কমাবে। তবে ৪০০ কিলোমিটারের নিচের কক্ষপথে স্যাটেলাইট পরিচালনা করা কঠিন হয়ে যাবে।’

তবে আরেকটি সম্ভাব্য উদ্বেগের বিষয় হলো, যদি স্যাটেলাইটগুলো দ্রুত বায়ুমণ্ডলে প্রবেশ করে, তবে সেগুলো সম্পূর্ণভাবে না পুড়ে কিছু টুকরো পৃথিবীতে পড়ে যেতে পারে।

২০২৪ সালের আগস্টে কানাডার সাসকাচোয়ানের একটি খামারে স্টারলিংকের ২.৫ কেজির একটি ধ্বংসাবশেষ পাওয়া যায়। এটিই এখন পর্যন্ত একমাত্র নিশ্চিত উদাহরণ, যেখানে স্টারলিংকের স্যাটেলাইটের টুকরো বায়ুমণ্ডলে পুড়ে না গিয়ে পৃথিবীতে এসে পৌঁছায়।

বিশেষজ্ঞদের মতে, সৌরচক্রের বর্তমান উত্থানকালে এই ধরনের ঘটনা আরও বাড়বে, যা আগামী কয়েক বছর স্যাটেলাইট শিল্পের জন্য নতুন চ্যালেঞ্জ তৈরি করতে পারে। এছাড়াও স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো অপেক্ষাকৃত সস্তা, হালকা এবং গণহারে তৈরি। এগুলোর কক্ষপথ ঠিক রাখতে বেশি উন্নত প্রযুক্তি ব্যবহৃত হয়নি। ফলে সূর্যের বাড়তি চাপ এলে তারা সহজেই নিচে নামতে শুরু করে।

এ প্রসঙ্গে বেইজিংভিত্তিক মহাকাশবিষয়ক ম্যাগাজিন 'অ্যারোস্পেস নলেজ'-এর প্রধান সম্পাদক ওয়াং ইয়ানান বলেছেন, “যখন সূর্যের সক্রিয়তা বাড়ে, তখন বায়ুমণ্ডলের উচ্চতা বাড়ে। ফলে নিচু কক্ষপথের স্যাটেলাইটগুলো বায়ুর সঙ্গে বেশি ঘর্ষণে পড়ে, কক্ষপথে থাকাটা কঠিন হয়ে পড়ে।”

ভাগ্য ভালো, স্টারলিংক স্যাটেলাইটগুলো পৃথিবীর মাটিতে পড়ে বড় কোনো ক্ষতি করছে না। কারণ, সেগুলো উচ্চতর বায়ুমণ্ডলে ঢুকেই পুরোপুরি পুড়ে যাচ্ছে। তবে সমস্যা অন্য জায়গায় অন্য মহাকাশযান বা নতুন উৎক্ষেপণকৃত স্যাটেলাইটের জন্য এই ধরণের অনিয়ন্ত্রিত পতন এক নতুন ঝুঁকি তৈরি করছে।