আমাদের গৌরবময় টেক-সই ‘বিজয়’

১৫ ডিসেম্বর, ২০২৩ ২২:২০  

ইমদাদুল হক নির্বাহী সম্পাদক, ডিজিবাংলাটেক.নিউজ

বাংলাদেশের স্বাধীনতার সুবর্ণজয়ন্তী উদ্‌যাপিত হলো দুই বছর আগে। ১৯৭১ সালে ৯ মাসের একটি রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধের মধ্য দিয়ে উদিত হয় বিজয়ের লাল সূর্য। আমাদের স্বাধীনতা শুধু একটি ভূখণ্ডের নয়, নয় একটি মানবগোষ্ঠীর; সে বিজয় একটি চেতনার, একটি সংগ্রামের, একটি ইতিহাসের।

সেই ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে এখনো প্রতিধ্বনিত হয় দিনবদলের ডাক। জানি, অন্তরায় অনেক; তারপরও তথ্যপ্রযুক্তিকে আলিঙ্গন করে এগিয়ে যাচ্ছে দেশ। তরুণসমাজের কর্মকুশলতা, সৃজনশীলতা ও সৃষ্টিশীলতায় অর্থবহ হয়ে উঠছে গৌরবময় ‘বিজয়’। এক্ষেত্রে প্রযুক্তি সেবা সম্প্রসারণে কম্পিউটার, ইন্টারনেট ও যন্ত্রপাতির দৃশ্যমান অবস্থান উন্নয়ন রূপান্তরে সফল হতে সাহায্য করছে। দেশের মানুষ এখন তথ্য-প্রযুক্তির ব্যবহারকে মুক্তির উপায় হিসেবে বিবেচনা করছে। দেশে তরুণ শ্রমশক্তির একটি বড়ো অংশ প্রযুক্তিখাতে নিজের মেধা ও ভাবলোক বিনিয়োগ করছেন। ফলশ্রুতিতে প্রচুর উদ্ভাবনী চিন্তার ও কাজের সম্প্রসারণ ঘটছে। ভেতরের কাঠামোতে তাই এক আশ্চর্য মানবিক মূল্যবোধ জন্ম নিতে শুরু করেছে।

এই মূল্যবোধের বীজ বপন হয় ১৯৫২ সালে। মাতৃভাষা আন্দোলন থেকে ১৯৭১ সালে মুক্তির সংগ্রামের মধ্যে অর্জিত ‘ভূখণ্ড, পতাকা ও সার্বভৌত্ব’ অর্জনের ৫২ বছর পূর্তি হচ্ছে বিদয়ী বছরে। এরই মধ্যে অর্থনৈতিক মুক্তির মাধ্যমে এলডিসি গ্র্যজুয়েট হয়েছে বাংলাদেশ। কৃষিতে বীজতলা থেকে উৎপাদন পর্যন্ত প্রতিটি স্তরে প্রযুক্তির ব্যবহারে গত ১৫ বছরে কৃষিতে উৎপাদন বেড়েছে ৪৫ শতাংশ।   সুরক্ষিত প্রাচীর ভেদ করে নিমেষেই ই-মেইল; হোয়াটসআপে মহুর্তে পৌঁছে যাওয়া যায় ঈপ্সিত গন্তব্যে। সেবার ডিজিটাল রূপন্তরে সরকার এখন হাতের মুঠোয়। জনগণের সঙ্গে ভার্চুয়ালি সংযুক্ত হতে পারছে সরকার। চাকরির সন্ধানে শুকতলা ক্ষয়ে যাওয়ার দিন শিকেয় উঠছে। প্রতিকার পাতার নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি না খুঁজে ‘বিডিজবস’ এর মতো অনলাইন ঠিকানাতে কম খরচেই চাকরির আবেদন করা যাচ্ছে।  ইন্টারনেটে যুক্ত হয়ে ফ্রিল্যান্সিং হয়ে উঠেছে বৈদেশিক মুদ্রা আহরণের নতুন খাত। চাকরির পেছনে না ছুটে নিজেদের সমস্যার ঘরোয়া সমাধান নিয়ে  উদ্যোক্তা হওয়ার দৌড়ে শামিল হচ্ছে নতুন প্রজন্ম।

এভাবেই ইলেকট্রনিক যোগাযোগ বদলে দিয়েছে ব্যবসায়ের ধারণা। খুলে দিয়েছে নতুন নতুন দুয়ার। ঘরে বসেই কেনাকাটা, ব্যাংক ছাড়াই লেনদেন সহজ করেছে জীবনযাত্রাকে। প্রযুক্তির ষোলকলায় পূর্ণতার পথে ১৬ই ডিসেম্বর। আমাদের গৌরবের, অস্তিত্বের বিজয়গাঁথা।

