২০ ভাগ কম দামে দেশীয় প্রযুক্তিতে রেল কাটার বানালেন সাবেক রুয়েটিয়ান
জার্মানি থেকে ৫-৭ লাখ টাকা দিয়ে আমদানি করা ‘রেল কাটিং মেশিন’ মাত্র ২৭ হাজার ৫শ টাকা খরচ করে দেশীয় প্রযুক্তিতে কারিগরি বিদ্যা প্রয়োগ করে বানিয়ে ফেলেছেন রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের প্রাক্তন ছাত্র, প্রকৌশলী নাজিব কায়সার বিন্দু। পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের প্রকৌশলী হিসেবে কর্মরত এই প্রকৌশলী রেলওয়ের প্রকৌশল বিভাগের নিজস্ব ওয়ার্কশপে রেলওয়ে কর্মচারীদের সহায়তা রেললাইন কাটার এই যন্ত্রটি তৈরি করেছেন। এরপর এই রেল কাটিং মেশিন দিয়ে মাত্র ১ মিনিট ২০ সেকেন্ডে একটি রেল প্রস্থ বরাবর কাটতে সক্ষম হয়েছেন তারা। অর্থাৎ আমদানী করা কাটিং মেশিন থেকে অন্তত ২০ ভাগ কম দামে একই মানের মেশিন উৎপাদন করতে সক্ষম হয়েছেন বাংলাদেশী প্রকৌশলী।
রেললাইনে যাত্রীবাহী ট্রেন কিংবা মালবাহী ট্রেন লাইনচ্যুত হওয়ার পরে রেললাইনে ফাটল ধরা, বেঁকে যাওয়ার মতো নানা কারণে রেললাইন মেরামত করতে প্রায়ই রেল কাটিং মেশিন লাগে মাঠ কর্মীদের। তাদের সেই প্রয়োজন মেটাতে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগে বিভাগীয় প্রকৌশলী-২ হিসেবে পাবনার ঈশ্বরদী উপজেলার রেলওয়ের বিভাগীয় সদর দপ্তরে কর্মরত বিন্দু গত ৬ অক্টোবর এই মেশিনটি বানানো কাজ শুরু করেন। ১৬ অক্টোবর শেষ হয় রেল কাটিং মেশিন বানানোর কাজ। এরপর মেশিন ব্যবহারে দেখা গেছে, এই রেল কাটিং মেশিন দিয়ে মাত্র ১ মিনিট ২০ সেকেন্ডে একটি রেল প্রস্থ বরাবর কাটা যায়।
দেশেই তৈরি করা রেল কাটিং মেশিন নিয়ে পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী মুহাম্মদ আবু জাফর জানান, ব্রিটিশ আমলে হেচকো ব্লেড দিয়ে রেললাইন কাটতে ১ থেকে দেড় ঘণ্টা সময় লাগতো। জার্মানি থেকে আমদানি করা মেশিনে কয়েক মিনিট সময় লাগতো, দেশীয় প্রযুক্তি ব্যবহার করে এই কাটিং মেশিনটি দিয়ে আমরা ১ মিনিট ১৫ সেকেন্ড সময়ে একটি রেলকে প্রস্থ বরাবর কাটা যাচ্ছে। এতে সময় সাশ্রয় হচ্ছে। আবার বিদেশ থেকে আমদানি নির্ভরতাও কমেছে।
কম খরচে, দেশীয় প্রযুক্তি ও কারিগরি সহায়তায় উদ্ভাবিত রেল কাটিং মেশিনটি যদি টেকসই হয়, তাহলে ঈশ্বরদী ওয়ার্কসপ থেকে সরকারি খরচে রেল কাটিং মেশিন তৈরি করা হবে বলে জানিয়ছেন পশ্চিমাঞ্চল রেলওয়ের পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের ব্যবস্থাপক (ডিআরএম) লিয়াকত শরীফ খান।
