এআই খাতে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলারের বিনিয়োগ, অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে শঙ্কা
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (এআই) ঘিরে বিশ্বজুড়ে শুরু হয়েছে বিপুল বিনিয়োগের প্রতিযোগিতা। ডেটা সেন্টার নির্মাণ, উন্নত চিপ তৈরি এবং এআই অবকাঠামো গড়ে তুলতে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলো যে পরিমাণ অর্থ ব্যয় করছে, তা ছাড়িয়ে যাচ্ছে অতীতের অনেক বড় প্রযুক্তিগত বিনিয়োগকেও।
আন্তর্জাতিক গবেষণা সংস্থা পিডব্লিউসির পূর্বাভাস অনুযায়ী, ২০৫০ সালের মধ্যে বিশ্বজুড়ে শুধু ডেটা সেন্টার নির্মাণেই ব্যয় হতে পারে ৩০ ট্রিলিয়ন ডলার, যা ৩০ লাখ কোটি ডলারের সমান।
এআই খাতের অন্যতম শীর্ষ প্রতিষ্ঠান অ্যানথ্রোপিকও আগামী বছরগুলোতে প্রায় ৫১৮ বিলিয়ন ডলার বিনিয়োগের পরিকল্পনা করেছে বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে।
প্রতিষ্ঠানটির সম্ভাব্য বার্ষিক আয়ের তুলনায় এই ব্যয়ের পরিমাণ প্রায় ১০০ গুণ। তবে বিনিয়োগের এমন বিশাল অঙ্কের বিপরীতে অর্থনীতিতে কতটা বাস্তব সুফল আসবে, তা নিয়ে প্রশ্ন তুলছেন অর্থনীতিবিদেরা।
বিনিয়োগ বাড়ছে, উৎপাদনশীলতা কি বাড়ছে?
আন্তর্জাতিক আর্থিক প্রতিষ্ঠান জেপি মরগানের বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এআই খাতে সবচেয়ে বেশি বিনিয়োগ করা যুক্তরাষ্ট্রেও এখন পর্যন্ত উৎপাদনশীলতা বৃদ্ধির প্রত্যাশিত প্রভাব স্পষ্ট নয়। ফলে এআই প্রতিষ্ঠানগুলোর উচ্চ বাজারমূল্য ধরে রাখা নিয়েও অনিশ্চয়তা তৈরি হচ্ছে।
পরামর্শক প্রতিষ্ঠান বেইন অ্যান্ড কোম্পানির হিসাব বলছে, এআই অবকাঠামোতে বিনিয়োগের ব্যয় সামাল দিতে বড় প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোকে আগামী পাঁচ বছরে অতিরিক্ত ৪ দশমিক ২ ট্রিলিয়ন ডলার আয় করতে হবে। কিন্তু এত বিপুল বিনিয়োগের বিপরীতে প্রয়োজনীয় আয় নিশ্চিত করা কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সংশয় রয়েছে।
ইতিহাসেও দেখা গেছে, বাষ্পীয় ইঞ্জিন কিংবা ইন্টারনেটের মতো যুগান্তকারী প্রযুক্তি আবিষ্কারের পরপরই অর্থনীতিতে তার পূর্ণ সুফল আসেনি। এসব প্রযুক্তির প্রভাব উৎপাদনশীলতায় স্পষ্ট হতে ১০ থেকে ৫০ বছর পর্যন্ত সময় লেগেছে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ধরনের দীর্ঘ সময়ের প্রয়োজন হতে পারে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকেরা।
শ্রমবাজারে এরই মধ্যে প্রভাব
এআইয়ের অর্থনৈতিক সুফল নিয়ে অনিশ্চয়তা থাকলেও শ্রমবাজারে এর প্রভাব ইতিমধ্যে দৃশ্যমান হতে শুরু করেছে। স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের এক গবেষণায় দেখা গেছে, হিসাবরক্ষণ ও আইনি সহায়তার মতো এআইয়ের প্রভাবে পরিবর্তিত হতে পারে- এমন পেশায় নবীন কর্মীদের নিয়োগ প্রায় ১৯ শতাংশ কমেছে।
অন্যদিকে প্রযুক্তি খাতের নির্বাহীদের একটি অংশ মনে করছেন, এআইয়ের স্বয়ংক্রিয় উন্নয়ন বা ‘রিকার্সিভ সেলফ-ইমপ্রুভমেন্ট’ প্রযুক্তির অগ্রগতিকে আরও দ্রুত করবে। অর্থাৎ এআই নিজেই নিজের সক্ষমতা বাড়াতে পারলে নতুন প্রযুক্তি উদ্ভাবন ও অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধির গতি অনেক বেড়ে যেতে পারে।
বড় বিনিয়োগের ঝুঁকি, ভবিষ্যতের অবকাঠামো
এআই খাতে বিপুল বিনিয়োগের কারণে নতুন করে আর্থিক বুদ্বুদ তৈরির আশঙ্কাও উড়িয়ে দিচ্ছেন না অর্থনীতিবিদেরা। বিনিয়োগের তুলনায় আয় কম হলে প্রযুক্তি প্রতিষ্ঠানগুলোর ওপর আর্থিক চাপ তৈরি হতে পারে। বিশেষ করে ডেটা সেন্টার, বিদ্যুৎ সরবরাহ ও কম্পিউটিং অবকাঠামো নির্মাণে ব্যয় করা বিপুল অর্থের প্রত্যাশিত মুনাফা না এলে ঝুঁকি আরও বাড়বে।
তবে বিশ্লেষকদের মতে, বিনিয়োগের তাৎক্ষণিক আর্থিক সুফল নিয়ে প্রশ্ন থাকলেও এর দীর্ঘমেয়াদি গুরুত্ব অস্বীকার করার সুযোগ নেই। অতীতে রেলপথ ও ইন্টারনেটের বিস্তারেও বড় ধরনের বিনিয়োগ ও আর্থিক ঝুঁকি তৈরি হয়েছিল। কিন্তু শেষ পর্যন্ত এসব অবকাঠামোই বিশ্ব অর্থনীতির গুরুত্বপূর্ণ ভিত্তি হয়ে উঠেছে। এআইয়ের ক্ষেত্রেও একই ঘটনা ঘটতে পারে।
ডিবিটেক/বিএমটি