এরইমধ্যে ‘বিকাশ-নগদ-উপায়’ এর মতো এমএফএস বিশ্বে বাংলাদেশ-কে অনন্য উচ্চতায় নিয়ে গেছে। উবারের মতো প্রতিষ্ঠানের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে চলছে ‘পাঠাও’। ডিএইচএল হতে না পাড়লেও কুরিয়ারে ই-কুরিয়ার, রেডএক্স বেশ ভালো করছে। ‘বিক্রয়’ ও ’দারজ’ এর মতো বৈশ্বিক ব্র্যান্ডের পাশে ঠাঁয় দাঁড়িয়ে আছে ‘আজকের ডিল’, পিকাবু। ই-ভ্যালি স্ক্যাম কাটিয়ে প্রতিষ্ঠিত ব্র্যান্ডগুলো এখন নোঙর করছে ই-কমার্স বন্দরে। ক্ষুদ্র-মাঝারি খুচরা বিক্রেতাদের কাছে তুমুল জনপ্রিয় হয়ে উঠেছে শপ-আপ। মুদি দোকানগুলো যুক্ত হচ্ছে ‘মোকাম’-এ। সিনেমা হলগুলোকে ঐতিহ্যে পরিণত করে নেটফ্লিক্স, হৈচৈ এর পাশাপাশি আয়না, চরকি-র পাশাপাশি ওটিটি প্লাটফর্মগুলো হয়ে উঠছে পরিচিত হয়ে উঠছে বিনোদনের আধারে।   

এমন অর্ধশতাধিক প্রযুক্তিনির্ভর উদ্যোগ-উদ্ভাবনের মধ্য দিয়েই দেশে প্রযুক্তির বাহনে চেপে এসেছে প্রকৃত বিজয়। এখন এই প্রযুক্তির সার্বভৌমত্বে নজর দেয়া দরকার। ডটকম থেকে ডটবিডি; জুম থেকে বৈঠক-এ মনযোগী হওয়া দরকার। একইভাবে বেসরকারি উদ্যোগে স্থানীয় উদ্যোক্তারা যেনো দীর্ঘ মেয়াদে চাপমুক্ত হয়ে প্রযুক্তি ব্যবসায় করতে পারে সেই নির্ভার পরিবেশ নিশ্চিত করা জরুরী। দরকার নিজস্ব ডেটাব্যাংক। রিসার্চ অ্যানালিটিক্স। একইভাবে জরুরী ই-জিপি’র মতো স্বচ্ছতা নিরুপণের আরো বেশি বেশি প্রাযুক্তিক উদ্যোগ; যে উদ্ভাবন ও উদ্যোগে মাধ্যমে দেশে নিশ্চিত হবে সুশাসন। হুন্দাই-স্যামসাং এর মতো ফেসবুক-ইউটিউব-নেটফ্লিক্স এর মতো বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে বাংলাদেশে ডেরা স্থাপনে গড়তে হবে টেক-ডিপ্লোম্যাসি। কেননা তথ্যপ্রযুক্তি এখন শুধু পণ্য ও সেবা চালুর মধ্যেই সীমিত থাকবে না। কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা, যান্ত্রিক রূপান্তর আমাদের মতো ঘনবসতিপূর্ণ দেশের জন্য আসবে ভিন্ন বাস্তবতা নিয়ে। তাই  দেশীয় প্রযুক্তি উদ্যোক্তাদের প্রতিষ্ঠিত করতে দীর্ঘমেয়দী সরকারি নীতির কোনো বিকল্প নেই। জীবধারার প্রতিপদেই প্রযুক্তিকে তাই নিয়ে আসতে হবে চালকের আসনে। এভাবেই প্রযুক্তির টেকসই ব্যবহারে এই পলল বিধৌত বদ্বীপের  ‘মাটি’ ও ‘মানুষ’ হয়ে উঠবে স্বর্ণময়। সেদিন খুব বেশি দূরে নয়; যেদিন এআই বিশ্বেও ‘সোনার বাংলা’র বিজয় কেতন উড়বে বিশ্বময়।

দ্রষ্টব্য: অভিমত-এ প্রকাশিত পুরো মতামত লেখকের নিজের। এর সঙ্গে ডিজিটাল বাংলা মিডিয়া কর্তৃপক্ষের কোনো সংশ্লিষ্টতা নেই। বহুমতের প্রতিফলন গণমাধ্যমের অন্যতম সূচক হিসেবে নীতিগত কোনো সম্পাদনা ছাড়াই এই লেখা প্রকাশ করা হয়। এতে কেউ সংক্ষুব্ধ বা উত্তেজিত হলে তা তার একান্ত ব্যক্তিগত বিষয়।