বাংলাদেশ রেলওয়ের মহাপরিচালক (ডিজি) আফজাল হোসেন জানান, পাকশী বিভাগীয় রেলওয়ের প্রকৌশলী-২ নাজিব কায়সার যে উদ্ভাবন করেছেন তা নিঃসন্দেহে ভালো কাজ এবং প্রশংসার দাবিদার। এখন ব্যক্তিগত উদ্যোগে উদ্ভাবন করেছে রেল কাটিং মেশিনটি। যদি মাঠ পর্যায়ে সফলভাবে ব্যবহার করা সম্ভব হয়, টেকসই হয়, তাহলে সরকারি উদ্যোগে তৈরি করে পশ্চিম ও পুর্বাঞ্চল রেলওয়েতে সাপ্লাই দেওয়া হবে।
নিজের উদ্ভাবন বিষয়ে প্রকৌশলী নাজিব কায়সার বিন্দু জানান, এই রেল কাটিং মেশিনের বিশেষত্ব হলো, এই মেশিনে যেকোনো সাইজের কাটিং ডিস্ক ব্যবহার করা যায়। মেশিনটি রেললাইনে ট্রেন লাইনচ্যুত কিংবা কোনো দুর্ঘটনা ঘটলে রেল কর্মচারীদের তাৎক্ষণিক রেললাইন কাটতে সাহায্য করে। মাত্র ১ মিনিট ২০ সেকেন্ড সময়ে রেল লাইন দ্বিখণ্ডিত করা যায়। ৭.৫ অশ্বশক্তির পেট্রোল ইঞ্জিন চালিত পোর্টেবল মেশিনটির ওজন প্রায় ৩৫ কেজি। প্রথম বানাতে ১১ দিন সময় লাগলেও যদি যন্ত্রাংশ বাজারে সহজে পাওয়া যায়, এ রেল কাটিং মেশিন বানাতে সর্বোচ্চ পাঁচদিন সময় লাগবে।
রেল কাটিং মেশির ছাড়াও একটি ড্রিল মেশিন তৈরি করেছেন নাজিব কায়সার। ওই মেশনটি বিদেশ থেকে আমদানি করতে ১০ লাখ লাগলেও তিনি সেটি মাত্র ৫০ হাজার টাকায় বানিয়েছেন।
প্রকৌশলী নাজিব কায়সার বলেন, আমি দেশকে ভালোবাসি। তাই দেশের টাকা দেশে রাখার ইচ্ছে থেকে আমার মূলত দেশীয় প্রযুক্তিতে রেল কাটিং বানানোর ইচ্ছে ছিল দীর্ঘদিন থেকে। সেই ইচ্ছাকে বাস্তবে রূপ দিয়েছি।
প্রকৌশলী নাজিব কায়সারের জন্ম ও বেড়ে ওঠা রাজশাহী শহরে। ১৯৮৯ সালের ২৬ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন তিনি। শৈশব-কৈশোর কেটেছে বাবার চাকরিসূত্রে বিভিন্ন সুগার মিল কলোনিতে। নর্থ বেঙ্গল সুগার মিল, ঠাকুরগাঁও সুগার মিল, রংপুর সুগার মিল ও শ্যামপুর সুগার মিল কলোনিতে কেটেছে তার শৈশব। তার বাবা বাংলাদেশ চিনি ও খাদ্যশিল্প করপোরেশনের মহাব্যবস্থাপক ছিলেন। নাজিমুল হক ও লুৎফেয়ারা বেগম দম্পতির একমাত্র সন্তান তিনি। শিক্ষা জীবনে তিনি ২০০৫- ০৬ সেশনে রাজশাহী প্রকৌশল ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয় থেকে সিভিল ইঞ্জিনিয়ারিং বিভাগ থেকে স্নাতক পাস করে ৩৩তম বিসিএসের মাধ্যমে ২০১৪ সালে বাংলাদেশ রেলওয়েতে সহকারী নির্বাহী প্রকৌশলী হিসেবে যোগদান করেন।







